রিয়া কী? শিক্ষকের ভয়ে বাড়ির কাজ করা কি রিয়া? গোসল ফরজে পিতা-মাতার ভয়ে গোসল করলে রিয়া হবে কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6764
Questioner: Farida Yeasmin
Question Asked: 11 Oct 2026, 09:43 PM
Reviewed & Published: 11 Oct 2026, 10:12 PM
Views: 30
Tokens: 5,214
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোন একজন ছাত্রকে তার শিক্ষক একটি বাড়ির কাজ দিল, কিন্তু সে বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ না করে আধা মত করে তার শিক্ষক এর বকাঝকা বা ভৎসনার ভয়ে সে সবটা করেছে এই বলে তার বকা থেকে বাচে, যেহেতু শিক্ষকের কথা শুনে ভালো কাজ করা আল্লাহর একটি ইবাদত তাহলে কি এটা রিয়া হবে?
যদি এটা রিয়া না হয় তাহলে আমার প্রশ্ন গোসল ফরজ বা ওয়াজিব হলে পিতা মাতার ভৎসনার ভয়ে তা আদায় করলে রিয়া হয় কেন?

Answer

রিয়া (লোকদেখানো আমল) সম্পর্কে বিস্তারিত জবাব

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী দুটি বিষয় জানতে চেয়েছেন:

১. শিক্ষক যদি ছাত্রকে বাড়ির কাজ দেন, ছাত্র তা অর্ধেক করে শিক্ষকের বকাঝকা/ভৎসনার ভয়ে সম্পূর্ণ করে ফেলে — এটা কি রিয়া হবে?

২. যদি এটা রিয়া না হয়, তাহলে গোসল ফরজ/ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও পিতা-মাতার ভৎসনার ভয়ে গোসল করলে সেটা রিয়া হয় কেন?


প্রথমে রিয়ার সংজ্ঞা ও মূলনীতি

রিয়া শব্দের অর্থ হলো — দেখানো, লোকদেখানো। শরীয়তের পরিভাষায়: আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া, বান্দার প্রশংসা বা দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

"তাদেরকে এছাড়া কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠভাবে পালন করবে।" — (সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى

"নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" — (সহীহ বুখারী: ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে বলেন:

"রিয়ার মর্ম হলো — ইবাদতের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টি বা প্রশংসা কামনা করা।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৬৫৫)


মূল পার্থক্য: ইবাদতের উদ্দেশ্য কী?

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বুঝতে হবে:

| বিষয় | রিয়া হয় | রিয়া হয় না | |------|----------|-------------| | ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য | আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, বরং মানুষকে দেখানো | আল্লাহর সন্তুষ্টি, তবে পাশাপাশি পার্থিব কারণও আছে | | নিয়ত | লোকের প্রশংসা পাওয়া বা লোকের ভয় | আল্লাহর হুকুম পালন, তবে ভয়ের কারণও প্রভাবক | | আমলের প্রকৃতি | ইবাদতকে লোক দেখানোর মাধ্যম বানানো | ইবাদত আল্লাহর জন্যই, ভয় শুধু প্রেরণা |


প্রথম প্রশ্নের জবাব: শিক্ষকের বকাঝকা/ভৎসনার ভয়ে কাজ করা

বিশ্লেষণ:

ছাত্র যদি শিক্ষকের ভয়ে বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ করে, তবে এখানে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:

১. বাড়ির কাজ করা মূলত ইবাদত নয় — এটি দুনিয়াবি কাজ। দুনিয়াবি কাজে রিয়ার প্রশ্নই আসে না। রিয়া শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

২. যদি ছাত্রের উদ্দেশ্য হয়:

  • শুধু বকা থেকে বাঁচা → এটি দুনিয়াবি স্বার্থ, ইবাদত নয়, তাই রিয়া নয়।
  • শিক্ষকের কথা মানা আল্লাহর হুকুম (শিক্ষকের আনুগত্য) হিসেবে করে → এটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবে ভয়ের প্রেরণা থাকলেও মূল নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি হলে রিয়া হবে না।

৩. ইমাম গাজালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীনে বলেন:

"যদি কোনো ব্যক্তি ইবাদত করে আল্লাহর জন্যও, আবার মানুষের ভয় বা লোভের কারণেও — তবে সে খাঁটি মুخلص নয়, তবে সে মুনাফিকও নয়; বরং সে 'শিরকুল আসগার' বা ছোট শিরকের পর্যায়ে রয়েছে। তবে যদি মানুষের ভয়ই মূল প্রেরণা হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি না থাকে, তাহলে তা রিয়া।" — (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৩/২৯০-এর সারসংক্ষেপ)

৪. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে বলেন:

"দুনিয়াবি কাজে রিয়ার প্রশ্ন আসে না। রিয়া শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে। আর ইবাদতে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে পার্থিব কোনো প্রেরণা মিশে থাকে, তবে তা রিয়া নয়, বরং নিয়তের দুর্বলতা।" — (ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩৫-২৩৬)

সিদ্ধান্ত (প্রথম প্রশ্ন):

শিক্ষকের ভয়ে বাড়ির কাজ করা রিয়া নয় — কারণ:

  • এটি মূলত দুনিয়াবি কাজ।
  • রিয়া শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
  • যদি ছাত্র শিক্ষকের আনুগত্যকে আল্লাহর হুকুম মনে করে করে, তবে ভয়ের প্রেরণা থাকলেও মূল নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি হলে রিয়া হবে না।

দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব: গোসল ফরজ/ওয়াজিবে পিতা-মাতার ভৎসনার ভয়ে গোসল করলে রিয়া হয় কেন?

এখানে মূল পার্থক্য বুঝুন:

গোসল ফরজ/ওয়াজিব — এটি একটি সরাসরি ইবাদত, যা আল্লাহর হুকুমে ফরজ হয়েছে।

وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا

"যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুবি) হও, তবে পবিত্রতা অর্জন করো।" — (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬)

এখন প্রশ্ন হলো — পিতা-মাতার ভয়ে গোসল করলে রিয়া হয় কেন?

বিশ্লেষণ:

১. যদি গোসলের মূল উদ্দেশ্যই হয় পিতা-মাতার বকা থেকে বাঁচা — অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম পালনের নিয়ত না থাকে, শুধু পিতা-মাতার ভয়ই প্রেরণা হয় — তাহলে এখানে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ নয়, বরং মানুষ (পিতা-মাতা)। আর ইবাদতে মানুষের সন্তুষ্টি বা ভয়কে মূল উদ্দেশ্য বানানোই রিয়া।

২. কিন্তু যদি ছাত্র/সন্তান মনে করে:

  • "গোসল করা আল্লাহর হুকুম, আমি আল্লাহর জন্যই করছি; পিতা-মাতার ভয় শুধু প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে" → তাহলে এটা রিয়া নয়, বরং নিয়তের দুর্বলতা।

৩. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"যদি ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, আর পার্থিব কোনো কারণ (যেমন ভয় বা লোভ) পাশাপাশি থাকে, তবে তা রিয়া নয়; বরং তা নিয়তের অপূর্ণতা। আর যদি পার্থিব কারণই মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে তা রিয়া।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৬৫৬)

৪. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে বলেন:

"ইবাদতে রিয়া ও নিয়তের দুর্বলতার মধ্যে পার্থক্য হলো — রিয়ায় ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ হয়; আর নিয়তের দুর্বলতায় মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ থাকে, তবে পার্থিব প্রেরণাও মিশে থাকে।" — (মা'আরিফুল কুরআন, ৮/৪৫০-এর সারসংক্ষেপ)

সিদ্ধান্ত (দ্বিতীয় প্রশ্ন):

গোসল ফরজ/ওয়াজিবে পিতা-মাতার ভৎসনার ভয়ে গোসল করা তখনই রিয়া হবে যখন:

  • গোসলের মূল উদ্দেশ্যই হয় পিতা-মাতার বকা থেকে বাঁচা।
  • আল্লাহর হুকুম পালনের নিয়ত না থাকে।
  • ইবাদতকে মানুষের সন্তুষ্টির মাধ্যম বানানো হয়।

কিন্তু যদি মূল নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, আর পিতা-মাতার ভয় শুধু প্রেরণা হিসেবে কাজ করে → তাহলে তা রিয়া নয়, বরং নিয়তের দুর্বলতা, যা থেকে তওবা করা উচিত।


মূল পার্থক্যের সারসংক্ষেপ

| দিক | শিক্ষকের ভয়ে বাড়ির কাজ | পিতা-মাতার ভয়ে গোসল | |-----|------------------------|----------------------| | আমলের প্রকৃতি | দুনিয়াবি কাজ | ইবাদত (ফরজ/ওয়াজিব) | | রিয়ার প্রশ্ন | আসে না | আসে | | রিয়া হয় কখন? | — | যখন মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহ ছাড়া অন্য হয় | | রিয়া হয় না কখন? | সর্বদা (দুনিয়াবি কাজ) | যখন মূল নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি, ভয় শুধু প্রেরণা |


উপদেশ

১. সর্বদা নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন — ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি রাখুন।

২. ভয় বা লোভ যেন মূল প্রেরণা না হয় — বরং আল্লাহর হুকুম পালনের আগ্রহই মূল প্রেরণা হোক।

৩. নিয়তের দুর্বলতা থেকে তওবা করুন — যদি কখনো পার্থিব প্রেরণা মিশে যায়, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং নিয়ত ঠিক করুন।

৪. আল্লাহর কাছে দোয়া করুন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ

"হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সাথে শিরক করা থেকে আপনার আশ্রয় চাই, আর না জেনে যা করেছি তার জন্য ক্ষমা চাই।" — (মুসনাদে আহমাদ: ১৯৬০৬)


সংক্ষিপ্ত উত্তর

প্রথম প্রশ্ন: শিক্ষকের ভয়ে বাড়ির কাজ করা রিয়া নয়, কারণ এটি দুনিয়াবি কাজ এবং রিয়া শুধু ইবাদতে প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: গোসল ফরজ/ওয়াজিবে পিতা-মাতার ভয়ে গোসল করা তখনই রিয়া হয় যখন গোসলের মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়ে পিতা-মাতার বকা থেকে বাঁচা হয়। আর যদি মূল নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, ভয় শুধু প্রেরণা হয়, তবে তা রিয়া নয় — বরং নিয়তের দুর্বলতা।


রেফারেন্স

  • সহীহ বুখারী: ১
  • সহীহ মুসলিম: ১৯০৭
  • সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫
  • সূরা আল-মায়িদাহ: ৬
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ১/৬৫৫-৬৫৬
  • ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন (ইমাম গাজালি): ৩/২৯০
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ১/২৩৫-২৩৬
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ৮/৪৫০
  • মুসনাদে আহমাদ: ১৯৬০৬


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.