ভাবির গর্ভাবস্থায় দায়িত্ব পালন করা কি আমার উপর ফরজ? ইসলামী শরীয়তে ভাবির দেখাশোনার দায়িত্ব কার?
Family Life · Hanafi
Question
আমার ভাবি উনি একটু অন্যরকম কারো সাথে মিশে না, কারো সাথে কথা বলে না " কিছু সময় উনার ব্যবহারে আমি এত হার্ড, এত কষ্ট পাই বলার মতো না " আমি চাই ভালো থাক উনি" উনার এখন বাচ্চা হবে, উনার ব্যবহারে ইচ্ছা করে না ওনার সামনে যাই উনার সাথে কথা বলতে'' যাই হোক উনাকে যদি আমি ডাক্তারের কাছে না নিয়ে যাই উনার এই বাচ্চা হওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থেকে আমি দূরে থাকি " আমার বদলে আমার মা আছে উনার মা আছে ভাই বোন আছে তারা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে "আমি যদি এই দায়িত্ব নেয়ার সম্পূর্ণ দূরে থাকি ভদ্রতার সাথে দায়িত্ব নিযয়া পরিহার করে থাকি '' আমার ঠিক গুনাহ হবে? আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কি আমার প্রতি অসন্তুষ্টি হবে?
আমার খুব ভয় হচ্ছে?
Answer
পারিবারিক সমস্যা: ভাবির গর্ভাবস্থায় দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১. মূল নীতি: দায়িত্ব কার?
ইসলামী শরীয়তে গর্ভবতী স্ত্রীর দেখাশোনা, চিকিৎসা করানো এবং সন্তান জন্মদানের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রাথমিক দায়িত্ব স্বামীর। এটি স্বামীর বৈবাহিক ও পারিবারিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।" — (সহীহ বুখারী: ৭১৩৮, সহীহ মুসলিম: ১৮২৯)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৩/৫৭৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, স্ত্রীর নফকা (ভরণপোষণ) ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা স্বামীর উপর ওয়াজিব।
২. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
আপনি যদি ভাবির গর্ভাবস্থা ও প্রসব সংক্রান্ত দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পরিহার করেন, তাহলে:
- আপনার ভাই (স্বামী) সরাসরি গুনাহগার হবেন, কারণ এটি তাঁর স্ত্রীর প্রতি তাঁর দায়িত্ব।
- আপনার উপর সরাসরি কোনো ফরজ দায়িত্ব নেই — ভাবি আপনার স্ত্রী নন, তাই তাঁর নফকা ও চিকিৎসার দায়িত্ব আপনার উপর শরীয়তগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।
- তবে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া এবং সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো আচরণ করা ইসলামী আদব ও আখলাকের পরিপন্থী।
৩. তবে সতর্কতার বিষয়
আপনি লিখেছেন — "উনার ব্যবহারে ইচ্ছা করে না ওনার সামনে যাই, উনার সাথে কথা বলতে যাই।" এখানে দুটি দিক আছে:
(ক) আপনার অনুভূতি: কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখায়:
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ — (সূরা আশ-শু'আরা: ৮০)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিযী: ৩৮৯৫)
(খ) ভদ্রতার সাথে দায়িত্ব পরিহার: আপনি যদি ভদ্রভাবে, সম্মান বজায় রেখে, সম্পর্ক ঠিক রেখে দায়িত্ব অন্যদের (মা, ভাই-বোন) উপর ছেড়ে দেন — এতে সরাসরি গুনাহ হবে না, তবে আখলাকী দিক থেকে এটি প্রশংসনীয় নয়।
৪. আল্লাহর অসন্তুষ্টি প্রসঙ্গে
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ ও ইহসানের (সদাচরণের) নির্দেশ দেন।" — (সূরা আন-নাহল: ৯০)
ইহসান অর্থ — যা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও সদাচরণ করা। ভাবির প্রতি সহানুভূতি, সামান্য সহযোগিতা, খোঁজখবর নেওয়া — এগুলো ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো পরিহার করলে গুনাহ না হলেও সওয়াব ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবেন।
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | দায়িত্ব | ভাইয়ের সাথে কথা বলে দায়িত্ব ভাগ করে নিন — সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাবেন না | | সম্পর্ক | ভাবির সাথে ভদ্রতা ও সালাম বজায় রাখুন | | সহযোগিতা | সরাসরি দায়িত্ব না নিলেও মাঝে মাঝে খোঁজ নিন, প্রয়োজনে সাহায্য করুন | | দুআ | ভাবির সুস্থতা ও সন্তানের কল্যাণের জন্য দুআ করুন | | সীমা | নিজের সামর্থ্য ও অবস্থানের সীমা মেনে চলুন — অতিরিক্ত বোঝা নেবেন না |
৬. ভয় প্রসঙ্গে
আপনার ভয় স্বাভাবিক, কিন্তু মনে রাখবেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ "তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।" — (সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)
আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না (সূরা বাকারা: ২৮৬)। আপনি যদি সামর্থ্য ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যান, তবে আখলাকী দিক থেকে দায়বদ্ধ হবেন। আর যদি বাস্তব অক্ষমতা বা ভাইয়ের উপস্থিতির কারণে দায়িত্ব না নেন, তবে গুনাহ নেই।
সারসংক্ষেপ
- ভাবির গর্ভাবস্থার মূল দায়িত্ব আপনার ভাইয়ের — আপনার উপর ফরজ নয়।
- সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া ও সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামী আদবের পরিপন্থী।
- ভদ্রতা বজায় রেখে, সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা — এটাই উত্তম পথ।
- গুনাহ হবে কি না — নির্ভর করে আপনার নিয়ত ও সামর্থ্যের উপর। সামর্থ্য থাকলে এড়িয়ে যাওয়া আখলাকী গুনাহ।
- দুআ করুন, ভদ্রতা বজায় রাখুন, ভাইয়ের সাথে সমন্বয় করুন — এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب