ইসলামে পশু জবাইয়ের শর্তাবলি ও গর্ভবতী গাভী জবাইয়ের হুকুম।

Food and Drink · Hanafi

Question No: 6390
Questioner: Al Amin Ahmed Mobin
Question Asked: 04 Oct 2026, 08:48 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 04:51 AM
Views: 8
Tokens: 4,643
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো পশুকে জবাই করে খাওয়ার ক্ষেত্রে একটা পশুর যেসব শর্ত অবশ্যই থাকা উচিত ব্যাখ্যাসহ বললে ভালো হয়...আর গর্ভবতী গাভীকে পেটে বাচ্চা আছে সেটাকে জবাই করে খাওয়ার হুকুম কি?

Answer

পশু জবাই করে খাওয়ার শর্তাবলি ও গর্ভবতী গাভী জবাইয়ের হুকুম

ভূমিকা

ইসলামে হালাল পশু জবাই করে খাওয়ার জন্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপিত হয়েছে। এই শর্তগুলো পূর্ণ না হলে পশুর গোশত হালাল হবে না, বরং মৃতা (মুরদার) হিসেবে গণ্য হবে—যা হারাম। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


প্রথম অংশ: জবাইয়ের শর্তাবলি

১. জাবিহ (জবাইকারী) সম্পর্কিত শর্ত

ক. জবাইকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হতে হবে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আজ তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। আর আহলে কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৫)

"তোমরা যা কিছু আল্লাহর নামে জবাই করেছ তা খাও।" — (সূরা আল-আনআম: ১১৮)

হানাফি ফিকহের বিধান: জবাইকারী মুসলিম, বালেগ, আকিল (বুদ্ধিমান) হওয়া জরুরি। তবে নাবালেগ সাবালক না হলেও তার জবাই সহিহ হবে যদি সে তামিজ বয়সের হয় এবং ইসলামের বিধান জানে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ২৯৬; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ২৮৫)

খ. জবাইকারীর নিয়ত ও তাসমিয়া (বিসমিল্লাহ) বলা

জবাইয়ের সময় "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে তাসমিয়া ছেড়ে দিলে পশু হারাম হয়ে যাবে।

"তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে জবাই করো, যদি তোমরা তাঁর আয়াতসমূহে বিশ্বাসী হও।" — (সূরা আল-আনআম: ১১৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করল, তার উপর আল্লাহর লানত।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭৮)

হানাফি বিধান: ভুলে তাসমিয়া ছেড়ে দিলে সমস্যা নেই, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে পশু হারাম। (আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৩৮; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ২৯৮)


২. জবাইয়ের যন্ত্র (আলাত) সম্পর্কিত শর্ত

ক. যন্ত্র ধারালো হতে হবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুতে ইহসান (উত্তমতা) ফরজ করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করবে, উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করো; আর যখন জবাই করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করো। তোমাদের কেউ যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং পশুকে কষ্ট না দেয়।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)

খ. যন্ত্র লোহা, ইস্পাত, পাথর, কাচ—যা দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়, তা দিয়েই জবাই করা যাবে

তবে দাঁত, নখ, হাড় বা এমন বস্তু দিয়ে জবাই করা যাবে না যা দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয় না বা যা ছিঁড়ে ফেলে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"দাঁত ও নখ দিয়ে জবাই করো না, কারণ দাঁত হলো হাড় এবং নখ হলো হাবশীদের ছুরি।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৮২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৬৮)


৩. পশু সম্পর্কিত শর্ত

ক. পশু হালাল প্রজাতির হতে হবে

সূরা আল-মায়িদায় আল্লাহ তাআলা হালাল ও হারাম পশুর তালিকা দিয়েছেন। শূকর, কুকুর, বিড়াল, হিংস্র দাঁতওয়ালা প্রাণী (বাঘ, সিংহ, নেকড়ে ইত্যাদি), নখরওয়ালা পাখি (ঈগল, শকুন ইত্যাদি) হারাম।

খ. পশু জীবিত থাকতে হবে জবাইয়ের সময়

যদি পশু জবাইয়ের আগেই মারা যায়, তবে তা মুরদার (মৃতা) হিসেবে হারাম। তবে যদি জবাইয়ের সময় পশু জীবিত থাকে এবং জবাইয়ের পর মারা যায়, তবে হালাল।

গ. পশু মুসলিমের মালিকানাধীন বা অনুমতিক্রমে হতে হবে

অন্যের পশু চুরি করে বা জোরপূর্বক জবাই করা যাবে না।


৪. জবাইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কিত শর্ত

ক. চারটি রগ কাটা (হানাফি মাজহাবে)

হানাফি মাজহাবে জবাইয়ের সময় নিম্নলিখিত চারটি জিনিস কাটা জরুরি:

  1. হলকুম (শ্বাসনালী)
  2. মারি (খাদ্যনালী)
  3. ওদাজ (দুই পাশের রক্তনালী)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "চারটি রগের মধ্যে তিনটি কাটা জরুরি, তবে চারটি কাটাই উত্তম।" (আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৩৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ২৮৫)

খ. জবাইয়ের সময় পশু কিবলামুখী করে শোয়ানো সুন্নত

গ. জবাই দ্রুত ও একবারে সম্পন্ন করা

একবারে রগ কাটা সম্ভব না হলে ধারাবাহিকভাবে কাটা যাবে, তবে দ্রুত করা উত্তম।


৫. জবাইয়ের সময় পশুর অবস্থা

ক. পশু জীবিত থাকা অবস্থায় জবাই করতে হবে

যদি পশু জবাইয়ের আগে মারা যায়, তবে তা হারাম।

খ. জবাইয়ের সময় পশুকে কষ্ট না দেওয়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুতে ইহসান ফরজ করেছেন... তোমাদের কেউ যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং পশুকে কষ্ট না দেয়।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)


দ্বিতীয় অংশ: গর্ভবতী গাভী জবাইয়ের হুকুম

মাসআলা:

যদি গর্ভবতী গাভী জবাই করা হয় এবং তার পেটে বাচ্চা থাকে, তবে বাচ্চার হুকুম কী?

হানাফি ফিকহের বিধান:

১. যদি মায়ের জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত বের হয়:

বাচ্চাটি জীবিত বের হলে এবং তা যদি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকে, তবে বাচ্চাটিকে আলাদাভাবে জবাই করতে হবে। যদি বাচ্চা জীবিত বের হওয়ার পর জবাই ছাড়াই মারা যায়, তবে তা মুরদার হিসেবে হারাম।

ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন: "যদি গর্ভবতী পশু জবাই করা হয় এবং তার পেট থেকে বাচ্চা জীবিত বের হয়, তবে বাচ্চাটিকে জবাই করতে হবে। যদি জবাই না করে মারা যায়, তবে তা খাওয়া যাবে না।" (আল-আসার, ইমাম মুহাম্মাদ; মুয়াত্তা মুহাম্মাদ)

২. যদি মায়ের জবাইয়ের পর বাচ্চা মৃত বের হয়:

যদি বাচ্চা মৃত বের হয়, তবে হানাফি মাজহাবে বাচ্চার গোশত খাওয়া জায়েজ। কারণ মায়ের জবাই বাচ্চার জন্যও যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "গর্ভবতী পশুর জবাই তার পেটের বাচ্চার জবাই।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৩০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮২৭; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৭২)

তবে হাদিসটি সম্পর্কে হানাফি উলামাদের মত:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এই হাদিসের ভিত্তিতে বলেন: "গর্ভবতী পশুর জবাই তার পেটের বাচ্চার জন্যও জবাই হিসেবে গণ্য হবে, যদি বাচ্চা মৃত বের হয়।" (আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৪০; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩০০)

৩. যদি বাচ্চা জীবিত বের হয় কিন্তু জবাই ছাড়াই মারা যায়:

তবে তা হারাম। কারণ মায়ের জবাই বাচ্চার জন্য যথেষ্ট নয় যখন বাচ্চা জীবিত বের হয়।

৪. যদি বাচ্চা জীবিত বের হয় এবং জবাই করা হয়:

তবে তা হালাল।


সারসংক্ষেপ:

| অবস্থা | হুকুম | |--------|-------| | মায়ের জবাইয়ের পর বাচ্চা মৃত বের হয় | হালাল (মায়ের জবাইই যথেষ্ট) | | মায়ের জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত বের হয় | আলাদাভাবে জবাই করতে হবে | | জীবিত বের হওয়ার পর জবাই ছাড়া মারা যায় | হারাম (মুরদার) | | জীবিত বের হওয়ার পর জবাই করা হয় | হালাল |


গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া ও দলিল

ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):

"গর্ভবতী পশু জবাই করলে যদি বাচ্চা মৃত বের হয়, তবে তা হালাল। আর যদি জীবিত বের হয়, তবে তাকে জবাই করা জরুরি।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৫)

ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী):

"গর্ভবতী পশুর জবাই বাচ্চার জন্যও যথেষ্ট, যদি বাচ্চা মৃত থাকে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৮৭)

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন):

"যদি গর্ভবতী পশু জবাই করা হয় এবং বাচ্চা মৃত বের হয়, তবে তা হালাল। আর যদি জীবিত বের হয়, তবে জবাই করা ওয়াজিব।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩০০)


উপসংহার

  1. জবাইকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হতে হবে, তাসমিয়া বলতে হবে, ধারালো যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে, চারটি রগ কাটতে হবে, পশু জীবিত থাকতে হবে।
  2. গর্ভবতী গাভী জবাই করলে বাচ্চা মৃত বের হলে হালাল, জীবিত বের হলে আলাদাভাবে জবাই করতে হবে।
  3. জবাইয়ের সময় পশুকে কষ্ট না দেওয়া এবং দ্রুত জবাই করা সুন্নত।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.