মেয়ের নাম 'মারিয়াম ফারিশা' রাখা কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মেয়ের নাম 'মারিয়াম ফারিশা' রাখা প্রসঙ্গে ইসলামি দৃষ্টিকোণ
ভূমিকা
সন্তানের নাম রাখা পিতা-মাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে সুন্দর অর্থবহ নাম রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ
"নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের পিতাদের নাম দ্বারা ডাকা হবে, সুতরাং তোমরা তোমাদের নামগুলো সুন্দর করো।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৮; মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৩৬
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ
— সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৮
'মারিয়াম' নামের অর্থ ও মর্যাদা
মারিয়াম (مَرْيَم) একটি কুরআনিক নাম। এটি আরবি ভাষার একটি প্রাচীন ও সম্মানিত নাম। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে একটি সম্পূর্ণ সূরা 'সূরা মারিয়াম' নামে নাজিল করেছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর মা হযরত মারিয়াম (আ.)-এর নামে এই সূরা।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ
"আর স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতারা বলল: হে মারিয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন, পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে আপনাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।"
— সূরা আলে ইমরান: ৪২
মারিয়াম নামের অর্থ: "আল্লাহর সেবিকা", "উপাসিকা", "পবিত্র নারী", "সচ্চরিত্রা নারী"। এটি ইসলামে অত্যন্ত বরকতময় ও সম্মানিত নাম। সুতরাং 'মারিয়াম' নামটি রাখা সম্পূর্ণ জায়েজ ও মুস্তাহাব।
'ফারিশা' ও 'ফারিসা' — বিশ্লেষণ
১. 'ফারিশা' (فَرِيشَة)
আরবি অভিধান অনুযায়ী فَرِيشَة শব্দের মূল ধাতু ف-ر-ش। এর অর্থ:
- বিছানা, শয্যা
- বিছানার চাদর
- ছড়ানো-বিছানো বস্তু
ফারিশা শব্দটি আরবিতে কোনো ব্যক্তিনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, বরং এটি একটি সাধারণ বস্তুবাচক শব্দ (বিছানা/শয্যা)। তাই নাম হিসেবে এটি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উপযুক্ত নয়।
২. 'ফারিসা' (فَارِسَة)
আরবি فَارِسَة শব্দটি فَارِس (ফারিস)-এর স্ত্রীবাচক রূপ। এর অর্থ:
- অশ্বারোহিণী নারী
- বীরাঙ্গনা
- সাহসী নারী
- যোদ্ধা নারী
এটি আরবিতে একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম। তবে ইসলামি পরিভাষায় এটি বিশেষ কোনো ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন নাম নয়, বরং একটি সাধারণ আরবি নাম।
৩. 'ফারিশতা' (فَارِشْتَا / ফারসি: فرشته)
ফারসি ভাষায় فرشته (ফারিশতা) অর্থ ফেরেশতা। বাংলায় আমরা সাধারণত 'ফেরেশতা' বলি। কেউ কেউ মেয়ের নাম 'ফারিশা' রাখেন 'ফেরেশতা'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে। কিন্তু আরবিতে 'ফারিশা' (فَرِيشَة) শব্দের অর্থ ফেরেশতা নয়, বরং বিছানা। তাই এই নামটি রাখলে অর্থগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
ফিকহি দৃষ্টিকোণ
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন:
وَيُسْتَحَبُّ تَحْسِينُ الْأَسْمَاءِ وَتَسْمِيَةُ الْأَوْلَادِ بِأَسْمَاءِ الْأَنْبِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ
"নাম সুন্দর করা এবং সন্তানদেরকে নবী-রাসূল ও নেককার ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করা মুস্তাহাব।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৫৯৫
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:
التَّسْمِيَةُ بِالْأَسْمَاءِ الْحَسَنَةِ سُنَّةٌ
"সুন্দর নামে নামকরণ করা সুন্নত।"
— ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৬২
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) উল্লেখ করেছেন যে, নামের অর্থ অবশ্যই সুন্দর ও অর্থবহ হতে হবে; এমন নাম রাখা উচিত নয় যার অর্থ খারাপ বা যা কুফরি-শিরকি অর্থ বহন করে।
সঠিক পরামর্শ
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সঠিক পরামর্শ হলো:
✅ উত্তম বিকল্প:
১. মারিয়াম — এটি একক নাম হিসেবেই অত্যন্ত বরকতময় ও কুরআনিক নাম। শুধু 'মারিয়াম' রাখাই সর্বোত্তম।
২. মারিয়াম + আরবি অর্থবহ নাম — যেমন:
- মারিয়াম আয়েশা (আয়েশা = জীবন, রাসূল ﷺ-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম)
- মারিয়াম ফাতিমা (ফাতিমা = রাসূল ﷺ-এর কন্যার নাম)
- মারিয়াম খাদিজা (খাদিজা = রাসূল ﷺ-এর প্রথম স্ত্রীর নাম)
- মারিয়াম যাইনাব (যাইনাব = সুন্দর, সুগন্ধি)
- মারিয়াম হাফসা (হাফসা = সিংহী, সাহসী)
- মারিয়াম সুমাইয়া (সুমাইয়া = প্রথম শহীদা সাহাবিয়া)
- মারিয়াম আসমা (আসমা = সম্মানিতা)
- মারিয়াম সাদিয়া (সাদিয়া = সৌভাগ্যবতী)
৩. যদি 'ফারিসা' (فَارِسَة) রাখতেই চান, তবে এর অর্থ হবে "বীরাঙ্গনা, অশ্বারোহিণী" — এটি জায়েজ, তবে 'ফারিশা' (فَرِيشَة) নয়, কারণ এর অর্থ বিছানা।
❌ পরিহার্য:
- ফারিশা (فَرِيشَة) — অর্থ বিছানা/শয্যা, নাম হিসেবে অনুপযুক্ত।
- ফারিশতা — ফারসি শব্দ, ফেরেশতা অর্থে; তবে আরবিতে নাম হিসেবে প্রচলিত নয় এবং ফেরেশতাদের নামে নামকরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে অনুত্তম।
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) উল্লেখ করেছেন:
"সন্তানের নাম এমন হওয়া উচিত যা শুনতে সুন্দর, অর্থ সুন্দর এবং ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অপ্রচলিত বা অর্থহীন নাম রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত।"
— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৮৬
বেহেশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত (রহ.) লিখেছেন:
"সন্তানের নাম রাখার সময় অর্থের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।"
— বেহেশতী জেওর, নাম রাখা অধ্যায়
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আমাদের পরামর্শ হলো:
'মারিয়াম' নামটি এককভাবে রাখুন অথবা 'মারিয়াম'-এর সাথে কোনো কুরআনিক/ইসলামি নাম যোগ করুন। 'ফারিশা' (فَرِيشَة) নামটি পরিহার করুন, কারণ এর আরবি অর্থ 'বিছানা'। যদি দ্বিতীয় নাম রাখতেই হয়, তবে 'ফারিসা' (فَارِسَة) বা আরও উত্তম কোনো ইসলামি নাম বেছে নিন।