বাবা-মা স্বামীকে না মানলে বা সম্পর্ক ছিন্ন করলে ইসলাম কী বলে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
বাবা-মা স্বামীকে না মানলে করণীয় কী?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—যদি তার বাবা-মা তার স্বামীকে মেনে না নেন এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন, তাহলে তার কী করা উচিত? বাবা-মায়ের সাথে থাকা উচিত, নাকি স্বামীর সাথে সংসার করা উচিত?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও সমাধান
১. বিবাহ ইসলামে একটি পবিত্র ও দৃঢ় বন্ধন
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
"আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।" — সূরা আর-রূম: ২১
২. স্বামীর আনুগত্য ও তার হক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
"যদি আমি কাউকে অন্য কারো জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে নারীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম।" — সুনানে তিরমিযী: ১১৫৯; মুসনাদে আহমাদ
ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো—বিবাহের পর স্ত্রীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব স্বামীর ঘর সংসার করা। স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব (ফরজের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত)। পিতামাতার আনুগত্য স্বামীর আনুগত্যের সাথে সাংঘর্ষিক হলে স্বামীর আনুগত্য অগ্রগণ্য।
৩. তবে পিতামাতার হকও অস্বীকার করা যাবে না
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
"আর পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — সূরা বনী ইসরাইল: ২৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
"প্রভুর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে, আর প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।" — সুনানে তিরমিযী: ১৮৯৯
৪. সমাধানের সঠিক পদ্ধতি
ক. স্বামীর সাথে সংসার করাই শরীয়তসম্মত কর্তব্য: বিবাহ বৈধ ও শরীয়তসম্মত হলে স্ত্রীর উপর ওয়াজিব হলো স্বামীর সাথে সংসার করা। পিতামাতার অসম্মতির কারণে বৈধ বিবাহ ভেঙে ফেলা বা স্বামীকে ত্যাগ করা ইসলামে জায়েজ নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব, এবং পিতামাতার আনুগত্য নফল ইবাদতের পর্যায়ে—যা ওয়াজিবের সাথে সংঘর্ষ হলে ওয়াজিব অগ্রগণ্য হয়।
খ. পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না: স্বামীর সাথে সংসার করলেও পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার, খোঁজখবর, সালাম-সম্ভাষণ, উপহার, সাক্ষাৎ ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে নিষিদ্ধ (সূরা মুহাম্মাদ: ২২-২৩)।
গ. ধৈর্য ও দু'আ: পিতামাতাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, সম্মান ও ভালোবাসার সাথে। তাদের জন্য দু'আ করুন। স্বামীকেও বলুন পিতামাতার প্রতি সম্মান দেখাতে। সময়ের সাথে আল্লাহ তা'আলা মনের মিল তৈরি করে দিতে পারেন।
ঘ. মধ্যস্থতাকারী: পরিবারের সম্মানিত আলেম, মুফতি বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করুন।
৫. বিশেষ সতর্কতা
- যদি স্বামী দ্বীনদার, চরিত্রবান ও সৎ হয় এবং বিবাহ শরীয়তসম্মত হয়—তবে তার সাথেই সংসার করা কর্তব্য।
- যদি পিতামাতার আপত্তি শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া হয় (যেমন বংশগত অহংকার, যৌতুকের দাবি ইত্যাদি)—তবে তা মানা যাবে না।
- তবে যদি স্বামী দ্বীনহীন, চরিত্রহীন বা স্ত্রীর উপর জুলুমকারী হয় এবং পিতামাতার আপত্তি শরীয়তসম্মত হয়—তবে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
সিদ্ধান্ত
শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পথ হলো:
১. স্বামীর সাথে সংসার করা—কারণ এটি ওয়াজিব এবং বিবাহ একটি দৃঢ় চুক্তি। ২. পিতামাতার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা—সদ্ব্যবহার, খোঁজখবর, দু'আ ও সম্মান চালিয়ে যাওয়া। ৩. ধৈর্য, দু'আ ও মীমাংসার চেষ্টা—সময়ের সাথে আল্লাহ মিল করে দিতে পারেন। ৪. পিতামাতার অবাধ্যতা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়—বরং তাদের প্রতি ইহসান ও ভালোবাসা বজায় রাখা।
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা: ১৯
والله أعلم بالصواب