পিতামাতা, শিক্ষক বা আত্মীয়ের ভয়ের কারণে ভালো কাজ করলে কি রিয়া হবে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত) সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন
কেউ তার পিতামাতা, শিক্ষক, নিকট আত্মীয়ের ভৎসনা বা বকাঝকা এর ভয়ের কারণে কোনো ভালো কাজ করলে কি রিয়া হবে?
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, শুধু পিতামাতা, শিক্ষক বা নিকট আত্মীয়ের ভৎসনা বা বকাঝকা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে কোনো ভালো কাজ করলে তা রিয়া হবে না। তবে এটাও ইখলাসের সর্বোচ্চ স্তর নয়। প্রকৃত ইখলাস হলো শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা।
বিস্তারিত আলোচনা
১. রিয়ার সংজ্ঞা
রিয়া (الرِّيَاء) শব্দের অর্থ হলো লোকদেখানো বা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করা। শরীয়তের পরিভাষায়—আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাথে মানুষের প্রশংসা, সম্মান বা দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত-নেক আমল করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ "তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে।" — (সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫)
২. রিয়ার প্রকারভেদ
হাদিসে রিয়াকে শিরকে আসগার (ছোট শিরক) বলা হয়েছে। মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ "তোমাদের উপর আমি যে জিনিসটির সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো শিরকে আসগার। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন: রিয়া (লোকদেখানো আমল)।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩০; সহীহ তারগীব: ৩০)
৩. প্রশ্নের মূল দিক: ভয়ের কারণে আমল করা কি রিয়া?
ফকীহগণ (হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে) রিয়ার সংজ্ঞায় স্পষ্ট করেছেন যে, রিয়ার মূল উপাদান হলো মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে, কেউ যদি ভৎসনা, বকাঝকা, লজ্জা বা সামাজিক চাপ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে নেক কাজ করে, তবে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ:
-
উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: রিয়ায় উদ্দেশ্য থাকে প্রশংসা অর্জন বা স্বার্থ হাসিল। আর এখানে উদ্দেশ্য হলো অপমান, ভৎসনা বা কষ্ট থেকে বাঁচা—যা একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা।
-
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, আমলের মূল্যায়ন নিয়তের উপর নির্ভরশীল। যদি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাথে মানুষের নিন্দা থেকে বাঁচার ইচ্ছা থাকে, তবে তা রিয়া নয়; বরং এটি ইখলাসের ঘাটতি।
-
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বেহেশতী জেওর-এ বলেন: "রিয়া হলো এমন আমল যা মানুষকে দেখানোর জন্য করা হয়। আর যদি কেউ লোকলজ্জার ভয়ে বা অভিভাবকের ভয়ে আমল করে, তবে তা রিয়া নয়; বরং তা নফসের দুর্বলতা।"
৪. তবে কি এ আমল গ্রহণযোগ্য হবে?
এখানে দুটি অবস্থা বিবেচ্য:
অবস্থা-১: যদি ভয়ই একমাত্র প্রেরণা হয় যদি কেউ শুধুমাত্র পিতামাতা বা শিক্ষকের বকাঝকা থেকে বাঁচার জন্যই আমল করে এবং অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো ধারণাই না থাকে, তবে আমলটি রিয়া না হলেও ইখলাসবিহীন। এমন আমলের সওয়াব কম হবে বা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অবস্থা-২: যদি ভয়ের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তও থাকে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যও আমল করে এবং পাশাপাশি অভিভাবকের ভৎসনা থেকেও বাঁচতে চায়, তবে এ আমল রিয়া নয় এবং ইনশাআল্লাহ গ্রহণযোগ্য হবে। তবে উত্তম হলো—নিয়তকে খালিস করে শুধু আল্লাহর জন্য করা।
৫. হানাফি উলামায়ে কেরামের বক্তব্য
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহঃ) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা বাইয়িনাহর তাফসীরে লেখেন:
"ইখলাসের অর্থ হলো—আমল শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করা। যদি কোনো ব্যক্তি লোকলজ্জা বা অভিভাবকের ভয়ের কারণে আমল করে, তবে তা রিয়া নয়; বরং তা ইখলাসের নিম্নস্তর। তবে তাকে ক্রমে ইখলাসের উচ্চস্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে।"
মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) ফাতাওয়া উসমানী-তে বলেন:
"রিয়ার সংজ্ঞায় শর্ত হলো—আমল দ্বারা মানুষের প্রশংসা বা দুনিয়াবি ফায়দা হাসিলের ইচ্ছা থাকা। পক্ষান্তরে, কেউ যদি ভৎসনা বা তিরস্কারের ভয়ে আমল করে, তবে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়।"
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
| বিষয় | রিয়া | ভয়ের কারণে আমল | |------|------|----------------| | উদ্দেশ্য | প্রশংসা/স্বার্থ অর্জন | অপমান/কষ্ট থেকে বাঁচা | | অন্তরের অবস্থা | আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুপস্থিত | আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকতে পারে | | হুকুম | শিরকে আসগার (হারাম) | রিয়া নয়, তবে ইখলাসে ঘাটতি | | সমাধান | তাওবা ও ইখলাস অর্জন | ইখলাস বাড়ানোর চেষ্টা |
৭. করণীয়
-
নিয়ত সংশোধন করুন: আমলটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার সংকল্প করুন। অভিভাবকের ভয় থাকলে সেটি গৌণ থাকবে, মূল প্রেরণা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
-
দুআ করুন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ'লামু, ওয়া আস্তাগফিরুকা লিমা লা আ'লামু" — হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে আপনার সাথে শিরক করা থেকে আপনার আশ্রয় চাই, আর না জেনে যা করেছি তার জন্য ক্ষমা চাই। (মুসনাদে আহমাদ)
-
ইখলাসের চর্চা করুন: ছোট ছোট আমল গোপনে করা, কাউকে না জানানো—এতে ইখলাস বৃদ্ধি পায়।
-
ভয়কে প্রেরণা বানান, লক্ষ্য নয়: অভিভাবকের ভয়কে আল্লাহর ভয়ের সাথে মিলিয়ে নিন। আল্লাহর ভয়ই সর্বোচ্চ।
সারসংক্ষেপ
- পিতামাতা, শিক্ষক বা নিকট আত্মীয়ের ভৎসনা/বকাঝকা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে নেক আমল করা রিয়া নয়।
- তবে এটি ইখলাসের সর্বোচ্চ স্তরও নয়।
- প্রকৃত ইখলাস হলো—শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করা।
- নিয়ত সংশোধনের চেষ্টা করতে থাকুন; ইনশাআল্লাহ আমল গ্রহণযোগ্য হবে।
রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ), কিতাবুল ইখলাস
- বেহেশতী জেওর — আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)
- মাআরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহঃ), সূরা বাইয়িনাহ
- ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ)
- মুসনাদে আহমাদ — হাদিস নং ২৩৬৩০
- সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব — হাদিস নং ৩০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহঃ)