ভিন্ন আলেমদের মতের দোহাই দিয়ে মাযহাব পরিবর্তন করে বিবাহ করার শরয়ী হুকুম
Halal and Haram · Hanafi
Question
২) আমি যে মেয়ে বিয়ে করবো সে আমার দুধবোন হবে কিনা সন্দেহ আছি,কারণ দুবছরের মধ্যে দুতিন অল্প অল্প পরিমাণ কয়েকবার খেয়েছে?
৩)আমি ওই মেয়ে কে খুব ভালোবাসি,সে যদি দুধবোন হয়, তবে অন্য পুরুষ তাকে ভোগ করবে,তার স্তনে মুখ দেবে এমন চিন্তা মাথায় আসে। তার স্বামী তার সাথে তাকে ভোগ করবে, আনুগত্য আদায় করবে আমি এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় খুব! মেনে নিতে পারিনা।
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
##জবাব,
১. ভিন্ন আলেমদের মতের দোহাই দিয়ে মাযহাব পরিবর্তন করে বিবাহ করার শরয়ী হুকুম:
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
শাখ বিন বায বা শায়খ উসাইমিন (রহ.) অথবা অন্য কোনো ফকীহের ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও, কেবল নিজের ব্যক্তিগত প্রেম-ভালোবাসা, বৈবাহিক সুযোগ বা নফসের ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে হানাফী মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবের সহজ ফতোয়া গ্রহণ করা (তাতাব্বুউর রুখাছ / تتبع الرخص) সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও নাজায়েয [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪]। - ফিকহী বিশ্লেষণ:
আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আপনার কাছে হানাফী মাযহাবের দলিল শক্তিশালী মনে হয়। ইসলামি ফিকহের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, কোনো ফিকহী সিদ্ধান্তকে সত্য ও শক্তিশালী জেনেও কেবল নিজের নফসের চাওয়া পূরণের জন্য তা ত্যাগ করাকে "ইত্তিবাউল হাওয়া" (নফসের দাসত্ব) বলা হয়। এভাবে যদি বিবাহ করাও হয়, তবে শরীয়তের বিচারে তা সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর থাকবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৪, ২৫]।
২. দু-তিনবার অল্প পরিমাণ দুধ পানের কারণে দুধবোন সাব্যস্ত হওয়া সংক্রান্ত সন্দেহ ও সিদ্ধান্ত:
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
মেহেদী বা শিশুটি যদি দু বছরের মধ্যে দু-তিনবারও অল্প পরিমাণ দুধ পান করে থাকে, তবে হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফতোয়া অনুযায়ী তার মাধ্যমে 'হুরমতে রাযাআত' (দুগ্ধসম্পর্ক) অকাট্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]। - ফিকহী মূলনীতি:
হানাফী ও মালেকী ফিকহে পাঁচবার বা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা শর্ত নয়; বরং শিশুকালে সামান্য পরিমাণ দুধও যদি পেটে পৌঁছায়, তবে সেই নারী অকাট্যভাবে দুধমা এবং তাঁর কন্যাসন্তান অকাট্যভাবে দুধবোন হয়ে যায় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]। - সন্দেহের নিরসন:
যদি দু-তিনবার দুধ পানের বিষয়টি সুনিশ্চিত বা প্রমাণিত হয়, তবে ওই মেয়েটি আপনার আপন বোনের মতোই হারাম দুধবোন। আর যদি দুগ্ধপানের মূল ঘটনাতেই চরম সংশয় থাকে (অর্থাৎ আদেও দুধ পান করেছে কি না তা নিশ্চিত না হয়), তবে ভিন্ন কথা; কিন্তু দু-তিনবার অল্প হলেও দুধ পানের সত্যতা থাকলে সে আপনার শরয়ী দুধবোন [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
৩. মানসিক কষ্ট, ক্ষোভ ও আবেগময় চিন্তার বিষয়ে ঈমানী উপদেশ:
১. দুধবোন আপনার আপন বোনের মতো:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রক্তসম্পর্কের বোনের মতো দুধবোনকেও চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছেন। একজন ঈমানদার সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ যেমন নিজের আপন পেটের বোনকে অন্য পুরুষের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেখলে কষ্ট পায় না, বরং আনন্দিত হয়; ঠিক তেমনি আপনার দুধবোনের ক্ষেত্রেও এই মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করাই ঈমানের দাবি।
২. কুচিন্তা ও শয়তানী ওয়াসওয়াসা পরিহার:
"অন্য পুরুষ তাকে ভোগ করবে" বা "তার স্বামী তার ওপর অধিকার খাটাবে"—এই জাতীয় চিন্তাভাবনাগুলো কেবল নফসের তাড়না ও শয়তানের সূক্ষ্ম প্ররোচনা। শয়তান আপনাকে গোনাহ ও মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিতে এই আবেগ তৈরি করছে।
৩. তওবা ও সম্পর্কচ্ছেদ:
আল্লাহর নির্ধারিত হারাম সীমানাকে ভাঙার চেষ্টা না করে নিজের নফসকে দমন করুন। অবিলম্বে ওই মেয়ের সাথে একাকী কথা বলা, দেখা করা বা আবেগপূর্ণ যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিন এবং অতীতের অনুভূতির জন্য আল্লাহর দরবারে তওবা করুন [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২২১: (অধ্যায়: কিতাবুর রাযা / দুগ্ধপান অধ্যায় — অল্প পরিমাণ বা দু-তিনবার দুধ পেটে পৌঁছালেই হুরমতে রাযাআত সাব্যস্ত হওয়া এবং দুধবোন চিরতরে হারাম হওয়ার ফিকহী মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩: (অধ্যায়: বাবুত তাকলীদ — নফসের চাওয়া ও ব্যক্তিগত সুবিধার উদ্দেশ্যে অন্য মাযহাবের সহজ ফতোয়া খোঁজা হারাম হওয়ার বিবরণ) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
৩. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৩–২৫: (অধ্যায়: তাকলীদ ও ইজতেহাদ — সুবিধাবাদী আচরণ পরিহার করা এবং শরীয়তের বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪, ২৫]।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।