মা, বাবা,স্বামী ছাড়া আলাদা নিজের, সন্তানের নিরাপত্তা নিঃসিচ করবো কিভাবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 6447
Questioner: Li Za
Question Asked: 05 Oct 2026, 10:19 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 02:18 AM
Views: 8
Tokens: 11,809
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ উস্তাদ
১/ আমার আগের করা প্রশ্নের উত্তরে আপনি বলেছেন খোলার ব্যবস্থা করতে এবং নিয়ে সন্তানের নিরাপদ বাসস্থান এবং হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু শূন্য হাতে যেখানে আমাকে হেফাজত করার কেউ নেই না মা না বাবা। আর আমার বাচ্চাকে আমার থেকে জোর করে কেড়ে নিতে চায় কারণ সে ছেলে অনেকেই। ছেলে হওয়ায় সবাই(আমার স্বামী ,মা,বাবা) তাকে শুধু তাদের স্বার্থের কারণেই চায়।আমাকে নিয়ে কারো কিছু যায় আসে না। এমন অবস্থায় ছোট বাচ্চা নিয়ে আমি একটা একলা মেয়ে হয়ে থাকা,খাওয়ার ব্যবস্থা কি করে করবো? বাচ্চা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করব কিভাবে?
২/ ইসলামে নারী/মেয়েদের হক বা অধিকার কি কি? আমাদের সমাজের পুরুষরা বলেন মেয়েরা সব মেনে নিবে,মাথা নিচু করে চলবে ইত্যাদি কেননা তারা ইনকাম করে না। মেয়ে,স্ত্রী,মা হিসেবে পুরুষদের কাছে থেকে কিংবা মা,বোন,শাশুড়ির কাছে থেকেও অবহেলা,জুলুমের শিকার হই। আরও যেমন: বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের অতীত ম্যাটার না করলেও মেয়েদের করে,মেয়েদের শুধরানোর সুযোগ দেওয়া হয় না কিন্তু পুরুষদের দেওয়া হয় সে বার বার অপরাধ করলেও। এমনও হয় যে মেয়েদের দিন্দরিত্বের দোহাই দিয়ে সব মেনে নিতে বলা হয়। যেমন: আমার স্বামীর একাধিক পরকীয়ার কারণে ডিভোর্স হয়েছিল এই কারণ টা লুকিয়ে বিয়ে করেছে,বিয়ের পর অনেকে বলেছে আমি দীনদার,শিক্ষিত তাহলে কেনো এসব মানবো না এমনকি শারীরিক,মানসিক নির্যাতন ঠিক মত ভরণপোষণ আদায় না করলেও এরকম দোহাই দিয়ে চুপ করায় দেওয়া হয় শুধু আমি আল্লাহর হুকুম মানি জন্য। উল্টো আমি কোনো ছোট ভুল করলে তারা বলে আমি দীনদার এই সেই তাহলে কেনো ভুল হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।নারীদের নিচু করে রাখা,তাদের জিম্মি করে রাখা, পুরুষরা শুধুমাত্র তাদের ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা,পুরুষের 99 টা ভুল কে ভুল মনে না করে মেয়েদের 1 টা ভুল কে অপরাধ হিসেবে নেওয়া ইত্যাদি কি ইসলামে আধও আছে? আর এরকম চিন্তার মানুষদের কি বলে?আর এদের উত্তর কিভাবে দিবো? আর উত্তর দিলে কি পাপ হবে?
৩/ এমন মা বাবা যারা বালেগা মেয়ের মতামত ছাড়া তাকে নানা ভাবে জোর করে বিয়ে দিয়েছে এক লেবাস ধারির সাথে। বিয়ের পর শারীরিক,মানসিক নির্যাতনের স্বীকার এবং ভরণপোষণ আদায় না করলেও তারা আবার মেয়েকে জোর করে পাঠায় তাদের সম্মান আর স্বার্থের কারণে। এমনকি এক পর্যায় মা বাবা সেই মেয়েকে মেরে ফেলারও চেষ্টা করে। বাধ্য হয়ে সেই স্বামীর কাছে ফিরলে আগের মতোই জুলুম শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তবুও সেই মা বাবা তাদের সম্মান, স্বার্থকেই আগে দেখে তাতে মেয়ে মরে যাক।এমন মা বাবার জন্য আল্লাহ্ তায়ালা কি বলেন? সন্তানকে তারা তাদের ব্যক্তিগত মনে করে নিজের খুশি মতো সব চাপায় দেয়। হালাল হারাম মেনে চলে না সন্তান হারাম মানতে না চাইলে বদদুআ,অভিশাপ দেয়,খারাপ সন্তানদের ট্যাগ দেয়। এমন সন্তানরা কে কি মা বাবার অবাধ্য বলে?

Answer

উত্তর

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ধৈর্য সহকারে উত্তর দিচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর রহম করুন এবং আপনার কষ্ট দূর করুন।


১ম প্রশ্ন: স্বামী, মা-বাবা ছাড়া সন্তান নিয়ে একা জীবন শুরু করা

ইসলামী দৃষ্টিকোণ:

আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। ইসলামে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেবেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমি আমার বান্দার প্রতি তার ধারণা অনুযায়ী আচরণ করি।" (সহীহ বুখারী)

করণীয়:

১. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করুন — আপনি একা নন, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন।

২. হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা করুন:

  • ঘরে বসে সেলাই, হস্তশিল্প, অনলাইন কাজ, টিউশন ইত্যাদি
  • সরকারি/বেসরকারি নারী সহায়তা সংস্থা (যেমন: মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জয়িতা ফাউন্ডেশন)
  • স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন

৩. নিরাপদ বাসস্থান:

  • ভাড়া বাসা, নারী হোস্টেল, বা আত্মীয়ের বাড়ি (বিশ্বস্ত হলে)
  • সরকারি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল (হটলাইন ১০৯) এ যোগাযোগ করুন

৪. সন্তানের হেফাজত:

  • ইসলামী শরীয়তে মায়ের হেফাজতের অধিকার রয়েছে (বিশেষত ছোট সন্তানের ক্ষেত্রে)
  • ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: ছেলে সন্তান ৭ বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে, এরপর পিতার কাছে। তবে পিতা যদি অযোগ্য হয়, তাহলে মায়ের কাছেই থাকবে।

৫. আইনি সহায়তা:

  • পারিবারিক আদালতে হেফাজত ও ভরণপোষণের মামলা করুন
  • বিনামূল্যে আইনি সহায়তার জন্য জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা (NLASO) যোগাযোগ করুন

২য় প্রশ্ন: ইসলামে নারীর অধিকার ও সমাজের জুলুম

ইসলামে নারীর মর্যাদা:

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।" (সূরা আহযাব: ৩৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে।" (তিরমিযী)

"নারীরা পুরুষের সহযোগী (সহোদর)।" (আবু দাউদ)

নারীর অধিকার (সংক্ষেপে):

| ক্ষেত্র | ইসলামী বিধান | |--------|--------------| | শিক্ষা | পুরুষের সমান অধিকার | | সম্পত্তি | উত্তরাধিকারে অধিকার | | বিবাহ | সম্মতি ছাড়া বিয়ে অবৈধ | | মোহর | নারীর সম্পূর্ণ অধিকার | | ভরণপোষণ | স্বামীর উপর ওয়াজিব | | নির্যাতন | সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | | মতামত | স্বাধীনভাবে দেওয়ার অধিকার |

সমাজের ভুল ধারণা:

আপনার বর্ণিত বিষয়গুলো — নারীকে নিচু করা, জিম্মি করা, ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা, পুরুষের ৯৯টি ভুল ক্ষমা করা কিন্তু নারীর ১টি ভুল অপরাধ গণ্য করা — এগুলো ইসলামের শিক্ষা নয়, বরং সমাজের কুপ্রথা ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নারীদের সাথে জোর-জবরদস্তি করো না।" (সূরা নিসা: ১৯)

"আর পুরুষদের উপর নারীদেরও অধিকার রয়েছে, যেমন নারীদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২২৮-এর ব্যাখ্যায়)

এমন চিন্তার মানুষদের সম্পর্কে:

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন: যে ব্যক্তি শরীয়তবিরোধী কাজ করে এবং নারীর অধিকার হরণ করে, সে যালিম। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ও অধিকার দাবি করা জায়েয।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফতোয়ায়ে উসমানি-তে বলেন: নারীর প্রতি নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া, জোরপূর্বক কিছু চাপানো — সবই গুনাহ ও হারাম।

উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি:

১. ধৈর্য ও হিকমতের সাথে — রাগ না করে, দলিলসহ বোঝান ২. আলেমদের পরামর্শ নিন — সরাসরি তর্ক না করে বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে বোঝান ৩. উত্তর দেওয়া কি পাপ? — না, বরং সত্য কথা বলা ও জুলুমের প্রতিবাদ করা সওয়াবের কাজ। তবে গালি, অশ্লীলতা বা অসম্মানজনক ভাষা পরিহার করুন।

আল্লাহ বলেন:

"তোমরা সত্য কথা বলো, যদিও তা তিক্ত হয়।" (হাদীস)


৩য় প্রশ্ন: জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া মা-বাবার বিধান

ইসলামী বিধান:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"কুমারী মেয়ের সম্মতি ছাড়া তার বিয়ে দেওয়া যাবে না।" (সহীহ বুখারী, মুসলিম)

"বালেগা মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে অবৈধ।" (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুন নিকাহ)

জোরপূর্বক বিয়ের হুকুম:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে: বালেগা মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে ফাসিদ (বাতিল)।

ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন: জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া মা-বাবার জন্য হারাম ও গুনাহের কাজ।

নির্যাতনকারী মা-বাবা সম্পর্কে:

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর তোমরা তাদের প্রতি সদয় আচরণ করো... নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।" (সূরা নাহল: ৯০)

"যে ব্যক্তি জুলুম করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন।" (সূরা শূরা: ৪০)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি তার সন্তানকে জুলুম করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসনাদ আহমাদ)

সন্তানের কর্তব্য:

১. মা-বাবার প্রতি সদাচরণ — ইসলামে মা-বাবার অধিকার সর্বোচ্চ ২. কিন্তু গুনাহের কাজে আনুগত্য নয় — রাসূল ﷺ বলেছেন: "সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা নেই।" (সহীহ মুসলিম) ৩. নির্যাতন সহ্য করা ফরজ নয় — নিজের জান, ইজ্জত ও সন্তানের হেফাজত করা অগ্রাধিকার ৪. বদদুআ/অভিশাপ দেওয়া — মা-বাবার জন্য এটি গুনাহ, কারণ রাসূল ﷺ বদদুআ করতে নিষেধ করেছেন

এমন সন্তান কি মা-বাবার অবাধ্য?

না। যদি মা-বাবা হারাম কাজে বাধ্য করে (যেমন: জোরপূর্বক বিয়ে, নির্যাতন সহ্য করা), তাহলে তা মানতে অস্বীকার করা অবাধ্যতা নয়, বরং আল্লাহর হুকুম পালন।

ইমাম গাজালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন-এ বলেন: "মা-বাবার আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ — যদি তা আল্লাহর নাফরমানির দিকে না নিয়ে যায়।"


সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | নিরাপত্তা | সরকারি হেল্পলাইন (১০৯), আইনি সহায়তা | | রিযিক | হালাল উপার্জনের চেষ্টা, আল্লাহর উপর ভরসা | | সন্তান | হেফাজতের জন্য আদালতে আবেদন | | জুলুম | ধৈর্য + প্রতিবাদ + আলেমের পরামর্শ | | মা-বাবা | সদাচরণ, কিন্তু গুনাহে আনুগত্য নয় | | উত্তর দেওয়া | হিকমতের সাথে, পাপ নয় বরং সওয়াব |

আল্লাহ তা'আলা আপনার সহায় হোন। আপনার জন্য দোয়া করি — আল্লাহ আপনার কষ্ট দূর করুন, নিরাপত্তা দিন, হালাল রিযিক দিন এবং আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.