ওয়াসওয়াসা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কী করবেন? কুরআন ছুঁয়ে কসম করে নামাজ না ভাঙার শর্ত দিলে এবং কসম ভেঙে গেলে করণীয় কী?

Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6431
Questioner: Nadia 0696
Question Asked: 05 Oct 2026, 05:33 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 06:30 PM
Views: 11
Tokens: 3,962
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহী ওয়া বারকাতুহু। আমার ওয়াস ওয়াসা অনেক বেশি আমার নিয়ন্ত্রণ ও থাকেনা অনেক সময় ইচ্ছে করে না করলেও ওয়াস ওয়াসা দেয়।,,যদি কুরআন ছুঁয়ে কসম করে বলি যে আমি নামাজ ভাঙবোনা আর যদি ভাঙি তাহলে আমি মুসলমান না কিন্তু নামাজ ভেঙে পেললে করণীয় কী?

Answer

ওয়াসওয়াসা নিয়ন্ত্রণ ও কুরআন ছুঁয়ে কসম করার বিধান

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। নিচে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং প্রখ্যাত সালাফী আলিমদের ফতোয়ার ভিত্তিতে উত্তর দিচ্ছি।


প্রথমত: ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) সম্পর্কে

ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।" — (সূরা ইউসুফ: ৫)

আল্লাহ আরও বলেন:

"আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে তোমার কাছে কোনো কুমন্ত্রণা আসে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" — (সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ: ৩৬)

সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"শয়তান আদম সন্তানের রক্তনালীতে রক্তের মতো চলাচল করে।" — (সহীহ বুখারী: ৩২৮১, সহীহ মুসলিম: ২১৭৪)

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসা ঈমানের ক্ষতি করে না, বরং তা ঈমানের প্রমাণ — কারণ শয়তান কেবল সেই হৃদয়ে ওয়াসওয়াসা দেয় যেখানে ঈমান আছে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৪/১৪০)

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায় হলো — তা উপেক্ষা করা, আল্লাহর যিকির করা এবং শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)


দ্বিতীয়ত: কুরআন ছুঁয়ে কসম করার বিধান

কসম করার সঠিক পদ্ধতি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কসম করবে, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে।" — (সহীহ বুখারী: ২৬৭৯, সহীহ মুসলিম: ১৬৪৬)

শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন: "কুরআন ছুঁয়ে কসম করা বা কুরআনের নামে কসম করা — এগুলো সবই আল্লাহর নামে কসম করার অন্তর্ভুক্ত, কারণ কুরআন আল্লাহর কালাম। তবে কসম করার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো 'ওয়াল্লাহি' বা 'বিল্লাহি' বলে কসম করা।" (মাজমুউল ফাতাওয়া ইবন বায: ২৩/১০৮)

আপনার কসমের বিষয়টি

আপনি কসম করেছেন: "আমি নামাজ ভাঙব না, যদি ভাঙি তাহলে আমি মুসলমান না।"

এই ধরনের কসম করা অনুচিত ও নিষিদ্ধ, কারণ:

১. নিজের ঈমানের উপর শর্ত আরোপ করা — এটি ভয়ানক কথা। ঈমান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া, তা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া বা কেড়ে নেওয়া যায় না।

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কসম করে বলল, 'আমি মুসলমান নই যদি এমন করি' — যদি সে মিথ্যা বলে, তবে সে যেমন বলেছে তেমনই হবে।" — (সুনান আবু দাউদ: ৩২৫৮, সহীহ)

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন।

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: "এ ধরনের কসম করা হারাম। এর দ্বারা ঈমানের ক্ষতি হয় না যদি না সে অন্তরে কুফর বিশ্বাস করে। তবে এ ধরনের কসম থেকে তাওবা করা wajib।" (শারহুল মুমতি: ১৫/১২৩)


তৃতীয়ত: যদি নামাজ ভেঙে ফেলেন — করণীয় কী?

১. ঈমানের বিষয়ে ভয় পাবেন না

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "কোনো মুসলিম যদি ভুলবশত বা দুর্বলতাবশত এমন কসম ভেঙে ফেলে, তবে সে কাফির হয়ে যায় না — যতক্ষণ না সে অন্তরে কুফরিকে হালাল করে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/৬১৭)

শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন: "এ ধরনের কসম ভেঙে ফেললে ঈমান চলে যায় না। এটি শয়তানের ধোঁকা।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)

২. কসম ভাঙার কাফফারা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক কসমের জন্য, কিন্তু পাকড়াও করেন সেই কসমের জন্য যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করো। তার কাফফারা হলো — দশজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া, যা তোমরা নিজেদের পরিবারকে খাওয়াও তার মধ্যম মানের, অথবা তাদের বস্ত্র দেওয়া, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। কিন্তু যে সামর্থ্য রাখে না, তার কাফফারা তিন দিন রোজা রাখা।" — (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯)

কাফফারার বিবরণ:

  • ১০ জন মিসকিনকে খাবার দেওয়া (মধ্যম মানের), অথবা
  • ১০ জনকে বস্ত্র দেওয়া, অথবা
  • ১ জন দাস মুক্ত করা
  • সামর্থ্য না থাকলে: ৩ দিন রোজা রাখা

৩. তাওবা করা

আল্লাহ বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: "এ ধরনের কসম করা থেকে তাওবা করা wajib। ভবিষ্যতে এমন কসম করবেন না।" (আল-মুলাখখাসুল ফিকহী)


চতুর্থত: ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির ব্যবহারিক উপায়

১. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন: "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন।

২. সূরা আন-নাস ও সূরা আল-ফালাক নিয়মিত পড়ুন।

৩. আয়াতুল কুরসী প্রতিটি ফরজ নামাজের পর পড়ুন।

৪. ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করুন — এর সাথে তর্ক করবেন না, ভুল ধরার চেষ্টা করবেন না।

৫. নামাজে মনোযোগ বাড়ান — অর্থ বুঝে পড়ুন।

৬. কসম করা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন — বিশেষ করে ঈমানের উপর শর্ত আরোপ করে।

৭. প্রয়োজনে রুকইয়াহ করান — অভিজ্ঞ রাকীর মাধ্যমে।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | ওয়াসওয়াসা | শয়তানের পক্ষ থেকে, ঈমানের ক্ষতি করে না | | কুরআন ছুঁয়ে কসম | জায়েয, তবে ঈমানের শর্তে কসম করা হারাম | | কসম ভাঙলে ঈমান যায়? | না, যতক্ষণ না কুফর বিশ্বাস করে | | কসম ভাঙার কাফফারা | ১০ মিসকিনকে খাবার/বস্ত্র বা ৩ রোজা | | করণীয় | তাওবা + কাফফারা + ভবিষ্যতে এমন কসম না করা |


উপসংহার: প্রিয় বোন, আপনি ঈমান হারানোর ভয় পাবেন না। এটি শয়তানের ধোঁকা। আপনি মুসলিম আছেন এবং থাকবেন ইনশাআল্লাহ। কসম ভেঙে গেলে কাফফারা আদায় করুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। ভবিষ্যতে কুরআন ছুঁয়ে বা ঈমানের শর্তে কসম করবেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.