মেহমানকে কবে যাবেন জিজ্ঞাসা করা কি ইসলামে জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পরিবারিক কলহ: মেহমানের বিদায়ের সময় জিজ্ঞাসা করা প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারীর বাসায় শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদ (শ্যালিকা) মেহমান হিসেবে এসেছেন। তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো। প্রশ্নকারী শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে ননদ কবে যেতে চান। এরপর থেকে শাশুড়ি ক্ষুব্ধ হয়ে বলছেন যে তিনি আর কখনো ছেলের বাসায় আসবেন না। প্রশ্নকারী জানতে চান—তিনি কি ভুল করেছেন? এখন তার করণীয় কী?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও বিধান
১. মেহমানদারি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদেশ
মেহমানদারি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮
বিশেষত শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদ-ভাইয়ের মতো নিকটাত্মীয়রা যখন মেহমান হন, তাদের খিদমত করা সাওয়াবের কাজ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যম।
২. মেহমানকে কখন যাবে জিজ্ঞাসা করা—শরীয়াহর দৃষ্টিতে
শরীয়াহর দৃষ্টিতে মেহমানকে সরাসরি "কবে যাবেন?" জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়। কারণ:
- এতে মেহমানের মনে হতে পারে যে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বা তার উপস্থিতি অপছন্দ করা হচ্ছে।
- ইসলাম মেহমানের সম্মান রক্ষার উপর জোর দিয়েছে।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, মেহমানের বিদায়ের বিষয়টি তার নিজের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া উত্তম, যদি না কোনো বিশেষ অসুবিধা থাকে।
তবে, কোনো জরুরি কারণ থাকলে (যেমন: অসুস্থতা, সফরের প্রস্তুতি, সংকীর্ণতা) পরোক্ষভাবে বা সম্মানের সাথে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। সরাসরি "কবে যাবেন?" জিজ্ঞাসা করা মেহমানের সম্মান পরিপন্থী।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:
الضيف يجب إكرامه ولا يسأل عن وقت رحيله، بل يترك الأمر إليه
"মেহমানের সম্মান করা wajib, এবং তার বিদায়ের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়; বরং বিষয়টি তার নিজের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।"
৩. প্রশ্নকারীর কর্মের মূল্যায়ন
প্রশ্নকারী সরাসরি "কবে যাবেন?" বলেননি, বরং শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করেছিলেন "ননদ কবে যেতে চান"। এটি তুলনামূলকভাবে নরম পদ্ধতি হলেও, এটি মেহমানের (বিশেষত শাশুড়ির) মনে খারাপ প্রভাব ফেলেছে। কারণ:
- শাশুড়ি হয়তো মনে করেছেন যে তার মেয়ে (ননদ) এখানে অবাঞ্ছিত।
- অথবা তিনি ভেবেছেন যে প্রশ্নকারী তাদের সবার উপস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
- আত্মীয়তার সম্পর্কে এ ধরনের সূক্ষ্ম বিষয় দ্রুত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
তবে প্রশ্নকারীর নিয়ত খারাপ ছিল না—তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন। তাই এটি গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল।
৪. এখন করণীয়
প্রশ্নকারীর জন্য করণীয় নিম্নরূপ:
ক) ক্ষমা চাওয়া ও মন জয় করা
শাশুড়ির কাছে বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাওয়া উচিত। বলুন:
"আম্মা, আমি ভুল করে ফেলেছি। আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আপনি আমার মা-সম। আপনার ও ননদের এখানে থাকা আমার জন্য সম্মানের। আমি কখনো চাইনি আপনারা অসন্তুষ্ট হন।"
খ) মেহমানদারিতে আরও মনোযোগ দেওয়া
শাশুড়ি ও ননদের সেবা-যত্ন বাড়িয়ে দিন। তাদের পছন্দের খাবার, আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করুন। এতে তাদের মন ভালো হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
গ) ভবিষ্যতে সতর্কতা
ভবিষ্যতে মেহমানের বিদায়ের বিষয়ে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত থাকুন। যদি কোনো জরুরি কারণ থাকে, তবে স্ত্রীর মাধ্যমে বা অত্যন্ত সম্মানের সাথে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করুন।
ঘ) দুআ করা
আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত হয় এবং শাশুড়ির মন থেকে ক্ষোভ দূর হয়।
ঙ) স্ত্রীর সাথে পরামর্শ
স্ত্রীর মাধ্যমে শাশুড়ির মন জয় করার চেষ্টা করুন। স্ত্রী তার মায়ের সাথে কথা বলে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে পারেন যে প্রশ্নকারীর কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।
৫. শরীয়াহর সাধারণ নীতি
ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ লিখেছেন:
মেহমানের আগমন-প্রস্থান তার নিজের ইচ্ছাধীন। মেহমানকে তাড়া দেওয়া বা বিদায়ের সময় জিজ্ঞাসা করা ইসলামী আদবের পরিপন্থী। তবে মেহমান যদি অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেন এবং গৃহস্থের অসুবিধা হয়, তবে সম্মানের সাথে পরিস্থিতি বোঝানো যেতে পারে।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে উল্লেখ করেছেন:
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে দ্রুত ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ঠিক করা কর্তব্য।
উপসংহার
প্রশ্নকারী সরাসরি খারাপ কিছু বলেননি, তবে মেহমানের বিদায়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা ইসলামী আদবের পরিপন্থী ছিল। এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। এখন করণীয় হলো—বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাওয়া, মেহমানদারিতে আরও মনোযোগ দেওয়া, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশ্ন এড়িয়ে চলা। আল্লাহ তাআলা সম্পর্ক মজবুত করুন।
তথ্যসূত্র (References)
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০১৮
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮
- ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আদব
- আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী জেওর
- মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী
- মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাআরিফুল কুরআন
- ইমাম তাহাবী, শরহু মাআনিল আসার