ভাই যদি পারিবারিক ব্যবসা থেকে বাবার সম্পদ সরিয়ে ফেলে, বাবা জীবিত থাকলে সম্পদ ভাগ হবে কি?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার ভাই আমাদের পারিবারিক বিজনেস থেকে প্রায় কোটি টাকার উপরে সরিয়ে ফেলছে। বাবাকে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে, তাই বাবা তেমন কিছুই বলতে পারেনা, দুবার রিহ্যাবে দিতে হয়েছে ভাইকে। সকল ডকুমেন্টস আছে, আত্মীয়-স্বজন সবাই জানে।
এখন যদি বাবার মৃত্যুর পর আমরা ভাইবোনরা তার পাওনা অংশ থেকে, সরিয়ে ফেলা টাকা বাদ দিয়ে বাকি অংশ হিসাব করে তাকে দেই, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে কি গুনাহ হবে? বাবা স্পষ্ট বলে দিছে বেঁচে থাকতে সম্পদ ভাগ হবেনা।
যদি গুনাহ হয় তাহলে আমরা কি করবো?
Answer
উত্তর (সংক্ষিপ্ত):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার ভাই যদি পারিবারিক ব্যবসা থেকে বাবার সম্পদ/মুনাফা থেকে অবৈধভাবে টাকা সরিয়ে নিয়ে থাকে, তাহলে সেটা তার জন্য গুনাহ ও হারাম।
কারণ বাবার সম্পদে সন্তানের স্বতঃস্ফূর্ত মালিকানা নেই; বাবা জীবিত থাকলে তার সম্পদ তারই। বাবার অনুমতি ছাড়া নেওয়া বা সরানো আমানতের খিয়ানত ও অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের অন্তর্ভুক্ত।
তবে বাবার মৃত্যুর পর মিরাস বণ্টনের সময় আপনি যদি আপনার ভাইয়ের পাওনা অংশ থেকে সে সরিয়ে নেওয়া টাকা সমন্বয়/কাটছাঁট করে বাকিটা দেন—এটি নিজে থেকে “শাস্তি” দেওয়া নয়; বরং এটি ঋণ/আমানত ফেরতের হিসাব।
যদি প্রমাণসহ নিশ্চিত হয় যে সে এত টাকা নিয়েছে এবং অন্যান্য ওয়ারিসগণও এতে সম্মত হয়, তাহলে তার অংশ থেকে সেই টাকা সমন্বয় করা জায়েয হবে।
কিন্তু যদি টাকার পরিমাণ, উৎস বা প্রমাণ নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে নিজে থেকে কেটে দেওয়া ঠিক হবে না; শরীয়তসম্মত উপায় হলো—হিসাব স্পষ্ট করা, ওয়ারিসদের সম্মতি নেওয়া, প্রয়োজনে সালিশ/আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা।
আপনার ভাইয়ের উচিত তাওবা করা এবং অবৈধভাবে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া বা বাবার অনুমতি/মাফ নেওয়া।
বাবার সম্পদে সন্তানের মালিকানা নেই
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«أَنْتَ وَمَالُكَ لِأَبِيكَ» “তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার বাবার।” — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৯১; মুসনাদে আহমাদ
হানাফি ফিকহে এর ব্যাখ্যা হলো—সন্তানের সম্পদের উপর বাবার হক রয়েছে, কিন্তু বাবার সম্পদ সন্তানের নয়। বাবা জীবিত থাকলে বাবার সম্পদ বাবারই। তাই বাবার অনুমতি ছাড়া ব্যবসা থেকে টাকা সরানো বা আত্মসাৎ করা হারাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।” — সূরা আন-নিসা: ২৯
আরও ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে আদেশ করেন।” — সূরা আন-নিসা: ৫৮
বাবা জীবিত থাকলে মিরাস বণ্টন হয় না
বাবা স্পষ্ট বলেছেন, “বেঁচে থাকতে সম্পদ ভাগ হবে না।” এটি শরীয়তসম্মত। কারণ মিরাসের বিধান মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ... وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ... — সূরা আন-নিসা: ১২
এখানে “تَرَكَ” অর্থ মৃত্যুর পর যা ছেড়ে যায়। তাই বাবা জীবিত থাকলে তার সম্পদে ওয়ারিশদের অংশ নির্ধারিত হয় না।
মৃত্যুর পর হিসাব ও সমন্বয়
বাবার মৃত্যুর পর মিরাস বণ্টন হবে কুরআন-সুন্নাহর নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী। যদি প্রমাণিত হয় যে আপনার ভাই বাবার সম্পদ থেকে অবৈধভাবে টাকা নিয়েছে, তাহলে সেটি তার উপর ঋণ/আমানত হিসেবে থাকবে। ওয়ারিশগণ সম্মত হলে তার মিরাসি অংশ থেকে সেই টাকা সমন্বয় করা যেতে পারে। এটিকে “শাস্তি” নয়, বরং হক ফেরত হিসেবে দেখা হবে।
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» “ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির বদলে ক্ষতিও করা যাবে না।” — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৩৪১
তবে নিজে থেকে সন্দেহের ভিত্তিতে কেটে দেওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহ বলেন:
وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا “নিশ্চয়ই ধারণা সত্যের পরিবর্তে কোনো কাজে আসে না।” — সূরা আন-নাজম: ২৮