ইসলামে বৈধ বিবাহের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
আর আরেকটি বিষয় আমার ননদ ননাসরা (সব মিলিয়ে 20জনের বেশি)সারাবছর বাবার বাড়িতে থাকে আর এমন ভাবে থাকে আমার উপর জুলুম করে কোন কাজে সাহায্য করে না আর টাকা পয়সার সাধ্যের বাইরে খাতির যত্ন চায় এমনকি আমার রুম পর্যন্ত পাইনা আমার স্বামী দেশে থাকতে আমরা ব্যক্তিগত সময়ও কাটাতে পারতাম না যার জন্য আমাদের ও দুরত্বের সৃষ্টি হয়।এখনো বোনেরা চায় শুধু তাদের কে করতে হবে মানসিকভাবে অনেক আঘাত করেছে এমনকি এখন আমার শশুর ও তাদের সাথে শামিল হয়ে আমাকে এবং আমার বাবা মা কে গালিগালাজ অসম্মান করছে।তাই আমার স্বামী আমাকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।এখন আমরা যদি বাবা মায়ের মাসিক খরচ এবং খোঁজখবর নেই আর আলাদা বাসায় থাকি আর বোনদের সাথে কোন সম্পর্ক না রাখি তাহলে কি আমরা গোনাহগার হবো।তাদের সাথে যোগাযোগ রাখলে তারা একে অপরের সমালোচনা সত্য মিথ্যা য় বলবে আর ঝগড়া লাগাবে আমার সাথে সবসময় হিংসা ও ঝগড়ার মনোভাব রাখবে।তাই এই দুই বিষয়ে ইসলাম অনুযায়ী আমাকে কি করতে হবে দয়া করে জানাবেন
দয়া করে আমার পরিচয় গোপন রাখবেন
Answer
আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বৈধ বিবাহের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে): আপনার বোন ও ননাসের ছেলের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া বিবাহটি শরিয়তসম্মত (হালাল ও জায়েজ)। কারণ, ফুফু/খালা-মামার সন্তানদের সাথে সম্পর্ক মাহরাম নয়; বরং তারা পরস্পর বিবাহযোগ্য। তবে আপনার স্বামী কর্তৃক এই বৈধ বিবাহের কারণে নিজের বোনের পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং আপনাকে যোগাযোগে বাধা দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। এটি আত্মীয়তা ছিন্ন করার (কত'য়ে রাহমি) গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আর দ্বিতীয় বিষয়ে—যদি আত্মীয়রা সীমা ছাড়িয়ে যায়, অপমান-গালিগালাজ করে, ঝগড়া-বিবাদ লাগায়, তবে তাদের সাথে চলার পদ্ধতি সংযত ও দূরত্বপূর্ণ রাখা যাবে; কিন্তু সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা বা পিতা-মাতার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ বন্ধ করা জায়েজ নয়।
প্রথম বিষয়: বৈধ বিবাহের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা
১. বিবাহটি শরিয়তে বৈধ
ইসলামী শরিয়তে চাচা-ফুফু, মামা-খালার সন্তানদের সাথে বিবাহ সম্পূর্ণ বৈধ। কারণ, কুরআনে বিবাহ নিষিদ্ধ (মাহরাম) আত্মীয়দের তালিকা সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ফুফু, খালা, মামা, চাচার সন্তানদের উল্লেখ নেই। তাই তাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ নয়।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে যে, চাচাতো-ফুফাতো-মামাতো-খালাতো ভাইবোনদের সাথে বিবাহ জায়েজ। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
সুতরাং আপনার বোন ও ননাসের ছেলের বিবাহ হালাল ও জায়েজ। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
২. বৈধ কাজের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো, যদিও তারা তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৩০১; সহিহ আল-জামি, হাদিস: ৭৭০)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাওয়া-পাওয়া করো, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।" — (সূরা আন-নিসা: ১)
"যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, তাদের জন্য অভিশাপ এবং কঠিন পরিণাম রয়েছে।" — (সূরা আর-রাদ: ২৫)
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট করা হয়েছে: কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক লজ্জা বা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। বরং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব পর্যায়ের কর্তব্য। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২)
৩. আপনার স্বামীর হুমকি ও বাধা দেওয়ার বিধান
আপনার স্বামী যদি বলেন—"তুমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখলে তোমার সাথেও সম্পর্কের অবনতি ঘটাবেন বা কঠিন আচরণ করবেন"—তবে:
- বৈধ কাজ (আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা) থেকে বাধা দেওয়া তার জন্য জায়েজ নয়।
- তবে স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য (তা'আত) ওয়াজিব, তবে তা গুনাহের কাজে নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: "সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা নেই।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪০)
- অর্থাৎ, স্বামী যদি হারাম কাজের আদেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না; আর যদি জায়েজ কাজ থেকে নিষেধ করেন, তবে সাধ্যমতো সমন্বয় করতে হবে—কিন্তু সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা তার নির্দেশে ওয়াজিব হয়ে যায় না।
সমাধান: আপনার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, বিবাহটি শরিয়তসম্মত; সামাজিক লজ্জা বা লোকনিন্দার কারণে আত্মীয়তা ছিন্ন করা গুনাহ। আপনি প্রকাশ্যে ঝগড়া-বিবাদে জড়াবেন না, তবে নীরবে সালাম-সম্ভাষণ, খোঁজখবর ও দাওয়াত-সৌজন্য রক্ষা করুন। এতে আপনি গুনাহ থেকে বাঁচবেন।
৪. আপনি কি গুনাহে অংশীদার হবেন?
যদি আপনি নিজে সম্পর্ক ছিন্ন করেন বা স্বামীর নিষেধে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তবে আপনি কত'য়ে রাহমির গুনাহে অংশীদার হবেন। তবে যদি স্বামীর কঠোরতার কারণে বাধ্য হয়ে শুধু প্রকাশ্য যোগাযোগ কমিয়ে দেন, কিন্তু অন্তরে সম্পর্ক রক্ষার নিয়ত রাখেন এবং সম্ভব হলে নীরবে খোঁজখবর রাখেন—তবে ইনশাআল্লাহ আপনি গুনাহ থেকে বাঁচবেন। তবে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
দ্বিতীয় বিষয়: ননদ-ননাসদের জুলুম, অপমান ও আলাদা থাকার বিধান
১. আত্মীয়দের জুলুম-অপমান সহ্য করা ওয়াজিব নয়
ইসলামে কারো উপর জুলুম করা হারাম। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই জুলুমকারীদের জন্য কোনো অভিভাবক নেই।" — (সূরা আশ-শুরা: ৮)
"আল্লাহ জুলুম পছন্দ করেন না।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৪০)
যদি ননদ-ননাসরা সীমা ছাড়িয়ে যায়, আপনার উপর জুলুম করে, আপনার রুম পর্যন্ত না দেয়, ব্যক্তিগত সময় নষ্ট করে, আপনার ও আপনার পিতা-মাতাকে গালিগালাজ করে—তবে এটি হারাম ও জুলুম। এটি সহ্য করা আপনার উপর ওয়াজিব নয়।
২. আলাদা বাসায় থাকা জায়েজ
স্বামী-স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসায় থাকা শরিয়তে জায়েজ, বিশেষত যখন পারিবারিক পরিবেশে ফিতনা, ঝগড়া ও জুলুমের আশঙ্কা থাকে। ইসলামে স্ত্রীর জন্য পৃথক বাসস্থান (সুকনা) পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা তাদেরকে সেখানে রাখো যেখানে তোমরা থাকো, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।" — (সূরা আত-তালাক: ৬)
রাসূল ﷺ বলেছেন: "তোমরা নিজেদের মধ্যে সদাচরণ করো।" (সহিহ মুসলিম)
তবে আলাদা থাকার অর্থ সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। আলাদা থাকা যাবে, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না।
৩. পিতা-মাতার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ
পিতা-মাতার খোঁজখবর রাখা ও তাদের ভরণপোষণ (নাফাকা) করা সন্তানের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি।" — (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)
যদি আপনার স্বামী তার পিতা-মাতার মাসিক খরচ ও খোঁজখবর বন্ধ করেন, তবে তিনি গুনাহগার হবেন। এটি জায়েজ নয়। তবে যদি পিতা-মাতা নিজেরাই সীমা ছাড়িয়ে যান, অপমান করেন, তবে সদাচরণের সাথে সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলা যাবে—কিন্তু সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা বা খোঁজখবর বন্ধ করা যাবে না।
৪. ননদ-ননাসদের সাথে সম্পর্ক
যদি তারা সত্যিই সীমা ছাড়িয়ে যায়, মিথ্যা অপবাদ দেয়, ঝগড়া লাগায়, হিংসা করে—তবে:
- তাদের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয় (কারণ তারা আত্মীয়)।
- তবে সীমিত ও সংযত সম্পর্ক রাখা যাবে। অর্থাৎ, সালাম-সম্ভাষণ, প্রয়োজনে দেখা-সাক্ষাৎ, কিন্তু তাদের সাথে বেশি মেলামেশা না করা, তাদের ঝগড়ায় না জড়ানো।
- তাদের মিথ্যা অপবাদ ও জুলুমের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা।
আল্লাহ বলেন:
"তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং সদাচরণ করো।" — (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
রাসূল ﷺ বলেছেন: "মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (সহিহ বুখারি)
৫. আপনার করণীয় (সারসংক্ষেপ)
| বিষয় | বিধান | |---|---| | বোন ও ননাসের ছেলের বিবাহ | হালাল ও জায়েজ | | বৈধ বিবাহের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা | হারাম (কত'য়ে রাহমি) | | স্বামীর বাধা/হুমকি | গুনাহের কাজে আনুগত্য নয়; সমন্বয় করুন | | ননদ-ননাসদের জুলুম | হারাম; সহ্য করা ওয়াজিব নয় | | আলাদা বাসায় থাকা | জায়েজ | | পিতা-মাতার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ | ওয়াজিব; বন্ধ করা জায়েজ নয় | | ননদ-ননাসদের সাথে সম্পর্ক | সম্পূর্ণ ছিন্ন নয়; সীমিত ও সংযত রাখুন | | গুনাহে অংশীদার হওয়া | সম্পর্ক ছিন্ন করলে হ্যাঁ; সীমিত রাখলে না |
চূড়ান্ত পরামর্শ
- বিবাহটি মেনে নিন—এটি শরিয়তসম্মত। সামাজিক লজ্জা বা লোকনিন্দার কারণে বৈধ কাজ অস্বীকার করা যাবে না।
- আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করবেন না—বিশেষত পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়দের সাথে। সালাম, খোঁজখবর ও প্রয়োজনে সহযোগিতা চালু রাখুন।
- ননদ-ননাসদের সাথে সীমিত সম্পর্ক রাখুন—ঝগড়া-বিবাদে জড়াবেন না, তবে সম্পর্ক ছিন্নও করবেন না।
- আলাদা বাসায় থাকুন—যদি পরিবেশ অসহনীয় হয়, তবে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকতে পারেন; এটি জায়েজ।
- পিতা-মাতার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ চালু রাখুন—এটি ওয়াজিব, বন্ধ করা যাবে না।
- স্বামীকে বোঝান—ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে বোঝান যে, বৈধ বিবাহের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা গুনাহ; আর জুলুমের জবাবে জুলুম করা যাবে না।
- দুআ করুন—আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও পরিবারে শান্তি কামনা করুন।
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা আল-বাকারা: ২০১)
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি, সমঝোতা ও হেদায়েত দান করুন। আমিন।