গর্ভের সন্তান কতোদিন পর মারা গেলে বাবা মায়ের জন্য সুপারিশ করতে পারবে? গর্ভে ১২০ দিনের আগে মারা

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6398
Questioner: Rakib's Noor
Question Asked: 04 Oct 2026, 11:43 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 04:40 AM
Views: 8
Tokens: 4,760
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

গর্ভের সন্তান কতোদিন পর মারা গেলে বাবা মায়ের জন্য সুপারিশ করতে পারবে? গর্ভে ১২০ দিনের আগে মারা গেলে সে সন্তানের সাথে আখিরাতে দেখা হবে?

Answer

গর্ভের সন্তান মারা গেলে বাবা-মায়ের জন্য সুপারিশ ও আখিরাতে দেখা হওয়ার বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর

গর্ভের সন্তান ১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর মারা গেলে — অর্থাৎ যখন তাতে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয় — তখন সে কাফির-মুশরিকদের মতো শাস্তি পাবে না, বরং সে জান্নাতে থাকবে এবং কিয়ামতের দিন তার বাবা-মায়ের জন্য সুপারিশ (شفاعة) করতে পারবে — ইনশাআল্লাহ। আর ১২০ দিনের আগে (রূহ ফুঁকনের আগে) মারা গেলে সে জান্নাতে থাকবে, তবে সুপারিশ করার বিষয়ে নির্দিষ্ট দলিল নেই; আর আখিরাতে তার সাথে দেখা হওয়ার বিষয়ে সহীহ হাদীসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে মুসলিমের নাবালক সন্তানরা জান্নাতে থাকবে এবং তাদের পিতা-মাতার সাথে থাকবে।


১. রূহ ফুঁকনের সময়সীমা: ১২০ দিন (৪০ দিন নয়, ১২০ দিন)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يُرْسَلُ إِلَيْهِ الْمَلَكُ فَيَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ...

"নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যেককে তার মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন শুক্রবিন্দু হিসেবে একত্রিত করা হয়, অতঃপর অনুরূপ চল্লিশ দিন জমাট রক্ত হিসেবে, অতঃপর অনুরূপ চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ড হিসেবে। অতঃপর তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয় এবং সে তাতে রূহ ফুঁকে দেয়..."

— সহীহ বুখারী: ৩২০৮, সহীহ মুসলিম: ২৬৪৩

সুতরাং ১২০ দিন = ৪ মাস পূর্ণ হলে রূহ ফুঁক দেওয়া হয়। এর আগে ভ্রূণ শুধু জড় পদার্থ, তাতে রূহ নেই।


২. ১২০ দিনের পর মারা গেলে বাবা-মায়ের জন্য সুপারিশ করবে — দলিল

(ক) কুরআনের দলিল — শিশুদের জান্নাতে প্রবেশ

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ

"আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমানসহ তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলিত করব এবং তাদের আমল থেকে কিছুই কমাব না।"

— সূরা আত-তূর: ২১

ইবনু আব্বাস (রাযি.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: "মুসলিমদের নাবালক সন্তানরা জান্নাতে থাকবে এবং তাদের পিতা-মাতার সাথে মিলিত করা হবে।" — তাফসীর ইবনু কাসীর

(খ) হাদীসের দলিল — সুপারিশের বিষয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ لَهُ ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ، إِلَّا أَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِ رَحْمَتِهِ إِيَّاهُمْ

"যে মুসলিমের তিনজন নাবালক সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তার প্রতি রহমতের কারণে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।"

— সহীহ বুখারী: ১২৪৮

আরেক হাদীসে:

يَقُولُ اللهُ تَعَالَى: مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءٌ إِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهُ إِلَّا الْجَنَّةَ

"আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমার মুমিন বান্দার দুনিয়ার প্রিয়জনকে আমি নিয়ে নিলে, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে ও সওয়াবের আশা করে, তবে তার প্রতিদান আমার কাছে জান্নাত ছাড়া কিছু নয়।"

— সহীহ বুখারী: ৬৪২৪

(গ) সুপারিশ সম্পর্কে স্পষ্ট হাদীস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ الرَّجُلَ لَتَرْتَفِعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ: أَنَّى لِي هَذَا؟ فَيُقَالُ: بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ

"নিশ্চয়ই জান্নাতে বান্দার মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হবে, সে বলবে: এটা কোথা থেকে পেলাম? বলা হবে: তোমার সন্তানের তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার কারণে।"

— সুনান ইবনু মাজাহ: ৩৬৬০, সহীহুল জামি': ১৬১৭ — শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন

শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন: "নাবালক সন্তানরা জান্নাতে থাকবে এবং তারা তাদের পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করবে — এটি আল্লাহর অনুগ্রহ।" — ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব


৩. ১২০ দিনের আগে মারা গেলে কী হবে?

(ক) সে জান্নাতে থাকবে

জমহুর উলামার মতে, মুসলিমের গর্ভস্থ সন্তান ১২০ দিনের আগে মারা গেলেও সে জান্নাতে থাকবে, কারণ সে মুসলিম পিতা-মাতার সন্তান এবং নাবালক অবস্থায় মারা গেছে। তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে না, কারণ সে তাকলিফের বয়সে পৌঁছায়নি।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "নাবালক সন্তানরা জান্নাতে থাকবে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।" — মাজমূ'উল ফাতাওয়া: ৪/২৭৯

(খ) সুপারিশ করার বিষয়ে

১২০ দিনের আগে রূহ ফুঁকনের আগে মারা গেলে সে জীবিত মানুষের মতো আমল বা সুপারিশ করার সচেতন ক্ষমতা রাখে না — কারণ তখনো তার রূহ সৃষ্টি হয়নি। তবে আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞায় সে জান্নাতে থাকবে এবং আখিরাতে তার পিতা-মাতার সাথে থাকবে — ইনশাআল্লাহ।

শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন: "গর্ভস্থ সন্তান ৪ মাসের আগে মারা গেলে তাকে জানাযা পড়া হবে না, নাম দেওয়া হবে না; তবে সে জান্নাতে থাকবে এবং কিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতার সাথে থাকবে।" — ফাতাওয়া ইবনু বায


৪. আখিরাতে সন্তানের সাথে দেখা হবে কি?

হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: إِنَّ أَوْلَادَكُمْ مِنْ أَكْبَادِكُمْ، وَإِنَّهُمْ يَتَعَلَّقُونَ بِآبَائِهِمْ وَأُمَّهَاتِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

"নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তানরা তোমাদের কলিজার টুকরো, আর তারা কিয়ামতের দিন তাদের পিতা-মাতার সাথে লেগে থাকবে (সুপারিশ করবে)।"

— মুসনাদ আহমাদ, সহীহুল জামি': ১৬১৭

আর সূরা আত-তূর: ২১-এর আয়াত অনুযায়ী মুসলিম পিতা-মাতা ও তাদের সন্তানরা জান্নাতে একসাথে মিলিত হবে — এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: "মুসলিমের নাবালক সন্তানরা জান্নাতে থাকবে এবং তারা তাদের পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করবে।" — সিলসিলা সহীহা


৫. ব্যবহারিক বিধানসমূহ

| বিষয় | ১২০ দিনের আগে | ১২০ দিনের পর | |---|---|---| | রূহ ফুঁকন | হয়নি | হয়েছে | | জানাযা | পড়া হবে না | পড়া হবে | | নাম দেওয়া | ঐচ্ছিক | সুন্নত | | জান্নাতে যাবে | হ্যাঁ (ইনশাআল্লাহ) | হ্যাঁ (ইনশাআল্লাহ) | | পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ | নির্দিষ্ট দলিল নেই | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ | | আখিরাতে দেখা | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ |


৬. সান্ত্বনা ও উপদেশ

প্রিয় ভাই/বোন, সন্তান হারানো এক কঠিন পরীক্ষা, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

"আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের, যারা বিপদে পড়লে বলে: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব।"

— সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৬

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يَمُوتُ لَهُمَا ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ إِلَّا أَدْخَلَهُمَا اللهُ الْجَنَّةَ

"যে দুই মুসলিমের তিনজন সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তাদের দুজনকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।"

— সহীহ মুসলিম: ২৬৩৫

শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন: "সন্তান হারানোর ধৈর্য জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ।"


সারসংক্ষেপ

  1. ১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর মারা গেলে সন্তান জান্নাতে থাকবে এবং বাবা-মায়ের জন্য সুপারিশ করবে — ইনশাআল্লাহ।
  2. ১২০ দিনের আগে মারা গেলে সেও জান্নাতে থাকবে, তবে সুপারিশের নির্দিষ্ট দলিল নেই; আখিরাতে পিতা-মাতার সাথে মিলিত হবে — ইনশাআল্লাহ।
  3. আখিরাতে সন্তানের সাথে দেখা হবে — এটি সূরা আত-তূর: ২১ ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
  4. ধৈর্য ধারণ করুন, আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করুন — এটাই জান্নাতে মিলিত হওয়ার পথ।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন এবং জান্নাতে আমাদের সন্তানদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দিন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.