মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়ার আয়োজন বা মিলাদ করা যাবে কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়ার আয়োজন (মিলাদ) করা যাবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়ার আয়োজন করা যাবে কি? অর্থাৎ মিলাদের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া করা জায়েয আছে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, ঈসালে সওয়াব করা—এসব শরীয়তসম্মত ও প্রশংসনীয় আমল। কিন্তু এর জন্য বিশেষভাবে কোনো "মিলাদ মাহফিল" বা "দু'য়ার আয়োজন"-এর নামে নির্দিষ্ট পদ্ধতি, নির্দিষ্ট দিন-তারিখ, নির্দিষ্ট খাবার বা ভোজের ব্যবস্থা করা—এগুলো শরীয়তে প্রমাণিত নয়; বরং এগুলো পরবর্তী যুগে প্রচলিত রসম-রেওয়াজ। তাই এ ধরনের বিশেষ আয়োজনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া ও ঈসালে সওয়াবের বিধান
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ "হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।" (সূরা ইবরাহীম: ৪১)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ "আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও, যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে গত হয়েছে।" (সূরা হাশর: ১০)
হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ "মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া: (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দু'য়া করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
অতএব, মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া করা, সদকা করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো—এসব জায়েয ও উত্তম। ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া, ইস্তিগফার, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো শরীয়তসম্মত।
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
"মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া, ইস্তিগফার, সদকা এবং কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো—এসব বিষয়ে ফকীহগণের ঐকমত্য রয়েছে যে, তা উপকারী।" (রাদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)
২. "মিলাদ" শব্দের প্রসঙ্গ
"মিলাদ" শব্দটি মূলত আরবি "মীলাদ" (ميلاد) থেকে এসেছে, যার অর্থ জন্ম বা জন্মকাল। পরবর্তী যুগে বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে বা কোনো মৃত ব্যক্তির স্মরণে যে মাহফিলের প্রচলন হয়েছে, তাকে "মিলাদ" বলা হয়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:
(ক) মিলাদের বৈধ দিক: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত, জন্ম, জীবনী আলোচনা করা, তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, দু'য়া করা—এগুলো স্বতন্ত্রভাবে বৈধ ইবাদত। তবে এগুলোকে নির্দিষ্ট দিন-তারিখে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবশ্যক বা সুন্নত মনে করা—এটি ভিন্ন বিষয়।
(খ) মিলাদের অবৈধ দিক: মিলাদকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে আবশ্যক মনে করা, নির্দিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করা, বিশেষ খাবার বা ভোজের আয়োজন করা, মৃত ব্যক্তির নামে বিশেষ মিলাদ মাহফিলের প্রচলন করা—এগুলো শরীয়তে প্রমাণিত নয়।
৩. মৃত ব্যক্তির নামে বিশেষ "দু'য়ার আয়োজন" বা "মিলাদ" প্রসঙ্গে ফকীহগণের মত
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ এবং তাঁর অন্যান্য ফতোয়ায় স্পষ্ট করেছেন যে, মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েয; কিন্তু এর জন্য বিশেষ আয়োজন, ভোজ বা রসম-রেওয়াজের প্রচলন শরীয়তে নেই। (বেহেশতী জেওর, অংশ ১)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ এবং "ইমদাদুল ফতোয়া"-তে উল্লেখ করেন যে, মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া করা উত্তম, কিন্তু বিদআতী পদ্ধতিতে মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা থেকে বিরত থাকা উচিত। (ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৪)
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফতোয়ায়ে উসমানী"-তে বলেন:
"মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া, ইস্তিগফার ও সদকা করা শরীয়তসম্মত। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মিলাদ বা দু'য়ার মাহফিলের আয়োজন করা, যাকে ধর্মীয় বিধান মনে করা হয়—এটি বিদআত।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ১/১৭৮)
৪. বিদআতের সংজ্ঞা ও সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়—তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
অতএব, ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—তাওকীফ (শরীয়তের নির্দেশনার অনুসরণ)। যা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়, তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. সঠিক পদ্ধতি
মৃত ব্যক্তির জন্য যা করা যাবে:
- দু'য়া করা: "আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু..." ইত্যাদি দু'য়া পড়া।
- ইস্তিগফার করা: মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
- সদকা করা: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান করা।
- কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো: তবে এর জন্য বিশেষ আয়োজন বা ভোজের ব্যবস্থা না করা।
- নেক সন্তান হওয়া: যে পিতা-মাতার জন্য দু'য়া করবে।
যা করা যাবে না:
- মিলাদকে ধর্মীয় বিধান বা আবশ্যক মনে করা।
- নির্দিষ্ট দিন-তারিখে বিশেষ মাহফিলের প্রচলন করা।
- মৃত ব্যক্তির নামে বিশেষ ভোজ বা খাবারের আয়োজন করা।
- এগুলোকে সুন্নত বা ওয়াজিব মনে করা।
উপসংহার
মৃত ব্যক্তির জন্য দু'য়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, সদকা করা ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো—এসব শরীয়তসম্মত ও প্রশংসনীয় আমল। কিন্তু "মিলাদ" নামে বিশেষ আয়োজন, নির্দিষ্ট দিন-তারিখে মাহফিল, বিশেষ ভোজের ব্যবস্থা—এগুলো শরীয়তে প্রমাণিত নয়; বরং এগুলো পরবর্তী যুগে প্রচলিত রসম-রেওয়াজ। তাই এ ধরনের বিশেষ আয়োজন থেকে বিরত থাকা এবং সরলভাবে দু'য়া, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির উপকার করার চেষ্টা করা উচিত।