ইসলামে নন-মাহরাম ভাবির সাথে সম্পর্ক, রিকশায় একসাথে যাওয়া, স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার বিধান ও ভাবির সাথে দূরত্ব বজায় রাখার শরিয়তসম্মত উপায় সম্পর্কে জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
আমার জামাই মাহরাম মেইন্টেন করতে চাই না বাসায়, তার ফ্যামিলির মধ্যে তার ছোট ভাবির সাথে দরকার ছাড়া ও কথা বলে যা আমার একদমই পছন্দ না। সে দিন ভাবিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে দেখে আমি মানা করছি কারণ রিকশা করে যেতে হবে একসাথে এইভাবে রিকশাতে গেলে গায়ের সাথে গায়ে লাগবে দুইজনের আমি তাই মানা করি,আমাদের মধ্যে ঝগড়া লেগে যাই ভাইয়া বিদেশ থাকার কারণে সব কাজ উনাকে দিয়ে করাই,আমি মানা করলে কম কথা বলতে আমার কথার মূল্য দেই না।এইভাবে রিকশা করে কি যাওয়া যায়,আর ইসলামে বউয়ের গায়ে হাত তুলা কতোটুকু জায়েজ,আর ভাবির সাথে কি ভাবে সম্পর্ক দূরে করবো।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো একাধিক দিক সম্পৃক্ত। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো।
১. স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বা স্ত্রীকে অসন্তুষ্ট করে ভাবির সাথে একা রিকশায় যাওয়া
ইসলামে নন-মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে খালওয়া (নির্জনতা) ও স্পর্শ উভয়ই নিষিদ্ধ। রিকশায় একসাথে বসা—যেখানে শরীর লাগার সম্ভাবনা থাকে—তা আরও বেশি সতর্কতার বিষয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে থাকলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪১; জামে তিরমিজি, হাদিস ২১৬৫
আরেক হাদিসে:
إِنِّي لَا أُصَافِحُ النِّسَاءَ "আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না।" — সহীহ বুখারি, হাদিস ৪৮৯১ (উম্মে আতিয়্যা রা.-এর বর্ণনা)
ফিকহি বিধান (হানাফি):
- নন-মাহরাম নারীর সাথে দরকার ছাড়া কথা বলা, হাসি-ঠাট্টা করা, একসাথে যাতায়াত করা—সবই গুনাহ।
- রিকশায় একসাথে বসা যদি শরীর স্পর্শ হয় বা লাগার আশঙ্কা থাকে, তবে তা হারাম।
- একান্ত প্রয়োজন হলে মাহরাম পুরুষ (যেমন স্বামী, ভাই, পিতা) সাথে থাকা আবশ্যক।
সুতরাং আপনার আপত্তি সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত। স্বামীর উচিত ছিল স্ত্রীর কথা গুরুত্ব দেওয়া এবং বিকল্প ব্যবস্থা করা (যেমন: আলাদা রিকশা, মাহরাম পুরুষ সাথে নেওয়া, বা অন্য কোনো মাহরামের মাধ্যমে পাঠানো)।
২. স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা কতটুকু জায়েজ?
ইসলামে স্ত্রীর উপর যুলুম করা, প্রহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَجْلِدُ أَحَدُكُمْ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ ثُمَّ يُجَامِعُهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ "তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে দাসীর মতো প্রহার না করে, অতঃপর দিনের শেষে তার সাথে সহবাস করে।" — সহীহ বুখারি, হাদিস ৪৯৪২; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৮৫১
রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কোনো স্ত্রীকে বা খাদিমকে প্রহার করেননি:
مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ امْرَأَةً لَهُ وَلَا خَادِمًا "রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কোনো স্ত্রীকে বা খাদিমকে প্রহার করেননি।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৩২৮
হানাফি ফিকহের বিধান:
- বিনা কারণে স্ত্রীকে প্রহার করা হারাম ও কবিরা গুনাহ।
- শুধু চরম অসদাচরণের ক্ষেত্রে শাসনমূলক হালকা প্রহারের অনুমতি আছে (সূরা নিসা: ৩৪), তবে তা মুখে নয়, শরীরে দাগ ফেলে এমন নয়, হাড় ভাঙার মতো নয় — ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধের কাছাকাছি।
- রাগের বশে প্রহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এতে স্ত্রীর হক নষ্ট হয় এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন: স্ত্রীকে প্রহার করা শুধু নসীহতের পরও অবাধ্য থাকলে এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে হলে; নাহলে নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৮-১৮৯)
সুতরাং আপনার স্বামীর প্রহার করা সম্পূর্ণ অন্যায়। আপনি এ বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করুন, তবে কেউ যদি আপনার উপর যুলুম করে, আপনি শরিয়তসম্মতভাবে প্রতিকার চাইতে পারেন (পরিবারের বড়দের মাধ্যমে, বা প্রয়োজনে ইসলামি আদালতের মাধ্যমে)।
৩. ভাবির সাথে সম্পর্ক দূরে করার উপায়
ইসলামে ভাবি নন-মাহরাম। ভাইয়ের স্ত্রী আপনার স্বামীর জন্য নন-মাহরাম। তাই:
ক. পর্দা ও দূরত্ব বজায় রাখা
- দরকার ছাড়া কথা না বলা।
- একা কোথাও না যাওয়া।
- ফোন/মেসেজে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ না রাখা।
- দেখা-সাক্ষাতে সালামের বাইরে অতিরিক্ত কথা না বলা।
খ. স্বামীকে হিকমতের সাথে বোঝানো
- রাগ না করে, ভালোবাসার সাথে বোঝান যে এটি শরিয়তের হুকুম, আপনার ব্যক্তিগত ঈর্ষা নয়।
- কুরআন-হাদিসের দলিল পেশ করুন।
- পরিবারের বড় কোনো মাহরাম পুরুষ বা বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে বোঝানোর ব্যবস্থা করুন।
গ. ঘরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ
- ভাবি যদি একই বাসায় থাকেন, তবে পর্দার বিধান কঠোরভাবে মানার ব্যবস্থা করুন।
- সম্ভব হলে আলাদা বাসায় থাকার চেষ্টা করুন।
- স্বামীর সাথে ভাবির দেখা-সাক্ষাতের প্রয়োজন হলে মাহরাম উপস্থিতিতে হোক।
ঘ. দুআ ও আল্লাহর উপর ভরসা
- رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ — সূরা ফুরকান: ৭৪
- স্বামীর হেদায়েতের জন্য দুআ করুন।
- নিজের ধৈর্য ও ইবাদত বাড়ান।
৪. সরাসরি প্রশ্নের উত্তর
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | রিকশায় একসাথে যাওয়া যাবে কি? | না, নন-মাহরামের সাথে শরীর লাগার আশঙ্কা থাকলে নাজায়েজ। | | স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা জায়েজ? | বিনা কারণে হারাম। চরম অবস্থায়ও শরিয়তের কঠোর শর্তসাপেক্ষে হালকা শাসন, তবে রাগের বশে প্রহার নাজায়েজ। | | ভাবির সাথে সম্পর্ক দূরে করবো কীভাবে? | পর্দা, দরকার ছাড়া কথা বন্ধ, স্বামীকে হিকমতের সাথে বোঝানো, প্রয়োজনে আলাদা থাকা। |
উপদেশ
আপনার স্বামী বিদেশে থাকেন, তাই আপনি একা অনেক কষ্ট সহ্য করছেন। ইসলাম আপনার পাশে আছে। আপনার আপত্তি শরিয়তসম্মত। তবে ঝগড়া না করে, ধৈর্য ও হিকমতের সাথে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা পরিবারের বড় মাহরামের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝান। আল্লাহ আপনার সংসারকে হেফাজত করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারি, হাদিস ৪৮৯১, ৪৯৪২
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪১, ২৩২৮, ২৮৫১
- জামে তিরমিজি, হাদিস ২১৬৫
- সূরা আন-নিসা: ১৯, ৩৪
- সূরা ফুরকান: ৭৪
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৮৮-১৮৯
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২ (নারী-পুরুষ সম্পর্ক অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪
- বেহেশতী জেওর (নিকাহ অধ্যায়)
والله أعلم بالصواب