প্রতারিত ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার ব্যক্তির জন্য বদদুআ করার বিধান কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: প্রতারিত ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার ব্যক্তির জন্য বদদুআ করার বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, আপনি দুআ করতে পারেন — তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, সরাসরি বদদুআ না করে বরং আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করা, নিজের প্রতি সবর করা এবং ক্ষমা করার চেষ্টা করা সর্বোত্তম। যদি অত্যাচারী ব্যক্তি আপনার হক নষ্ট করে থাকে, তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ (মাজলুমের দুআ) করতে পারেন — এটি শরীয়তসম্মত। তবে ইন্তিকামের উদ্দেশ্যে বদদুআ করা উত্তম নয়; বরং তার হেদায়াত ও সংশোধনের দুআ করা বা নিজের হক ফিরে পাওয়ার দুআ করা ভালো।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মাজলুমের দুআ কবুল হয় — এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তিন ব্যক্তির দুআ رد করা হয় না: রোজাদারের দুআ (ইফতারের সময়), ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ, এবং মাজলুমের দুআ।"
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৯৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৭৫২
অন্য হাদিসে:
"মাজলুমের দুআ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় (আকাশে উঠে যায়)..."
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯
অর্থ: আপনি যদি সত্যিই মাজলুম হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার দুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি বদদুআ করার অনুমতি নয়, বরং আল্লাহর কাছে ইনসাফ প্রার্থনার অনুমতি।
২. বদদুআ করা কি জায়েজ?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বদদুআ করা — যদি সে সত্যিই জালিম হয় এবং আপনার হক নষ্ট করে, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে জায়েজ। কিন্তু এটি আফদাল (উত্তম) নয়।
- সাধারণভাবে বদদুআ করা (যেমন: "আল্লাহ জালিমদের ধ্বংস করুন") — এতে কোনো সমস্যা নেই।
- নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নিয়ে বদদুআ — এড়িয়ে চলাই উত্তম, কারণ এতে হিংসা ও প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হয়।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:
"মাজলুমের দুআ কবুল হয়, কিন্তু মুমিনের উচিত ক্ষমা ও সবরকে প্রাধান্য দেওয়া। কারণ ক্ষমা করলে আল্লাহ তার প্রতিদান দেন এবং অত্যাচারীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি আসে।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে বলেন:
"কেউ যদি আপনার হক নষ্ট করে, তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে দুআ করতে পারেন — তবে সরাসরি বদদুআ না করে আল্লাহর কাছে ইনসাফ প্রার্থনা করা এবং নিজের হক ফিরে পাওয়ার দুআ করা উত্তম।"
৩. কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যদি তোমরা ক্ষমা কর, উপেক্ষা কর এবং মার্জনা কর, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
— সূরা আন-নূর: ২২
"যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে — আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।"
— সূরা আলে ইমরান: ১৩৪
"আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
— সূরা আন-নিসা: ১০৬
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ বলেন:
"মাজলুমের জন্য দুআ করার অনুমতি আছে, কিন্তু ক্ষমা করা অধিক উত্তম। কারণ ক্ষমা করলে আল্লাহ অত্যাচারীর উপর শাস্তি দেন এবং মাজলুমকে প্রতিদান দেন।"
৪. হাদিসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি অত্যাচারিত হওয়ার পরও ক্ষমা করে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করেন।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮
"তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? তাহলে তোমরা মানুষকে ক্ষমা করো।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯১
ইমাম তাহাবি (রহ.) "শরহু মাআনিল আসার"-এ বলেন:
"মাজলুমের দুআ কবুল হয়, কিন্তু ক্ষমা করা তার চেয়ে উত্তম। কারণ ক্ষমা করলে আল্লাহ অত্যাচারীর উপর শাস্তি দেন এবং মাজলুমকে প্রতিদান দেন।"
৫. আপনার করণীয়
| করণীয় | বিধান | |--------|-------| | সবর করা | উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ | | আল্লাহর কাছে ইনসাফ প্রার্থনা করা | জায়েজ | | নিজের হক ফিরে পাওয়ার দুআ | জায়েজ | | অত্যাচারীর হেদায়াতের দুআ | উত্তম | | সরাসরি বদদুআ করা | জায়েজ নয় (আফদাল নয়) | | ক্ষমা করা | সর্বোত্তম |
আপনি এই দুআ করতে পারেন:
"হে আল্লাহ! আপনি ইনসাফকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম ইনসাফকারী। আমার উপর যে জুলুম হয়েছে, তার ইনসাফ আপনি করুন। যদি সে ফিরে আসে, তাকে হেদায়াত দিন। আর যদি না ফিরে আসে, আপনার العدل অনুযায়ী তার বিচার করুন।"
৬. বিশেষ সতর্কতা
- বদদুআ করার আগে নিজের হাত পরিষ্কার করুন — আপনি কি সত্যিই নিরপরাধ?
- বদদুআ করলে আপনার নিজের আমল কমে যেতে পারে, কারণ এটি প্রতিশোধের মনোভাব।
- ক্ষমা করলে আল্লাহ আপনার সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং অত্যাচারীর উপর শাস্তি দেন।
- যদি আপনার হক নষ্ট হয় (যেমন: টাকা, সম্পদ), তাহলে শরীয়তসম্মত উপায়ে তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করুন।
উপসংহার
হ্যাঁ, আপনি দুআ করতে পারেন — তবে বদদুআ না করে আল্লাহর কাছে ইনসাফ প্রার্থনা করুন। ক্ষমা করা সর্বোত্তম, কারণ এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম। যদি অত্যাচারী আপনার হক নষ্ট করে, তাহলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন — তিনি সর্বোত্তম বিচারক।
"আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন পাকড়াও করেন, তখন আর ছাড়েন না।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৬৮৬