বেনামাজিকে ঘৃণা করলে কি গুনাহ হবে ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
বেনামাজিকে ঘৃণা করলে কি গুনাহ হবে? তারা কথা শোনে না, কিভাবে দাওয়াত দেব?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বেনামাজি ব্যক্তিদের প্রতি ঘৃণা বা অসহিষ্ণুতা পোষণ করা কি গুনাহ? তারা কোনো উপদেশ শোনে না, তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?
প্রথম অংশ: বেনামাজিকে ঘৃণা করা কি গুনাহ?
১. ঘৃণার বিষয়টি কীসের প্রতি — এটাই মূল বিবেচ্য
ইসলামে ঘৃণা দুই প্রকার:
(ক) ব্যক্তিকে ঘৃণা করা — এটি নিন্দনীয়। কেননা ব্যক্তি মুসলিম হলে তার ঈমান আছে; তার গুনাহের কারণে তাকে ঘৃণা করা বা হেয় করা জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا تَقَاطَعُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَحَاسَدُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا»
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪
(খ) গুনাহ বা অন্যায় কাজকে ঘৃণা করা — এটি ঈমানের অংশ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ»
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯
অর্থাৎ, নামাজ না পড়ার কাজটি ঘৃণা করা ঈমানের দাবি; কিন্তু ব্যক্তিকে ঘৃণা করা বা তাকে হেয় করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
২. ফকীহদের বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
"গুনাহগার মুসলিমকে ঘৃণা করা বা তিরস্কার করা জায়েজ নয়; বরং তার জন্য দুআ করা এবং নরমভাবে উপদেশ দেওয়া কর্তব্য।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৭-এর কাছাকাছি)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা আল-মায়িদার ৭৯ নং আয়াতের তাফসীরে লেখেন:
"নেকীর আদেশ ও মুনকির থেকে নিষেধ—এটি উম্মতের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে তা হতে হবে হিকমত, নরম ভাষা ও ধৈর্যের সাথে।"
৩. উপসংহার (প্রথম অংশ)
- নামাজ না পড়ার কাজটিকে ঘৃণা করা — এটি ঈমানের অংশ, গুনাহ নয়।
- ব্যক্তিকে ঘৃণা করা, হেয় করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা — এটি গুনাহ, জায়েজ নয়।
- তাকে দেখতে না পারা বা অসহিষ্ণু হওয়া — যদি অর্থ হয় "তার গুনাহকে ঘৃণা করা", তবে ঠিক আছে; আর যদি অর্থ হয় "তাকে ঘৃণা করা", তবে তা নাজায়েজ।
দ্বিতীয় অংশ: যারা কথা শোনে না, তাদের দাওয়াতের পদ্ধতি
১. কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
«ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ»
"তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে, এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর সর্বোত্তম পন্থায়।"
— সূরা আন-নাহল: ১২৫
আরও বলেন:
«فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ»
"তোমরা তার সাথে নরম কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে বা ভয় করবে।"
— সূরা ত্বা-হা: ৪৪
২. রাসূল ﷺ-এর পদ্ধতি
রাসূল ﷺ কখনো কঠোরতা দিয়ে শুরু করতেন না। বরং তিনি:
- নরম ভাষায় ডাকতেন
- ভালো ব্যবহার দেখাতেন
- নিজের আমল দিয়ে প্রভাবিত করতেন
- ধৈর্য ধারণ করতেন
হাদিসে এসেছে:
«إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ»
"নম্রতা যে বিষয়েই থাকবে, তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে; আর যে বিষয় থেকে তা উঠে যাবে, তা তাকে কলুষিত করবে।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪
৩. বাস্তব দাওয়াতের কৌশল
যারা কথা শোনে না, তাদের জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে:
(ক) নিজের আমল দিয়ে দাওয়াত
"তোমরা নিজেরা আমল করো, মানুষ নিজে থেকেই অনুসরণ করবে।" — ইমাম হাসান বসরী (রহ.)
(খ) দুআ করা
তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। রাসূল ﷺ দুআ করতেন:
«اللَّهُمَّ اهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ»
(গ) নরম ভাষায় একান্তে উপদেশ
সরাসরি তিরস্কার নয়; বরং ভালোবাসা ও সহানুভূতির সাথে কথা বলা।
(ঘ) সময় ও সুযোগের অপেক্ষা
সবসময় উপদেশ দিলে তারা বিরক্ত হয়। বরং উপযুক্ত সময়ে, যেমন—কোনো বিপদে পড়লে, রমজানে, বা কোনো ভালো মজলিসে—নরমভাবে বলুন।
(ঙ) ভালো সঙ্গীদের সাথে পরিচয় করানো
তাদেরকে নেককার মানুষদের মজলিসে নিয়ে আসুন, যাতে পরিবেশের প্রভাব পড়ে।
(চ) কঠোরতা পরিহার করা
«إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ»
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৭
৪. ফকীহদের বক্তব্য
ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ লেখেন:
"নেকীর আদেশ ও মুনকির থেকে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব; তবে তা হতে হবে নরম ভাষায়, গোপনীয়ভাবে এবং হিকমতের সাথে।"
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে উল্লেখ করেন:
"আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে কঠোরতা ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং নরমতা ও ধৈর্যই কাম্য।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | নামাজ না পড়ার কাজকে ঘৃণা করা | ঈমানের অংশ, জায়েজ | | বেনামাজি ব্যক্তিকে ঘৃণা/হেয় করা | নাজায়েজ, গুনাহ | | তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা | নাজায়েজ | | নরম ভাষায় দাওয়াত দেওয়া | কর্তব্য | | নিজের আমল দিয়ে দাওয়াত | সর্বোত্তম পদ্ধতি | | দুআ করা | কর্তব্য | | কঠোরতা/তিরস্কার | পরিহার করা উচিত |
মূল কথা: গুনাহকে ঘৃণা করুন, গুনাহগারকে নয়। নরম ভাষায়, নিজের আমল দিয়ে এবং দুআর মাধ্যমে দাওয়াত দিন। আল্লাহ হেদায়েত দানকারী।