ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা, পাওনাদারকে এড়িয়ে চলা এবং বহু বছর পর টাকা ফেরত দিতে চাইলে পাওনাদারের হক নষ্ট হয়েছে কি না
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চাচ্ছেন: তিনি তাঁর পাওনাদারের নিকট থেকে নিজের প্রাপ্য টাকা চেয়েছিলেন নিজের প্রয়োজনে। পাওনাদার টালবাহানা করে, এমনকি আত্মগোপনের মতো অবস্থা তৈরি করে টাকা দেয়নি। বহু বছর পর সে টাকা ফেরত দিতে চাইলে প্রশ্নকারী তা নিতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে, "প্রয়োজনের সময় সে দেয়নি"। এখন প্রশ্ন: এমতাবস্থায় কি বলা যাবে যে পাওনাদার তাঁর হক নষ্ট করেছে?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. ঋণ পরিশোধ করা পাওনাদারের উপর ওয়াজিব (ফরজ)
ইসলামি শরিয়তে ঋণ একটি আমানত ও দায়িত্ব। ঋণগ্রহীতা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— "সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা তার সম্মান ও শাস্তি হালাল করে দেয়।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৪২; মুসনাদে আহমাদ)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, সামর্থ্য থাকা অবস্থায় ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা গুনাহ এবং তা পাওনাদারের হক নষ্ট করার শামিল।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৫, পৃ. ১৭০
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ু
২. পাওনাদার টাকা চাইলে তা দেওয়া আবশ্যক
যখন পাওনাদার নিজের প্রয়োজন অনুভব করে ঋণ ফেরত চায়, তখন ঋণগ্রহীতার উপর তা পরিশোধ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। টালবাহানা করা, আত্মগোপন করা বা এড়িয়ে চলা—এসবই শরিয়তসম্মত নয়।
কুরআন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না..." — (সূরা আন-নিসা: ২৯)
কুরআন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে..." — (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
রেফারেন্স:
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি), সূরা আন-নিসা: ৫৮-এর তাফসির
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৩
৩. পাওনাদারের হক নষ্ট হয়েছে কি?
হ্যাঁ, শরিয়তের দৃষ্টিতে এমতাবস্থায় পাওনাদারের হক নষ্ট হয়েছে বলা যাবে, কারণ:
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ না দেওয়া | গুনাহ, হক নষ্ট | | পাওনাদার চাওয়ার পরও টালবাহানা | জুলুমের শামিল | | আত্মগোপন/এড়িয়ে চলা | আমানতদারির পরিপন্থী | | বহু বছর পর টাকা দিতে চাওয়া | মূল ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব বহাল থাকে |
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঋণের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব কখনোই শেষ হয় না, যত বছরই অতিবাহিত হোক। পাওনাদার চাইলে যেকোনো সময় মূল টাকা ফেরত নিতে পারে।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২, কিতাবুল বুয়ু
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৭২
৪. প্রশ্নকারীর "এবার আর নিব না" বলার বিধান
এটা পাওনাকারির অধিকার।তিনি চাইলে সেই অধিকার বিসর্জন দিতে পারবেন।
- মূল ঋণ পাওনাদারের হক — তা নেওয়া তাঁর অধিকার।
- মূল ঋণ মাফ করা স্বেচ্ছায় সদকা হিসেবে হতে পারে, কিন্তু রাগ বা প্রতিশোধের মনোভাব নিয়ে অস্বীকার করা উচিত নয়।
- যদি তিনি মূল টাকা নিতে অস্বীকার করেন এবং তা মাফ করে দেন, তবে তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে — তবে এ সিদ্ধান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া চাই, ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে নয়।
হাদিস: "যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্তকে সময় দেয় বা ঋণ মাফ করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৬)
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ১৬
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), ঋণ সংক্রান্ত অধ্যায়
৫. সিদ্ধান্ত
- পাওনাদারের হক নষ্ট হয়েছে — এ কথা বলা যাবে, কারণ ঋণগ্রহীতা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেছে এবং পাওনাদারকে এড়িয়ে চলেছে।
- তবে মূল ঋণ নিতে অস্বীকার করা শরিয়তসম্মত নয়; চাইলে ক্ষমা করে সদকা করা যেতে পারে, কিন্তু ক্ষোভবশত অস্বীকার করা উচিত নয়।
- ঋণগ্রহীতার উচিত তওবা করা এবং পাওনাদারের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- প্রশ্নকারীর উচিত মূল টাকা ফেরত নেওয়া অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মাফ করে দেওয়া — উভয়ই জায়েজ।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।