পড়াশোনা, ঝগড়া থামানো, গেম বন্ধ করা, ওযু ভেঙে গিয়েও নামাজ চালিয়ে যাওয়া—এসব কি রিয়ার অন্তর্ভুক্ত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আবার, কেও নামাজ পরছে, সে জানে নামাজ চলাকালে ওযু চলে গেলে তখন তা ছেড়ে দিতে হয়, এটা জানে যে কে কি মনে করবে ভেবে নামাজ পড়লে রিয়া ও হয়ত হতে পারে, তাই নামাযে ওযু ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে মাথায় এই চিন্তা আনল (যেতে ভাল লাগছে না তাই এমনি চালিয়ে যাই) যেন রিয়া না হয়, অথবা আনল (আল্লাহর জন্য চালিয়ে যাই, যদিও জানে যে আল্লাহ কবুল করবেন না) তাহলে এতে কি রিয়া হবে?
Answer
রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত সম্পর্কে বিস্তারিত জবাব
ভূমিকা
রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত ইসলামে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক রোগ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এটিকে "ছোট শিরক" বলে অভিহিত করেছেন। তবে রিয়ার সংজ্ঞা ও পরিধি সম্পর্কে অনেকের মনে বিভ্রান্তি থাকে। নিম্নে আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক জবাব দেওয়া হলো।
১. রিয়ার সংজ্ঞা ও মূলনীতি
রিয়া হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে বা আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে মানুষের প্রশংসা, দৃষ্টি আকর্ষণ বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত বা নেক আমল করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ "তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করবে।" — (সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ "আমি তোমাদের উপর যে বিষয়টির সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: রিয়া (লোক দেখানো)।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩০; সহীহ তারগীব: ৩০)
মূলনীতি: রিয়া তখনই হবে যখন ইবাদত বা নেক আমলের মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষকে দেখানো হয়, অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে মানুষের সন্তুষ্টিকেও সমান বা প্রধান্য দেওয়া হয়।
২. আপনার উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
(ক) কাউকে দেখানোর জন্য পড়াশোনা করা
প্রশ্ন: পড়াশোনা কি নফল ইবাদত? কাউকে দেখানোর জন্য পড়াশোনা করা কি রিয়া?
জবাব:
প্রথমত, দুনিয়াবি পড়াশোনা (যেমন: স্কুল-কলেজের পড়া, চাকরির প্রস্তুতি) মূলত দুনিয়াবি কাজ। এটি ইবাদত তখনই হবে যখন নিয়ত সহীহ হবে—যেমন: দ্বীনি ইলম অর্জন, পরিবারের ভরণপোষণের জন্য উপার্জনের যোগ্যতা অর্জন, মুসলিম উম্মাহর খেদমত ইত্যাদি।
দ্বীনি ইলম অর্জন অবশ্যই ইবাদত ও নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ "যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" — (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)
যদি কেউ দ্বীনি ইলম অর্জন করে মূলত মানুষকে দেখানোর জন্য—যেমন: "লোকে বলবে আমি আলেম", "আমাকে বড় পণ্ডিত বলবে", "সমাজে সম্মান পাব" —তাহলে এটি রিয়া হবে এবং ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে।
তবে যদি মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষের প্রশংসার খেয়াল আসে—এটি রিয়া নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এ অবস্থায় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং নিয়ত ঠিক করতে হবে।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"রিয়ার অর্থ হলো—আমলটি আল্লাহর জন্য না করে মানুষের জন্য করা। আর যদি উভয় উদ্দেশ্য মিলিত হয়, তবে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রধান হয় এবং মানুষের দেখানো গৌণ হয়, তবে তা রিয়া নয়; বরং তা আমলকে কমজোর করে দেয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ১/৬৩০, মাকতাবা রশিদিয়া)
(খ) কাউকে দেখানোর জন্য ঝগড়া থামানো
প্রশ্ন: কিছুটা ভাব নিয়ে ঝগড়া থামানো কি রিয়া?
জবাব:
ঝগড়া থামানো বা মীমাংসা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا "যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।" — (সূরা আল-হুজুরাত: ৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا: بَلَى، قَالَ: إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ "আমি কি তোমাদেরকে রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে উত্তম বিষয় সম্পর্কে জানাব না? তারা বললেন: হ্যাঁ। তিনি বললেন: পারস্পরিক সম্পর্ক মীমাংসা করা।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯১৯; সহীহ)
যদি কেউ ঝগড়া থামায় মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কিন্তু সাথে সাথে "লোকে দেখবে আমি কত বড় মীমাংসাকারী" —এমন খেয়াল আসে, তবে এটি রিয়া নয়, বরং নফসের প্ররোচনা। তবে যদি মূল উদ্দেশ্যই হয় মানুষকে দেখানো—যেমন: "লোকে বলবে আমি কত ভালো, আমি কত বড় মীমাংসাকারী" —তাহলে এটি রিয়া হবে।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"আমলের মধ্যে যদি দুনিয়াবি উদ্দেশ্য মিশে যায়, তবে দেখতে হবে কোনটি প্রধান। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রধান হয় এবং দুনিয়াবি উদ্দেশ্য গৌণ হয়, তবে আমলটি বাতিল হবে না, তবে সওয়াব কমে যাবে। আর যদি দুনিয়াবি উদ্দেশ্যই প্রধান হয়, তবে আমলটি রিয়ায় পরিণত হবে।" — (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৫, মাকতাবা মা'আরিফুল কুরআন)
(গ) গেম খেলার সময় কেউ সামনে এলে গেম বন্ধ করা
প্রশ্ন: কেউ সামনে এলে "সে কী মনে করবে" ভেবে গেম বন্ধ করা কি রিয়া?
জবাব:
এখানে কয়েকটি দিক বিবেচনা করতে হবে:
১. গেম খেলা নিজেই: যদি গেমটি হারাম হয় (যেমন: জুয়া, অশ্লীলতা, ইসলামবিরোধী বিষয়বস্তু), তবে তা বন্ধ করা ওয়াজিব। আর যদি বৈধ গেম হয় (যেমন: দাবা, বৈধ ভিডিও গেম), তবে তা মubah (অনুমোদিত)।
২. কেউ সামনে এলে গেম বন্ধ করা:
-
যদি উদ্দেশ্য হয়: "লোকে দেখবে আমি গেম খেলি না, আমি ভালো ছেলে/মেয়ে" —তাহলে এটি রিয়া হবে, কারণ এটি ইবাদত নয়, বরং সামাজিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য মিথ্যা প্রদর্শন।
-
যদি উদ্দেশ্য হয়: "গেম খেলা আমার জন্য সময়ের অপচয়, আমি এটি ছাড়তে চাই; কেউ দেখলে লজ্জা লাগে, তাই বন্ধ করলাম" —এটি রিয়া নয়, বরং এটি লজ্জা ও আত্মসমালোচনা।
-
যদি উদ্দেশ্য হয়: "গেম খেলা থেকে বিরত থাকা একটি ভালো কাজ, আমি আল্লাহর জন্য এটি ছাড়তে চাই" —এটি ইবাদত হবে এবং রিয়া হবে না।
মূল কথা: গেম বন্ধ করা নিজে কোনো ইবাদত নয়, তাই এটি রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে যদি কেউ গেম না খেলাকে ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষকে দেখানোর জন্য, তাহলে সেটি রিয়া হবে।
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন:
"রিয়া শুধুমাত্র ইবাদতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দুনিয়াবি কাজে রিয়া হয় না, তবে দুনিয়াবি কাজে লোক দেখানো হলে তা নিফাক (কপটতা)-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।" — (ইহইয়া উলুমিদ্দীন: ৩/২৯০)
(ঘ) নামাজে ওযু ভেঙে যাওয়ার পর মাথায় চিন্তা আনা
প্রশ্ন: কেউ নামাজ পড়ছে, জানে ওযু চলে গেলে নামাজ ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু "কে কী মনে করবে" ভেবে নামাজ চালিয়ে যাওয়া—এটি কি রিয়া?
জবাব:
এখানে দুটি পরিস্থিতি:
পরিস্থিতি ১: ব্যক্তি জানে ওযু ভেঙে গেছে, কিন্তু "লোকে দেখবে আমি নামাজ ছেড়ে দিলাম, তারা কী ভাববে" —এই চিন্তায় নামাজ চালিয়ে যায়। এটি রিয়া। কারণ সে আল্লাহর হুকুম (ওযু ছাড়া নামাজ বৈধ নয়) মানছে না, বরং মানুষের ভয়েই নামাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটি ছোট শিরক।
পরিস্থিতি ২: ব্যক্তি জানে ওযু ভেঙে গেছে, কিন্তু "আল্লাহর জন্য চালিয়ে যাই, যদিও জানি আল্লাহ কবুল করবেন না" —এই চিন্তায় নামাজ চালিয়ে যায়। এটিও রিয়া বা নিফাক। কারণ সে জেনে-বুঝে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ "আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের আমল কবুল করেন।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২৭)
সঠিক পদ্ধতি: ওযু ভেঙে গেলে সাথে সাথে নামাজ ছেড়ে দিতে হবে, নতুন ওযু করে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। মানুষের ভয় বা আল্লাহর ভয়—কোনো চিন্তাই নামাজ চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা দেয় না।
ইমাম হাসকাফি (রহ.) বলেন:
"ওযু ভেঙে গেলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়। জানা সত্ত্বেও চালিয়ে যাওয়া হারাম।" — (আদ-দুররুল মুখতার: ১/২২৫)
৩. রিয়া থেকে বাঁচার উপায়
১. নিয়ত পরিশুদ্ধ করা: প্রতিটি আমলের আগে মনে মনে ভাবুন—"আমি এই কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি।"
২. আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া: রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ "হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে শিরক করা থেকে আপনার আশ্রয় চাই, আর না জেনে করলে ক্ষমা চাই।" — (মুসনাদে আহমাদ: ১৯৬০৬)
৩. গোপনীয়তা রক্ষা করা: নফল ইবাদত গোপনে করা উত্তম, যাতে রিয়া না হয়।
৪. মানুষের প্রশংসা পেলে: মনে মনে ভাবুন—"এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, আমার কৃতিত্ব নয়।" এবং আল্লাহর শোকর আদায় করুন।
৫. রিয়ার ভয় নয়, বরং ইখলাসের চেষ্টা: শুধু "রিয়া হবে না" —এই ভয়ে ইবাদত ছেড়ে দেওয়াও ভুল। বরং ইখলাসের সাথে আমল করতে হবে।
৪. সারসংক্ষেপ
| বিষয় | রিয়া হবে কি? | কারণ | |------|--------------|------| | দেখানোর জন্য দ্বীনি পড়াশোনা | হ্যাঁ | মূল উদ্দেশ্য মানুষকে দেখানো | | দেখানোর জন্য ঝগড়া থামানো | হ্যাঁ (যদি মূল উদ্দেশ্য দেখানো হয়) | ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট | | গেম বন্ধ করা (লোকে দেখবে ভেবে) | না (সাধারণত) | এটি ইবাদত নয়, সামাজিক আচরণ | | ওযু ভেঙে গিয়েও নামাজ চালিয়ে যাওয়া | হ্যাঁ | আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন, মানুষের ভয় |
মূলনীতি: রিয়া তখনই হয় যখন ইবাদত বা নেক আমলের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষকে দেখানো হয়। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রধান হয়, তবে গৌণ খেয়াল রিয়া নয়, বরং নফসের প্ররোচনা—যা থেকে তওবা করতে হবে।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।