কোনো গজল গাওয়ার সময় ইয়া রাসুসুল,ইয়া মুহাম্মাদ বললে কি শিরক হবে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6601
Questioner: MHMA
Question Asked: 09 Oct 2026, 10:56 AM
Reviewed & Published: 09 Oct 2026, 02:07 PM
Views: 49
Tokens: 4,434
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি কিছু গজল শুনি যেখানে মুহাম্মাদ (স) এর প্রশংসা করতে গিয়ে ইয়া রাসুল,ইয়া মুহাম্মাদ বলে।আমারও অনেক সময় অবচেতন মনে এই লাইনগুলো মনে আসে,তখন মুখে উচ্চারণ করে গাই কি না সন্দেহ লাগে।এভাবে গাইলে কি বড় শিরক হবে?iman vongo hobe ki?

Answer

প্রশ্ন: গজলে "ইয়া রাসূল, ইয়া মুহাম্মাদ" বলে ডাকা কি শিরক? ঈমান ভঙ্গ হবে কি?

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، محمد بن عبد الله، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

সংক্ষিপ্ত উত্তর

শুধু "ইয়া রাসূল" বা "ইয়া মুহাম্মাদ" বলে ডাকা বা উচ্চারণ করা শিরক নয় এবং এতে ঈমান ভঙ্গ হবে না। কারণ এগুলো নিঃসন্দেহে সম্বোধনসূচক শব্দ (নিদা/ভোকেটিভ)। শিরক হয় তখন, যখন কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা হয়, বা আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) কারও মধ্যে আরোপ করা হয়, বা ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য করা হয়।

তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:


১. "ইয়া রাসূল" বলা কি জায়েয?

হ্যাঁ, জায়েয। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সরাসরি "ইয়া রাসূলাল্লাহ" বলে ডাকতেন। এটি কুরআন ও হাদীসে প্রমাণিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا "হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।" (সূরা আহযাব: ৪৫)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ "হে নবী! আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আনফাল: ৬৪)

এখানে আল্লাহ নিজেই নবী (সা.)-কে "ইয়া নাবী" বলে সম্বোধন করেছেন। সুতরাং "ইয়া রাসূল" বা "ইয়া নাবী" বলা কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী নয়।

হাদীসে সাহাবীদের সম্বোধন: সাহাবীরা রাসূল (সা.)-কে "ইয়া রাসূলাল্লাহ" বলেই ডাকতেন। যেমন হাদীসে এসেছে:

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ... আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল: "ইয়া রাসূলাল্লাহ..." (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩; সহীহ মুসলিম)

এটি অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত। সুতরাং "ইয়া রাসূল" বলা নিজে শিরক নয়।


২. শিরক কখন হয়?

শিরকের সংজ্ঞা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা: ৪৮)

শিরক হলো:

  1. আল্লাহর ذات, সিফাত বা ক্ষমতায় কাউকে সমকক্ষ করা।
  2. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য ইবাদত করা (যেমন: সিজদা, দুআ, কুরবানি ইত্যাদি)।
  3. গায়েবের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও আছে মনে করা।
  4. আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারও হাতে লাভ-ক্ষতি আছে মনে করা।

শুধু "ইয়া রাসূল" বলা বা গজলে প্রশংসা করা এসবের অন্তর্ভুক্ত নয়।


৩. তবে সতর্কতা জরুরি

যদিও "ইয়া রাসূল" বলা শিরক নয়, তবে গজল গাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

(ক) গজলের কথায় শিরকি অর্থ থাকলে:

কিছু গজলে অতিরঞ্জিত প্রশংসা থাকে, যা শিরকের সীমায় পৌঁছে যায়। যেমন:

  • "তুমি না হলে কিছুই হতো না" — এ ধরনের কথা যদি আল্লাহর ইচ্ছার কথা বাদ দিয়ে বলা হয়, তবে তা ভুল।
  • "তুমি গায়েব জানো" — এটি শিরক।
  • "তুমি বিপদে ডাকলে উদ্ধার করো" — আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এমন বিশ্বাস শিরক।

এ ধরনের গজল শোনা ও গাওয়া জায়েয নয়।

(খ) সংগীতের বিধান:

ইসলামে বাদ্যযন্ত্রসহ গান সাধারণত নাজায়েয। ফকীহগণ বলেন, বাদ্যযন্ত্র (যেমন: হারমোনিয়াম, গিটার, তবলা ইত্যাদি) ব্যবহার করে গান শোনা নাজায়েয। তবে শুধু কণ্ঠে ইসলামী কবিতা বা হামদ-নাত পড়া জায়েয।

عَنْ أَبِي مَالِكٍ الْأَشْعَرِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ আবু মালিক আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: "আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৫৯০ — মুআল্লাক)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বাদ্যযন্ত্রসহ গান শোনা ফিসক (পাপ)। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ: ৩৪৮)

(গ) অবচেতন মনে আসা:

আপনার অবচেতন মনে গজলের লাইন আসা আপনার ইচ্ছাধীন নয়। শরীয়তে এমন খেয়ালের জন্য কোনো গুনাহ নেই, যতক্ষণ না আপনি তা মুখে উচ্চারণ করেন বা তাতে সন্তুষ্ট হন। হাদীসে এসেছে:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَكَلَّمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা করে বা বলে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৭)


৪. ফকীহদের মতামত

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:

"নবী (সা.)-কে 'ইয়া রাসূলাল্লাহ' বলা জায়েয, কারণ এটি সম্বোধন। তবে শর্ত হলো, তাতে শিরকি বিশ্বাস না থাকা।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ: ৩৭০)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:

"নবী (সা.)-কে সম্বোধন করা বা তাঁর প্রশংসা করা জায়েয, তবে তাতে আল্লাহর সিফাত আরোপ করা যাবে না।" (মাআরিফুল কুরআন, সূরা আহযাবের তাফসীর)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"গজল বা নাতে রাসূল (সা.) পড়া জায়েয, যদি তাতে শিরকি কথা না থাকে এবং বাদ্যযন্ত্র না থাকে।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ২, পৃ: ৩২৫)


৫. আপনার করণীয়

  1. শুধু "ইয়া রাসূল" বা "ইয়া মুহাম্মাদ" বলা শিরক নয় — এতে ঈমান ভঙ্গ হবে না।
  2. তবে গজলের কথাগুলো ভালোভাবে বুঝে নিন — যদি তাতে শিরকি অর্থ থাকে, তবে সেগুলো গাওয়া বা শোনা থেকে বিরত থাকুন।
  3. বাদ্যযন্ত্রসহ গজল শোনা পরিহার করুন — এটি ইসলামে নাজায়েয।
  4. অবচেতন মনে আসা লাইন — এতে গুনাহ নেই, যতক্ষণ না আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গান বা তাতে সন্তুষ্ট হন।
  5. যদি সন্দেহ হয়, তবে সেগুলো গাওয়া ছেড়ে দিন এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন।

উপসংহার

"ইয়া রাসূল, ইয়া মুহাম্মাদ" বলা বা গজলে উচ্চারণ করা শিরক নয় এবং ঈমান ভঙ্গ হবে না। শিরক হয় আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, আল্লাহর সিফাত কারও মধ্যে আরোপ করা, বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করা। তবে গজলের কথায় যদি শিরকি অর্থ থাকে বা বাদ্যযন্ত্র থাকে, তবে তা পরিহার করা ওয়াজিব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরক ও বিদআত থেকে হেফাজত করুন এবং বিশুদ্ধ ঈমানের সাথে জীবনযাপন করার তাওফিক দিন। আমীন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.