আকিমুদ দ্বীন এর সঠিক ব্যাখ্যা কি? নবীজি সাঃ, সাহাবী, তাবীঈ , তাবে তাবেঈ , মুজতাহিদ ইমাম গণের ব্যাখ্যা কি ছিল ? বিস্তারিত জানতে চাই।
Faith and Belief · Hanafi
Question
নবীজি সাঃ, সাহাবী, তাবীঈ , তাবে তাবেঈ , মুজতাহিদ ইমাম গণের ব্যাখ্যা কি ছিল ? বিস্তারিত জানতে চাই।
Answer
আকিমুদ দ্বীন (إقامة الدين) এর সঠিক ব্যাখ্যা
ভূমিকা
"আকিমুদ দ্বীন" বা "ইকামতে দ্বীন" (إقامة الدين) শব্দটি কুরআন ও হাদীসে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। এর আভিধানিক অর্থ হলো—দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা, কায়েম করা, সুপ্রতিষ্ঠিত করা। তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. কুরআনে "ইকামতে দ্বীন" এর উল্লেখ
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই পথ নির্ধারিত করেছেন, যা তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং যা আমি আপনার প্রতি ওহী করেছি এবং যা আমি ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না।"
— সূরা আশ-শূরা: ১৩
আল্লাহ আরও বলেন:
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ
"তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।"
— সূরা আল-আনফাল: ৩৯
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ
"তিনি সেই সত্তা, যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি তা সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন।"
— সূরা আত-তাওবা: ৩৩
২. "আকিমুদ দ্বীন" এর সঠিক ব্যাখ্যা
ক. আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
ইকামত (إقامة) শব্দের মূল হলো "কাওম" (قوم), যার অর্থ—দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তাই ইকামত অর্থ—কোনো কিছুকে সোজা করে দাঁড় করানো, প্রতিষ্ঠিত করা, কায়েম করা।
ইকামতে দ্বীন অর্থ—দ্বীনকে তার প্রকৃত রূপে প্রতিষ্ঠিত করা, দ্বীনের সকল বিধানকে জীবনে ও সমাজে কায়েম করা।
খ. ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরামের অভিমত
১. ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন:
"ইকামতে দ্বীন অর্থ—দ্বীনের সকল বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করা, তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, তার আকীদা-বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করা।"
(তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আশ-শূরা: ১৩)
২. ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন:
"ইকামতে দ্বীন হলো—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাতের বিশ্বাস এবং দ্বীনের সকল আহকামকে প্রতিষ্ঠিত করা। এর মধ্যে ইবাদত, মুআমালাত, আখলাক—সবই অন্তর্ভুক্ত।"
(তাফসীরে কুরতুবী)
৩. আল্লামা শাওকানী (রহ.) বলেন:
"দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ—দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং শিরক-কুফর থেকে বেঁচে থাকা।"
(ফাতহুল কাদীর)
৪. মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে লেখেন:
"ইকামতে দ্বীন মানে—দ্বীনের শিক্ষা ও বিধানকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। এটি কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের দাবি রাখে।"
(মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আশ-শূরা: ১৩)
৩. নবীজি সাঃ এর ব্যাখ্যা ও আমল
ক. হাদীসে ইকামতে দ্বীন
রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন:
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
"ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর স্থাপিত: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাঃ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত দেওয়া, হজ করা এবং রমাদানের রোজা রাখা।"
— সহীহ বুখারী: ৮, সহীহ মুসলিম: ১৬
এখানে "ইকামুস সালাত" (সালাত কায়েম করা) শব্দটি লক্ষণীয়। সালাতকে প্রতিষ্ঠিত করা—অর্থাৎ তার সকল শর্ত, আরকান, ওয়াজিব ও সুন্নতসহ পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করা এবং নিয়মিত তা পালন করা।
খ. নবীজি সাঃ এর আমল
রাসূলুল্লাহ সাঃ মক্কায় ১৩ বছর দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন—তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, শিরক উচ্ছেদ, আখিরাতের বিশ্বাস দৃঢ় করা। মদীনায় হিজরতের পর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বিধান কার্যকর, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা—সবই ইকামতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত।
হাদীস:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো মুনকার (গর্হিত কাজ) দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে; যদি না পারে, তবে জিহ্বা দ্বারা; যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দ্বারা।"
— সহীহ মুসলিম: ৪৯
এটি ইকামতে দ্বীনের একটি বাস্তব প্রয়োগ—দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
৪. সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা ও আমল
ক. হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)
তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম ভাষণে বলেন:
"আমি দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক চেষ্টা করব। যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।"
তিনি মুর্সালীন ও মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা করেছেন।
খ. হযরত উমর ফারুক (রাঃ)
তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, বিচারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন:
"আমি দ্বীনের সেই পথে চলব, যা রাসূলুল্লাহ সাঃ ও আবু বকর (রাঃ) প্রতিষ্ঠা করেছেন।"
গ. হযরত উসমান গনী (রাঃ)
তিনি কুরআন সংকলন করে দ্বীনের মূল উৎসকে সংরক্ষণ করেন—এটি ইকামতে দ্বীনের এক অনন্য উদাহরণ।
ঘ. হযরত আলী (রাঃ)
তিনি খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যা রক্ষা করেন এবং বলেন:
"দ্বীনের প্রতিষ্ঠা কেবল ইবাদতের মধ্যে নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাও দ্বীনের অংশ।"
৫. তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের ব্যাখ্যা
ক. হাসান বসরী (রহ.)
তিনি বলেন:
"ইকামতে দ্বীন হলো—দ্বীনের জ্ঞান অর্জন, আমল করা, দাওয়াত দেওয়া এবং দ্বীনের পথে কষ্ট সহ্য করা।"
খ. ইমাম আওযায়ী (রহ.)
তিনি বলেন:
"দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ—সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং বিদআত থেকে বেঁচে থাকা।"
গ. সুফিয়ান সাওরী (রহ.)
তিনি বলেন:
"দ্বীনের প্রতিষ্ঠা হলো—ইলম, আমল ও ইখলাসের সমন্বয়।"
৬. মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যা
ক. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)
তিনি দ্বীনের প্রতিষ্ঠার জন্য ফিকহী ইজতিহাদ করেছেন—যাতে দ্বীনের বিধানগুলো যুগে যুগে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন:
"দ্বীনের প্রতিষ্ঠা হলো—কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ এবং ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে নতুন সমস্যার সমাধান করা।"
(আল-হিদায়া, ১ম খণ্ড)
খ. ইমাম মালিক (রহ.)
তিনি মদীনার আমলকে দ্বীনের প্রতিষ্ঠার মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেন।
গ. ইমাম শাফেঈ (রহ.)
তিনি উসূলুল ফিকহের মাধ্যমে দ্বীনের বিধানকে সুসংহত করেন।
ঘ. ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)
তিনি বলেন:
"দ্বীনের প্রতিষ্ঠা হলো—সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং বিদআতীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।"
ঙ. ইমাম তাহাবী (রহ.)
তিনি "আকীদাতুত তাহাবীয়া" গ্রন্থে দ্বীনের মৌলিক বিশ্বাসকে সংকলিত করেন—যা ইকামতে দ্বীনের আকীদাগত ভিত্তি।
চ. ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.)
রাদ্দুল মুহতারে তিনি লেখেন:
"ইকামতে দ্বীন হলো—দ্বীনের সকল বিধানকে তার প্রকৃত রূপে প্রতিষ্ঠিত করা, যা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে প্রমাণিত।"
(রাদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড)
ছ. মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
বেহেশতী যেওরে তিনি লেখেন:
"দ্বীনের প্রতিষ্ঠা হলো—আকীদা, ইবাদত, মুআমালাত, আখলাক ও সমাজব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধান মেনে চলা।"
(বেহেশতী যেওর)
জ. মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.)
তিনি বলেন:
"ইকামতে দ্বীন কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং দ্বীনের দাওয়াত, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিচার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠা করা।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ১ম খণ্ড)
৭. ইকামতে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ ধারণা
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে ইকামতে দ্বীনের কয়েকটি স্তর চিহ্নিত করা যায়:
| স্তর | বিবরণ | |------|--------| | ১. আকীদাগত | তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাতের বিশ্বাস দৃঢ় করা | | ২. ইবাদতগত | সালাত, সাওম, যাকাত, হজ—সকল ইবাদত পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় | | ৩. ব্যক্তিগত | হালাল-হারাম মেনে চলা, আখলাক উন্নত করা | | ৪. পারিবারিক | পরিবারে দ্বীনের শিক্ষা ও পরিবেশ প্রতিষ্ঠা | | ৫. সামাজিক | সমাজে ইনসাফ, ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা | | ৬. অর্থনৈতিক | হালাল উপার্জন, সুদমুক্ত ব্যবস্থা, যাকাত ব্যবস্থা | | ৭. রাষ্ট্রীয় | দ্বীনের বিধান অনুযায়ী শাসন, বিচার ও প্রশাসন | | ৮. দাওয়াতি | দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া | | ৯. জিহাদি | দ্বীনের পথে সংগ্রাম, বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো |
৮. নবীজি সাঃ কে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
আল্লাহ পাক নবীজি সাঃ কে "ইকামতে দ্বীন" এর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন:
১. দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা — কেবল কিছু ইবাদত নয়; বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধান কার্যকর করা।
২. বিভেদ সৃষ্টি না করা — দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে ঐক্য রক্ষা করা, ফির্কাবাজি না করা।
৩. পূর্ববর্তী নবীদের দ্বীনের ধারাবাহিকতা — নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা (আঃ) সকলেই একই দ্বীনের প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দিয়েছেন।
৪. দ্বীনের বিজয় — দ্বীনকে সমস্ত বাতিল মতবাদের উপর বিজয়ী করা।
৫. দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ — রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গঠন করা।
৯. উপসংহার
আকিমুদ দ্বীন বা ইকামতে দ্বীন এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো—দ্বীনকে তার প্রকৃত রূপে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পালন করা, প্রতিষ্ঠিত করা। এটি কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আকীদা, ইবাদত, মুআমালাত, আখলাক, অর্থনীতি, বিচার, শাসন—সব ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধান কার্যকর করা।