রাগ ও জেদ নিয়ন্ত্রণ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি — স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার, গালাগালি, শারীরিক নির্যাতন থেকে মুক্তির উপায় কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 6552
Questioner: 0116 Sauda
Question Asked: 07 Oct 2026, 11:51 PM
Reviewed & Published: 08 Oct 2026, 02:02 AM
Views: 19
Tokens: 8,692
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার অনেক বেশি রাগ আর জেদ আমি অনেক খারাপ, আমার হাসবেন্ড এর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করি, একটু উনিশ বিশ হলেই চোখ গরম গালাগালি অনেক খারাপ ভাষা গালি এবং তার মাকে তুলে গালি দেওয়া তার গায়ে হাত তুলা কোনটাই বাদ রাখি না সে অনেক ভয় পায় আমায় আমি তার সাথে এমন করি দেখে কিছু বললে চুপ থাকে, তো আজ একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে, আমি তাকে কিছু গিফট করছি তা ওর ভাই কে দিছে, আমি নিয়ে আসতে বলছে, এর আগেও এমন কীরছে কিছু যদি গিফট কর তার ণাই চায় সে দেয়, তো এটা আমার ভালো লাগে না আমি যা দিছি তা কেন দিবে চাইলেই অন্য টা দেক, যখন দিছে জিনিস গুলো তখনও ঝামেলা হয়ছে, এখন অনেক গালাগালি করছি আমি অনেক চিল্লাচিল্লি করছি, এক সময় কেচে নিছি তাকে মারব, তারপর সেঠা দিয়ে বলছি রাগ করে যে আমার চুল কেটে ফেলব সেও বলছে কাট দেখি আমি কেটে ফেলছে রাগে জিদে, আমি চাইছিলাম যে আমায় না করুক কিন্তু করে নি আমিও কেটে ফেলি, এমনি সব জিনিস আমি ক্ষতি করি কিছু যদি নলি ভাংব ও জোর করে না নিলে ভেংগেই ফেলি, একটু কথা এ দিক সেদিক হলেই তাকে তুই বলি, সে আমার উপর রাগ করলে বা চিল্ললে আমিও আরো বেশি হয় তার থেকে, আমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার, চিল্লাচিল্লি, গালাগালি, করি যখন সে রাগ করে কিছু বললে বা মারতে আসলে আমি যে আর বেশি হয় তাকেই আমি মারি, আজকে এক পর্যায়ে যখন চুল কাটা শেষ চুল দেখে অনেক খাবাপ আর জেদ লাগছিল, শুধু মনে হচ্ছিল যে সে কেন আমায় আটলকালো না না করলে, জোর করে কেচিটা নিলে তো আর কাটতাম না, এই জিদে তাকে এমন ভাবে গলায় চাপ দিছি তার চেহারা কালো হয়ে গেছে, আমি কী করব দিন দিন আমি আর বেশি হচ্ছি আমাকে সাহায্য করুন, এরা আজ না অনেক দিন থেকেই আমি এমন এখন যেন যত দিন যাচ্ছে বেশি হচ্ছি, আমি তার কাছে ক্ষমা চায় সেও করে কিন্তু আমার মন বলে আমি রাগ করব দেখে সে বলে এরা, আমি তাকে চেপে ধরলেও বলে সত্যি ক্ষমা করছি, আমার মন বলে অনেক অনেক ক্ষিপ্ত আমার উপরে , আমার বিয়ে ৮ বছর একটা বাবুও নাই অনেক অনেক খারাপ হয়ে যাচ্ছি, রাগ উঠলে যেন আমি হুসে থাকি না, খুবই অল্প কথায় রেগে যায় তাকে অভিশাপ দেয় তুই কেন মরস না, সব সময় তুই তুই করে কথা বলি এত ও অনেক রাগ করে তাও বলি আমি

Answer

রাগ ও জেদ নিয়ন্ত্রণ: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী একজন বিবাহিত মহিলা যিনি স্বামীর সাথে অতিরিক্ত রাগ, জেদ, গালাগালি, শারীরিক নির্যাতন (গলা চেপে ধরা, মারধর), শাশুড়িকে গালি দেওয়া, স্বামীকে "তুই" বলে সম্বোধন করা, অভিশাপ দেওয়া (তুই কেন মরস না) ইত্যাদি করছেন। ৮ বছর বিবাহিত জীবন, সন্তান নেই। তিনি নিজেই স্বীকার করছেন যে দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং সাহায্য চাইছেন।


ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধান

১. রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"রাগ শয়তান থেকে, আর শয়তান আগুন থেকে সৃষ্টি। আগুন পানি দিয়ে নেভানো হয়। তাই তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন ওযু করে।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৮৪; মুসনাদে আহমাদ

২. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানের অংশ

"যে ব্যক্তি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যা চাইবে তা বলতে পারবে।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৭৯

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

"যারা রাগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ এমন সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।" — সূরা আলে ইমরান: ১৩৪

৩. স্বামীর প্রতি সদ্ব্যবহার ফরজ

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" — সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫

"নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৬৬৪

৪. শারীরিক নির্যাতন সম্পূর্ণ হারাম

ইসলামে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে বা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গলা চেপে ধরা, মারধর করা — এগুলো জুলুম ও হারাম। আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে পথ দেখান না।" — সূরা ইবরাহিম: ১৮

৫. গালাগালি ও অভিশাপ

"মুমিন ব্যক্তি অন্যকে অভিশাপ দেয় না, গালি দেয় না, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে না।" — সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৭

স্বামীকে "তুই" বলে সম্বোধন করা, তার মাকে গালি দেওয়া — এগুলো ইসলামী আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রাদ্দুল মুহতার (৬/৩৬৭) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩২৯)-এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর সম্মান রক্ষা করা ওয়াজিব।

৬. সন্তান না হওয়ার বিষয়টি

৮ বছর সন্তান না হওয়া আল্লাহর ইচ্ছা। এতে হতাশ হয়ে স্বামীর উপর রাগ করা সম্পূর্ণ অন্যায়। আল্লাহ বলেন:

"তিনি যা চান তা সৃষ্টি করেন; যাকে চান সন্তান দেন, যাকে চান বন্ধ্যা করেন।" — সূরা শূরা: ৪৯-৫০

চিকিৎসা করান, দুআ করুন, কিন্তু এজন্য স্বামীকে দোষারোপ করা বা অভিশাপ দেওয়া কখনোই জায়েজ নয়।


করণীয় (ব্যবহারিক পদক্ষেপ)

ক. তাৎক্ষণিক করণীয়

  1. রাগের মুহূর্তে ওযু করুন — হাদিসে এসেছে।
  2. দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন, বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন — রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ।
  3. চুপ থাকুন — রাগের সময় কথা বলা আরও বাড়ায়।
  4. "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
  5. ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ুন বা অন্য রুমে চলে যান।

খ. দীর্ঘমেয়াদী করণীয়

  1. নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করুন — বিশেষ করে তাহাজ্জুদ।
  2. কুরআন তিলাওয়াত করুন — সূরা আর-রাদ, সূরা ফাতির, সূরা নূর।
  3. রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দুআ করুন:
    • اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْغَضَبِ
    • "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল গাদাব"
  4. রুকইয়াহ/আধ্যাত্মিক চিকিৎসা — যদি মনে হয় জিন বা বদনজরের প্রভাব আছে, অভিজ্ঞ রাকী দিয়ে রুকইয়াহ করান।
  5. মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ — রাগ নিয়ন্ত্রণ একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। ডাক্তারি সহায়তা নিন।
  6. স্বামীর সাথে বসে কথা বলুন — শান্ত অবস্থায় আপনার সমস্যা খুলে বলুন।
  7. স্বামীর পরিবারের প্রতি সম্মান — শাশুড়িকে গালি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। তওবা করুন।
  8. সন্তান না হওয়ার বিষয়ে ধৈর্য — আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

গ. তওবা ও ক্ষমা

আপনি যা করেছেন তা আল্লাহর কাছে তওবা করুন:

  1. আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা — ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প।
  2. স্বামীর কাছে ক্ষমা চাওয়া — শুধু মুখে নয়, হৃদয় থেকে।
  3. শাশুড়ির কাছে ক্ষমা চাওয়া — যদি সম্ভব হয়।
  4. কাফফারা — গালি ও অভিশাপের জন্য ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়ুন।

বিশেষ সতর্কতা

আপনার অবস্থা যদি গুরুতর হয় (নিজেকে বা অন্যকে ক্ষতি করার প্রবণতা), তবে অবিলম্বে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন। ইসলাম চিকিৎসার অনুমতি দেয় এবং এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।


উপসংহার

আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে আপনার অবস্থার অবনতি হচ্ছে — এটি একটি ভালো লক্ষণ, কারণ আপনি সমস্যা সম্পর্কে সচেতন। আল্লাহর কাছে তওবা করুন, স্বামীর কাছে ক্ষমা চান, এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসলামী ও চিকিৎসাগত উভয় পদ্ধতি অবলম্বন করুন। আপনার স্বামী আপনাকে ভয় পায় — এটি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো ভালোবাসা, দয়া ও সম্মানের সম্পর্ক।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাগ নিয়ন্ত্রণের তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


তথ্যসূত্র:

  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৭৯, ৪৭৮৪
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৭, ৩৮৯৫
  • মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৬৬৪
  • সূরা আলে ইমরান: ১৩৪
  • সূরা শূরা: ৪৯-৫০
  • রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৭
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩২৯
  • ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২১
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৬

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.