স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার হয়ে যায়, করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমার অনেক বেশি রাগ আর জেদ আমি অনেক খারাপ, আমার হাসবেন্ড এর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করি, একটু উনিশ বিশ হলেই চোখ গরম গালাগালি অনেক খারাপ ভাষা গালি এবং তার মাকে তুলে গালি দেওয়া তার গায়ে হাত তুলা কোনটাই বাদ রাখি না সে অনেক ভয় পায় আমায় আমি তার সাথে এমন করি দেখে কিছু বললে চুপ থাকে, তো আজ একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে, আমি তাকে কিছু গিফট করছি তা ওর ভাই কে দিছে, আমি নিয়ে আসতে বলছে, এর আগেও এমন কীরছে কিছু যদি গিফট কর তার ণাই চায় সে দেয়, তো এটা আমার ভালো লাগে না আমি যা দিছি তা কেন দিবে চাইলেই অন্য টা দেক, যখন দিছে জিনিস গুলো তখনও ঝামেলা হয়ছে, এখন অনেক গালাগালি করছি আমি অনেক চিল্লাচিল্লি করছি, এক সময় কেচে নিছি তাকে মারব, তারপর সেঠা দিয়ে বলছি রাগ করে যে আমার চুল কেটে ফেলব সেও বলছে কাট দেখি আমি কেটে ফেলছে রাগে জিদে, আমি চাইছিলাম যে আমায় না করুক কিন্তু করে নি আমিও কেটে ফেলি, এমনি সব জিনিস আমি ক্ষতি করি কিছু যদি নলি ভাংব ও জোর করে না নিলে ভেংগেই ফেলি, একটু কথা এ দিক সেদিক হলেই তাকে তুই বলি, সে আমার উপর রাগ করলে বা চিল্ললে আমিও আরো বেশি হয় তার থেকে, আমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার, চিল্লাচিল্লি, গালাগালি, করি যখন সে রাগ করে কিছু বললে বা মারতে আসলে আমি যে আর বেশি হয় তাকেই আমি মারি, আজকে এক পর্যায়ে যখন চুল কাটা শেষ চুল দেখে অনেক খাবাপ আর জেদ লাগছিল, শুধু মনে হচ্ছিল যে সে কেন আমায় আটলকালো না না করলে, জোর করে কেচিটা নিলে তো আর কাটতাম না, এই জিদে তাকে এমন ভাবে গলায় চাপ দিছি তার চেহারা কালো হয়ে গেছে, আমি কী করব দিন দিন আমি আর বেশি হচ্ছি আমাকে সাহায্য করুন
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার চিঠি পড়ে অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে আপনার রাগ, জেদ, গালাগালি, মারধর ও স্বামীর প্রতি দুর্ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে—এবং আপনি নিজেই এর সমাধান চাইছেন। এটি একটি ভালো লক্ষণ; আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে পরিবর্তনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
১. প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আপনি যা বর্ণনা করেছেন—স্বামীকে গালাগালি, তার মাকে গালি দেওয়া, তার গায়ে হাত তোলা, গলা চেপে ধরা (যা প্রাণনাশের আশঙ্কা তৈরি করে)—এগুলো শুধু "দাম্পত্য কলহ" নয়; বরং এগুলো কবিরা গুনাহ এবং কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধ। গলা চেপে ধরার ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়াবহ; এতে যদি তার মৃত্যু হয়ে যেত, তাহলে আপনি হত্যাকাণ্ডের গুনাহে জড়িয়ে পড়তেন এবং দুনিয়ার কিসাস-দিয়াতের দায়ও আপনার উপর আসত।
২. কুরআন ও হাদিসের আলোকে দিকনির্দেশনা
(ক) স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "নারীদের উপর পুরুষদের যেমন অধিকার আছে, তেমনি পুরুষদের উপর নারীদেরও অধিকার আছে ন্যায়সঙ্গতভাবে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
(খ) রাগ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَغْضَبْ "রাগ করো না।" — (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ "তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, সে যেন চুপ করে থাকে।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৭)
(গ) গালাগালি ও দুর্ব্যবহার সম্পর্কে
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ "তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর 'ফাসিক' নামটি কতই না মন্দ!" — (সূরা আল-হুজুরাত: ১১)
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক (গুনাহ), আর তার সাথে লড়াই করা কুফরির কাছাকাছি।" — (সহিহ বুখারি: ৪৮)
(ঘ) স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا "যদি আমি কাউকে অন্য কারো জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম।" — (সুনানে তিরমিজি: ১১৫৯)
(ঙ) মাতা-পিতার প্রতি অসম্মান
স্বামীর মাকে গালি দেওয়া—এটি শুধু আপনার স্বামীর প্রতি জুলুম নয়; বরং একজন মুসলিম মায়ের প্রতি চরম অসম্মান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ ... এবং অন্য হাদিসে: مَنْ عَقَّ وَالِدَيْهِ ... পিতা-মাতার প্রতি অসম্মানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। — (সহিহ মুসলিম: ২৫৫)
৩. হানাফি ফিকহের আলোকে করণীয়
(ক) তাওবা করা ফরজ
আপনি যে গুনাহগুলো করেছেন—গালাগালি, মারধর, গলা চেপে ধরা, স্বামীর মাকে গালি—এসব থেকে খাঁটি তাওবা করা আপনার উপর ফরজ। তাওবার শর্ত:
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
- অন্তর থেকে লজ্জিত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প
- যাদের হক নষ্ট করেছেন, তাদের হক আদায় করা বা ক্ষমা চাওয়া
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)
(খ) স্বামীর কাছে ক্ষমা চাওয়া
আপনি স্বামীর গায়ে হাত তুলেছেন, গালি দিয়েছেন, তার মাকে গালি দিয়েছেন—এসবের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তার মায়ের কাছেও ক্ষমা চাওয়া জরুরি। ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, বান্দার হক নষ্ট করলে তাওবা কবুল হয় না যতক্ষণ না হক আদায় বা ক্ষমা নেওয়া হয়।
(গ) স্বামীর সম্পদ/উপহার নিয়ে ঝগড়া
আপনি স্বামীকে উপহার দিয়েছেন, তিনি তা তার ভাইকে দিয়েছেন—এ নিয়ে ঝগড়া করা ইসলামসম্মত নয়। হেবা (উপহার) দেওয়ার পর তা মালিকানার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; এখন তা স্বামীর সম্পদ, তিনি যাকে চান দিতে পারেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার পর দাতার আর তাতে কোনো অধিকার থাকে না।
فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا — (সূরা আন-নিসা: ৪)
তাই এই বিষয়ে আপনার জেদ ও ঝগড়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
(ঘ) চুল কাটা নিয়ে
রাগের বশে নিজের চুল কেটে ফেলা—এটি শুধু নিজের ক্ষতি নয়; বরং নিজের প্রতি জুলুম। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ "নিজেদের হত্যা করো না।" — (সূরা আন-নিসা: ২৯)
(ঙ) জোর করে কিছু নেওয়া বা ভেঙে ফেলা
জোর করে স্বামীর কাছ থেকে কিছু নেওয়া বা ভেঙে ফেলা—এটি গাসব (জবরদখল) ও ইসলামবিরোধী। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) "আল-আসল"-এ বলেছেন, কারো সম্পদ জোরপূর্বক নেওয়া হারাম।
৪. ব্যবহারিক সমাধান (Amali Plan)
| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ১ | আজই স্বামীর কাছে বসে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চান; তার মায়ের কাছেও ক্ষমা চান। | | ২ | রাগের সময় অজু করুন, দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন, শুয়ে পড়ুন, পানি পান করুন। | | ৩ | মুখে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন। | | ৪ | রাগের সময় ঘর থেকে বেরিয়ে যান বা অন্য রুমে চলে যান। | | ৫ | নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন; বিশেষ করে রাতে তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। | | ৬ | সূরা আল-ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা আল-ইখলাস বেশি পড়ুন। | | ৭ | রুকইয়াহ/আমল: সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস পড়ে নিজের উপর ফুঁ দিন। | | ৮ | ডাক্তারি পরামর্শ: রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা থাকলে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—এটি শরিয়তবিরোধী নয়। | | ৯ | ইসলামি বই পড়ুন: "বেহেশতি জেওর" (হাকিমুল উম্মত থানভি রহ.)-এর "স্ত্রী-স্বামীর অধিকার" অধ্যায়। | | ১০ | পারিবারিক মুরুব্বি/ইমামের সাহায্য নিন; প্রয়োজনে দাম্পত্য কাউন্সেলিং করুন। |
৫. বিশেষ নসিহত
প্রিয় বোন, আপনার স্বামী আপনাকে ভয় পায়, চুপ থাকে—এটি আপনার শক্তি নয়, বরং আপনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। মনে রাখবেন:
وَمَا ظَلَمُونَا وَلَٰكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ "তারা আমাদের প্রতি জুলুম করেনি; বরং তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে।" — (সূরা আল-বাকারা: ৫৭)
আপনি যদি এভাবে চলতে থাকেন, তাহলে:
- দাম্পত্য ভেঙে যাবে
- সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে
- কিয়ামতের দিন স্বামী আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার চাইবে
- জান্নাতের সুগন্ধিও পাবেন না (হাদিসে এসেছে)
আল্লাহর কাছে তাওবা করুন, স্বামীর কাছে ক্ষমা চান, এবং আজ থেকেই পরিবর্তন শুরু করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে নরম করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
৬. দুআ
اللَّهُمَّ أَذْهِبْ غَضَبِي وَاجْعَلْ قَلْبِي رَحِيمًا لِزَوْجِي وَأَهْلِهِ، وَأَصْلِحْ بَيْنَنَا، وَاجْعَلْنَا مِنَ الْمُتَحَابِّينَ فِيكَ "হে আল্লাহ! আমার রাগ দূর করুন, আমার অন্তরকে স্বামী ও তার পরিবারের প্রতি দয়ালু করুন, আমাদের মধ্যে সংশোধন করুন, এবং আমাদেরকে আপনার জন্য পরস্পর ভালোবাসাপূর্ণ বানিয়ে দিন।"
والله أعلم بالصواب