আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
ঈমান আছে নাকি চলে গেছে যদি কারোর এমন সন্দেহ থাকে-
১) সে যদি পুনরায় ঈমান নবায়ন করে নেয় তাহলে কি তার আগের সব ভালো আমল চলে যাবে?
২) আগের সব আমল চলে যাবে কিনা এই ভয়ে ঈমান নবায়ন করছে না, আবার শান্তি ও পাচ্ছে না। তার কিছু নিয়ত করা নফল নামাজ বাকি আছে। এখন সে কি যে কয় রাকাত বাকী সেই নামাজ পড়বে? নাকি পুরোটাই আবার পড়বে?
৩) এমন অবস্থায় ঈমান নবায়ন করলে, বিবাহিত হলে কি আবার বিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে?
Answer
প্রশ্নোত্তর: ঈমান নবায়ন ও সংশ্লিষ্ট মাসআলাহ
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি ঈমানের হিফাযতকারী। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী ﷺ-এর উপর।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি
ঈমান ভঙ্গের কারণ হলো কুফরী কালাম (কুফরী কথা) বলা বা কুফরী আকীদা পোষণ করা। শুধু মনে মনে কুফরী খেয়াল আসা বা ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) ঈমান ভঙ্গ করে না। হাদীসে এসেছে:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের খেয়াল (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা তার উপর আমল করে।" — সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭
তবে মুখে কুফরী কালাম উচ্চারণ করা — তা একা হোক বা কারো সামনে — তা ঈমান ভঙ্গের কারণ। যদি কেউ জেনে-বুঝে, ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী কথা বলে, তবে ঈমান চলে যায়। আর যদি ভুলবশত, উদ্দেশ্য ছাড়া মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, তবে ফকীহগণের বিশ্লেষণে তা ঈমান ভঙ্গ করে না — যদি না সে তা পছন্দ করে বা তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:
"الْكُفْرُ يَكُونُ بِالِاعْتِقَادِ أَوْ بِالْقَوْلِ أَوْ بِالْفِعْلِ... وَإِنْ كَانَ سَاهِيًا أَوْ مُخْطِئًا لَا يَكْفُرُ"
"কুফরী হয় আকীদা, কথা বা কাজ দ্বারা... আর যদি ভুলবশত বা অসতর্কতাবশত হয়, তবে কুফরী হবে না।" — রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪-২২৫
সারকথা: আপনার বর্ণনায় যদি সত্যিই উদ্দেশ্য ছাড়া, ভুলবশত মুখ থেকে বেরিয়ে থাকে এবং সাথে সাথে তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসেন, তবে ইনশাআল্লাহ ঈমান বাকী আছে। তবে সতর্কতাস্বরূপ ঈমান নবায়ন করে নেওয়া উত্তম।
১) ঈমান নবায়ন করলে আগের সব ভালো আমল চলে যাবে কি?
উত্তর: না, ঈমান নবায়ন করলে আগের নেক আমল নষ্ট হয় না। কারণ ঈমান নবায়ন করা মানে ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত ও দৃঢ় করা, নতুন করে ইসলামে প্রবেশ করা নয় (যদি প্রকৃতপক্ষে কুফরী না হয়ে থাকে)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
«وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ»
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায় এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের আমল দুনিয়া ও আখিরাতে নষ্ট হয়ে যায়।" — সূরা আল-বাকারা: ২১৭
ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"إِذَا أَسْلَمَ الْكَافِرُ... لَا يُعَادُ عَلَيْهِ مَا فَاتَ مِنَ الْعِبَادَاتِ"
"কাফির যখন ইসলাম গ্রহণ করে... তার ছুটে যাওয়া ইবাদত পুনরায় আদায় করতে হবে না।" — রাদ্দুল মুহতার: ২/১৬০
তবে মুরতাদ (কুফরী করার পর ইসলামে ফিরে আসা ব্যক্তি) সম্পর্কে ফকীহগণের মত হলো — হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি কিছু ইবাদত পুনরায় আদায় করতে হয়। কিন্তু নামাজ, রোযা পুনরায় আদায় করতে হয় না। (আল-হিদায়া: ১/২৪)
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু প্রকৃত কুফরী হয়নি (উদ্দেশ্য ছাড়া ভুলবশত হয়েছে), তাই ঈমান নবায়ন করলে কোনো আমলই নষ্ট হবে না। বরং ঈমান নবায়ন করা মুস্তাহাব ও নিরাপদ।
২) আগের আমল চলে যাওয়ার ভয়ে ঈমান নবায়ন করছে না — এটা কি ঠিক?
উত্তর: এটা ভুল ধারণা ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা। ঈমান নবায়ন করা কোনো ক্ষতি করে না, বরং এটি ঈমানকে মজবুত করে। আর যদি প্রকৃতপক্ষে কুফরী হয়ে থাকে (নাউযুবিল্লাহ), তবে ঈমান নবায়ন না করলে সব আমলই নষ্ট হবে — কারণ কুফরী অবস্থায় কোনো ইবাদত কবুল হয় না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
«وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ»
"তাদের দান-সদকা কবুল হওয়া থেকে শুধু এই জিনিসই বাধা দিয়েছে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে।" — সূরা আত-তাওবা: ৫৪
নফল নামাজের মাসআলাহ:
- যদি প্রকৃত কুফরী না হয়ে থাকে (যা আপনার বর্ণনায় সম্ভাব্য), তবে যত রাকাত বাকী আছে, শুধু সেগুলোই আদায় করবে — পুরোটা পুনরায় পড়তে হবে না।
- আর যদি প্রকৃত কুফরী হয়ে থাকে (নাউযুবিল্লাহ), তবে কুফরী অবস্থায় যে নফল নামাজ আদায় করা হয়েছিল তা বাতিল। কিন্তু যে নফল নামাজের নিয়ত করেছিল কিন্তু আদায় করেনি, তা ঈমান নবায়ন করার পর আদায় করলে ইনশাআল্লাহ কবুল হবে। তবে কুফরী অবস্থায় আদায়কৃত নফল পুনরায় পড়া জরুরি নয়, কারণ নফল ইবাদতের কাযা ওয়াজিব নয়।
ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"النَّوَافِلُ لَا تُقْضَى إِذَا فَاتَتْ... إِلَّا مَا كَانَ مِنْهَا مُؤَقَّتًا بِوَقْتٍ"
"নফল ইবাদত ছুটে গেলে কাযা করা হয় না... তবে যা নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত।" — রাদ্দুল মুহতার: ২/২৮
পরামর্শ: ঈমান নবায়ন করে নিন, তাহলে ইনশাআল্লাহ কোনো আমল নষ্ট হবে না এবং অন্তরে শান্তি ফিরে আসবে। শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়বেন না।
৩) ঈমান নবায়ন করলে বিবাহিত হলে কি আবার বিয়ে পড়াতে হবে?
উত্তর: এখানে দুটি অবস্থা:
অবস্থা ১: প্রকৃত কুফরী হয়নি (শুধু ওয়াসওয়াসা বা ভুলবশত উচ্চারণ)
তাহলে বিয়ে আবার পড়াতে হবে না। কারণ ঈমান ভঙ্গ হয়নি, তাই নিকাহ বহাল আছে।
অবস্থা ২: প্রকৃত কুফরী হয়ে গেছে (নাউযুবিল্লাহ)
যদি সত্যিই কুফরী হয়ে থাকে, তবে ফকীহগণের বিশ্লেষণ:
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী: মুরতাদ হলে নিকাহ মওকুফ (স্থগিত) হয়ে যায়। ইসলামে ফিরে আসলে:
- যদি ইদ্দতের ভেতরে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে নিকাহ বহাল থাকে — আবার বিয়ে পড়াতে হবে না।
- যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তবে নিকাহ ভেঙে যায় — আবার নতুন করে নিকাহ করতে হবে।
ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:
"إِذَا ارْتَدَّ أَحَدُ الزَّوْجَيْنِ... تَبِينُ مِنْهُ... فَإِنْ أَسْلَمَ فِي الْعِدَّةِ فَهِيَ زَوْجَتُهُ، وَإِنْ أَسْلَمَ بَعْدَ الْعِدَّةِ لَا يَعُودُ إِلَيْهَا إِلَّا بِنِكَاحٍ جَدِيدٍ"
"স্বামী-স্ত্রীর একজন মুরতাদ হলে... স্ত্রী তার থেকে আলাদা হয়ে যায়... যদি ইদ্দতের ভেতরে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সে তার স্ত্রীই থাকবে; আর ইদ্দতের পরে ইসলাম গ্রহণ করলে নতুন নিকাহ ছাড়া ফিরে পাওয়া যাবে না।" — রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৭৬; আল-হিদায়া: ২/৩২৩
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনার বর্ণনায় প্রকৃত কুফরী হয়নি (উদ্দেশ্য ছাড়া ভুলবশত হয়েছে), তাই বিয়ে আবার পড়াতে হবে না। ইনশাআল্লাহ নিকাহ বহাল আছে।
চূড়ান্ত পরামর্শ
১. ঈমান নবায়ন করে নিন — এটি নিরাপদ ও মুস্তাহাব। এতে কোনো আমল নষ্ট হবে না।
২. তাওবা করুন — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, কারণ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
৩. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচুন — বারবার সন্দেহে পড়বেন না। হাদীসে এসেছে:
«إِذَا جَاءَ الشَّيْطَانُ إِلَى أَحَدِكُمْ فَقَالَ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ»
"যখন শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: কে এই বানিয়েছে? কে এই বানিয়েছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে বানিয়েছে? তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং বিরত হয়।" — সহীহ বুখারী: ৩২৭৬
৪. নফল নামাজ: যত রাকাত বাকী আছে শুধু সেগুলোই আদায় করুন, পুরোটা পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।
৫. বিয়ে: আবার পড়ানোর প্রয়োজন নেই, ইনশাআল্লাহ নিকাহ বহাল আছে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে ঈমানের উপর অটল রাখুন এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাযত করুন। আমীন।