মেয়ের নাম 'মারিয়াম ফারিশা' রাখা কি জায়েজ?

Family Life · Hanafi

Question No: 6570
Questioner: Sumaiya Afrin
Question Asked: 08 Oct 2026, 01:58 PM
Reviewed & Published: 08 Oct 2026, 02:52 PM
Views: 24
Tokens: 4,149
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের মেয়ের নাম 'মারিয়াম ফারিশা' রাখতে চাচ্ছি। কিন্তু ফারিশা হবে নাকি ফারিসা, কোনটা ইসলামের সঠিক অর্থ বহন করে, এটি নিয়ে কনফিউজড আমরা। অনুগ্রহ করে সঠিক পরামর্শ দিলে আমরা উপক্রিত হতাম।

Answer

মেয়ের নাম 'মারিয়াম ফারিশা' রাখা প্রসঙ্গে ইসলামি দৃষ্টিকোণ

ভূমিকা

সন্তানের নাম রাখা পিতা-মাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে সুন্দর অর্থবহ নাম রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ

"নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের পিতাদের নাম দ্বারা ডাকা হবে, সুতরাং তোমরা তোমাদের নামগুলো সুন্দর করো।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৮; মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৩৬

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ

— সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৮

'মারিয়াম' নামের অর্থ ও মর্যাদা

মারিয়াম (مَرْيَم) একটি কুরআনিক নাম। এটি আরবি ভাষার একটি প্রাচীন ও সম্মানিত নাম। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে একটি সম্পূর্ণ সূরা 'সূরা মারিয়াম' নামে নাজিল করেছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর মা হযরত মারিয়াম (আ.)-এর নামে এই সূরা।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:

وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ

"আর স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতারা বলল: হে মারিয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছেন, পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে আপনাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।"

— সূরা আলে ইমরান: ৪২

মারিয়াম নামের অর্থ: "আল্লাহর সেবিকা", "উপাসিকা", "পবিত্র নারী", "সচ্চরিত্রা নারী"। এটি ইসলামে অত্যন্ত বরকতময় ও সম্মানিত নাম। সুতরাং 'মারিয়াম' নামটি রাখা সম্পূর্ণ জায়েজ ও মুস্তাহাব।

'ফারিশা' ও 'ফারিসা' — বিশ্লেষণ

১. 'ফারিশা' (فَرِيشَة)

আরবি অভিধান অনুযায়ী فَرِيشَة শব্দের মূল ধাতু ف-ر-ش। এর অর্থ:

  • বিছানা, শয্যা
  • বিছানার চাদর
  • ছড়ানো-বিছানো বস্তু

ফারিশা শব্দটি আরবিতে কোনো ব্যক্তিনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, বরং এটি একটি সাধারণ বস্তুবাচক শব্দ (বিছানা/শয্যা)। তাই নাম হিসেবে এটি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উপযুক্ত নয়।

২. 'ফারিসা' (فَارِسَة)

আরবি فَارِسَة শব্দটি فَارِس (ফারিস)-এর স্ত্রীবাচক রূপ। এর অর্থ:

  • অশ্বারোহিণী নারী
  • বীরাঙ্গনা
  • সাহসী নারী
  • যোদ্ধা নারী

এটি আরবিতে একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম। তবে ইসলামি পরিভাষায় এটি বিশেষ কোনো ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন নাম নয়, বরং একটি সাধারণ আরবি নাম।

৩. 'ফারিশতা' (فَارِشْتَا / ফারসি: فرشته)

ফারসি ভাষায় فرشته (ফারিশতা) অর্থ ফেরেশতা। বাংলায় আমরা সাধারণত 'ফেরেশতা' বলি। কেউ কেউ মেয়ের নাম 'ফারিশা' রাখেন 'ফেরেশতা'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে। কিন্তু আরবিতে 'ফারিশা' (فَرِيشَة) শব্দের অর্থ ফেরেশতা নয়, বরং বিছানা। তাই এই নামটি রাখলে অর্থগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

ফিকহি দৃষ্টিকোণ

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন:

وَيُسْتَحَبُّ تَحْسِينُ الْأَسْمَاءِ وَتَسْمِيَةُ الْأَوْلَادِ بِأَسْمَاءِ الْأَنْبِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ

"নাম সুন্দর করা এবং সন্তানদেরকে নবী-রাসূল ও নেককার ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করা মুস্তাহাব।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৫৯৫

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

التَّسْمِيَةُ بِالْأَسْمَاءِ الْحَسَنَةِ سُنَّةٌ

"সুন্দর নামে নামকরণ করা সুন্নত।"

— ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৬২

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) উল্লেখ করেছেন যে, নামের অর্থ অবশ্যই সুন্দর ও অর্থবহ হতে হবে; এমন নাম রাখা উচিত নয় যার অর্থ খারাপ বা যা কুফরি-শিরকি অর্থ বহন করে।

সঠিক পরামর্শ

আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সঠিক পরামর্শ হলো:

✅ উত্তম বিকল্প:

১. মারিয়াম — এটি একক নাম হিসেবেই অত্যন্ত বরকতময় ও কুরআনিক নাম। শুধু 'মারিয়াম' রাখাই সর্বোত্তম।

২. মারিয়াম + আরবি অর্থবহ নাম — যেমন:

  • মারিয়াম আয়েশা (আয়েশা = জীবন, রাসূল ﷺ-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম)
  • মারিয়াম ফাতিমা (ফাতিমা = রাসূল ﷺ-এর কন্যার নাম)
  • মারিয়াম খাদিজা (খাদিজা = রাসূল ﷺ-এর প্রথম স্ত্রীর নাম)
  • মারিয়াম যাইনাব (যাইনাব = সুন্দর, সুগন্ধি)
  • মারিয়াম হাফসা (হাফসা = সিংহী, সাহসী)
  • মারিয়াম সুমাইয়া (সুমাইয়া = প্রথম শহীদা সাহাবিয়া)
  • মারিয়াম আসমা (আসমা = সম্মানিতা)
  • মারিয়াম সাদিয়া (সাদিয়া = সৌভাগ্যবতী)

৩. যদি 'ফারিসা' (فَارِسَة) রাখতেই চান, তবে এর অর্থ হবে "বীরাঙ্গনা, অশ্বারোহিণী" — এটি জায়েজ, তবে 'ফারিশা' (فَرِيشَة) নয়, কারণ এর অর্থ বিছানা।

❌ পরিহার্য:

  • ফারিশা (فَرِيشَة) — অর্থ বিছানা/শয্যা, নাম হিসেবে অনুপযুক্ত।
  • ফারিশতা — ফারসি শব্দ, ফেরেশতা অর্থে; তবে আরবিতে নাম হিসেবে প্রচলিত নয় এবং ফেরেশতাদের নামে নামকরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে অনুত্তম।

বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) উল্লেখ করেছেন:

"সন্তানের নাম এমন হওয়া উচিত যা শুনতে সুন্দর, অর্থ সুন্দর এবং ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অপ্রচলিত বা অর্থহীন নাম রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত।"

— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৮৬

বেহেশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত (রহ.) লিখেছেন:

"সন্তানের নাম রাখার সময় অর্থের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।"

— বেহেশতী জেওর, নাম রাখা অধ্যায়

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আমাদের পরামর্শ হলো:

'মারিয়াম' নামটি এককভাবে রাখুন অথবা 'মারিয়াম'-এর সাথে কোনো কুরআনিক/ইসলামি নাম যোগ করুন। 'ফারিশা' (فَرِيشَة) নামটি পরিহার করুন, কারণ এর আরবি অর্থ 'বিছানা'। যদি দ্বিতীয় নাম রাখতেই হয়, তবে 'ফারিসা' (فَارِسَة) বা আরও উত্তম কোনো ইসলামি নাম বেছে নিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.