ইমান নিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর: না জেনে কুফরি কথা বলা, আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত ভুল ধারণা পোষণ করা এবং এতে ইমান ভঙ্গ হয় কি না ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
ইমান এর মৌলিক বিষয় এ আমি কখনো অবিশ্বাস করি নাই, যেমন আল্লাহ কে বিশ্বাস করা, নবি কে, কোরয়ান,
কিন্তু এখন দেখলাম কুফ্রি কাজ বা কথা তে ইমান চলে যেত পারে,,
১) কেউ না জেনে কুফ্রি কথা বলে বা কাজ করে, পরে মনে হলো সেটা ত কুফ্রি হয়েছে বা আল্লাহ এর হুকুম এর অবমাননা হয়েছে যদিও তখন সেই বিষয় জানলে এমনটা করত না, এতে কি ইমান চলে গেছে?
২) একদিন এক পরিচিত কে বলছিলাম মানুষের আয়ু ৮০ বছর হওয়া উচিত,, মুলত এইটা বলেছিলাম এই ভেবে তাহলে সবাই একটা সময় উপভোগ বা কিছু করতে পারত,, আমার মাথায় এইটা আসেই নাই যে এইটা আল্লাহ পাকের হায়াত নিয়ে যে হুকুম তার বিরুদ্ধে যায়,, এখন এইটা ভেবে চিন্তা হচ্ছে,,,
৩) এইসব এর জন্য কি ইমান হারা হব,, আর বিয়েও নবায়ন করতে হবে?
Answer
ইমান নিয়ে তিনটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি ইমানের মূল ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং অজ্ঞতাবশত ভুলের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর।
মূলনীতি: ইমান কী এবং কীভাবে তা যায়?
ইমান অর্থ হলো—হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং আমলে বাস্তবায়ন। ইমান ভঙ্গ হয় কেবল তখনই, যখন কেউ জেনে-বুঝে, ইচ্ছাকৃতভাবে ও সচেতনভাবে কুফরি আকিদা পোষণ করে, কুফরি কথা বলে বা কুফরি কাজ করে এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ "তোমাদের ভুলে যা হয়ে যায় তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই, কিন্তু যা তোমাদের অন্তর ইচ্ছাকৃতভাবে করে।" (সূরা আহযাব: ৫)
আল্লাহ আরও বলেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করবেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক কাজ থেকে (গুনাহ) ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩, হাসান)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (১/২৪৭) গ্রন্থে বলেন:
"কুফরি তখনই ইমান ভঙ্গ করবে যখন তা ইচ্ছাকৃতভাবে ও সচেতনভাবে করা হবে। অজ্ঞতাবশত বা ভুলবশত কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলে—যদি সে বিষয়টি না জানে—তবে ইমান ভঙ্গ হবে না।"
ইমাম তাহতাবি (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এর হাশিয়ায় (১/২৪৭) উল্লেখ করেন:
"যে ব্যক্তি না জেনে কুফরি কথা বলে, তার ইমান বাকি থাকে; কারণ ইমান ভঙ্গের শর্ত হলো ইচ্ছাকৃত কুফরি।"
১) না জেনে কুফরি কথা বলা বা কাজ করা—ইমান যায় কি?
উত্তর: না, ইমান যায় না। কারণ:
- ইমান ভঙ্গের জন্য ইলম (জ্ঞান), ইচ্ছা (কাসদ) ও সচেতনতা শর্ত।
- যে ব্যক্তি না জেনে কুফরি কথা বলে বা কাজ করে, তার ইমান বাকি থাকে।
- তবে জেনে-বুঝে কুফরি করলে ইমান ভঙ্গ হবে এবং তাওবা ও কালিমা পুনরায় পড়ে ইমান নবায়ন করতে হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর স্পষ্ট বক্তব্য হলো:
"কুফরি ইচ্ছাকৃত হলে ইমান ভঙ্গ হয়; ভুলবশত হলে নয়।" (আল-ফিকহুল আকবার)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন" (সূরা বাকারা: ২৮৬-এর তাফসিরে) লেখেন:
"ভুলবশত কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলে ইমান যায় না, যদি না সে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে-বুঝে তা করে।"
ফতোয়ায়ে উসমানি (১/১২৩) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"কেউ যদি না জেনে কুফরি কথা বলে, পরে বুঝতে পারে যে এটি কুফরি ছিল—তবে তার ইমান বাকি আছে। তাকে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে।"
সিদ্ধান্ত: আপনার প্রথম প্রশ্নের ক্ষেত্রে—যদি সত্যিই না জেনে বলে থাকেন এবং তখন জানলে এমনটা করতেন না—তাহলে ইমান যায়নি। শুধু তাওবা ও ইস্তিগফার করুন।
২) "মানুষের আয়ু ৮০ বছর হওয়া উচিত" বলা—এতে ইমান যায় কি?
উত্তর: এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:
(ক) যদি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়ার নিয়ত না থাকে
আপনি বলেছেন—আপনার মাথায় আসেনি যে এটি আল্লাহর হায়াতের হুকুমের বিরুদ্ধে যায়। আপনি মূলত বলেছিলেন—"সবাই যেন একটা সময় উপভোগ করতে পারে।" এটি ছিল একটি সাধারণ কল্পনা বা কামনা, আল্লাহর হুকুমের অবমাননার নিয়ত ছিল না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (১/২৪৮) বলেন:
"কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলে ইমান ভঙ্গ হয়, যদি তা আল্লাহর হুকুমের অবমাননার নিয়তে হয়। কিন্তু যদি কেউ আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা না করে, শুধু দুনিয়াবি কল্পনা করে—তবে ইমান ভঙ্গ হবে না।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফতোয়ায়ে উসমানি" (১/১২৫) গ্রন্থে বলেন:
"আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত কোনো কথা বলা—যদি তাতে আল্লাহর হুকুমের অবমাননার নিয়ত না থাকে—তবে তা কুফরি নয়। তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।"
(খ) তবে সতর্কতা জরুরি
আল্লাহর হায়াত (আয়ু) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَمَا يُعَمَّرُ مِن مُّعَمَّرٍ وَلَا يُنقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَابٍ "কোনো দীর্ঘজীবীর আয়ু বাড়ানো হয় না এবং তার আয়ু কমানো হয় না—সবই কিতাবে লিপিবদ্ধ।" (সূরা ফাতির: ১১)
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তিনিই জানেন গর্ভে কী আছে। কোনো প্রাণী জানে না আগামীকাল সে কী করবে এবং কোনো প্রাণী জানে না কোন মাটিতে সে মরবে।" (সূরা লুকমান: ৩৪)
সিদ্ধান্ত: আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে—যেহেতু আপনি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়ার নিয়ত করেননি, শুধু একটি সাধারণ কল্পনা করেছিলেন—তাই ইমান যায়নি। তবে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে সচেতন থাকা ও তাওবা করা উত্তম।
৩) ইমান হারা হব? বিয়ে নবায়ন করতে হবে?
উত্তর:
(ক) ইমান হারা হবেন কি?
না, ইনশাআল্লাহ আপনি ইমান হারা হবেন না। কারণ:
- আপনি ইমানের মৌলিক বিষয়গুলোতে কখনো অবিশ্বাস করেননি।
- না জেনে যা বলেছেন, তাতে আল্লাহর হুকুমের অবমাননার নিয়ত ছিল না।
- আপনি এখন অনুতপ্ত ও চিন্তিত—এটি ইমানের লক্ষণ।
ইমাম গাজালি (রহ.) "ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন" (১/১১৬) গ্রন্থে বলেন:
"যে ব্যক্তি কুফরি থেকে ভয় পায় ও অনুতপ্ত হয়—সে মুমিন। আর যে কুফরিতে সন্তুষ্ট থাকে—সে কাফির।"
(খ) বিয়ে নবায়ন করতে হবে কি?
না, বিয়ে নবায়ন করতে হবে না। কারণ:
- ইমান ভঙ্গ হয়নি, তাই নিকাহও ভঙ্গ হয়নি।
- ইমান ভঙ্গ হলে নিকাহ ভঙ্গ হয়ে যায় এবং ইমান ফিরিয়ে আনার পর নবায়ন করতে হয়। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ইমান ভঙ্গ হয়নি।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৩/২৫) বলেন:
"ইমান ভঙ্গ হলে নিকাহ ভঙ্গ হয়। কিন্তু ইমান বাকি থাকলে নিকাহও বাকি থাকে।"
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (১/২৮৩) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"কুফরি ইচ্ছাকৃত হলে ইমান ও নিকাহ উভয়ই ভঙ্গ হয়। ভুলবশত হলে কোনোটি ভঙ্গ হয় না।"
করণীয়
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করুন—অন্তর থেকে অনুতপ্ত হোন। ২. কালিমা তাইয়্যেবা পড়ুন—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"। ৩. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন—আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। ৪. বিয়ে নবায়ন করবেন না—কারণ ইমান ভঙ্গ হয়নি। ৫. নেক আমল বাড়ান—নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-ইস্তিগফার। ৬. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন—তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা যুমার: ৫৩)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | না জেনে কুফরি কথা/কাজ—ইমান যায়? | না, ইমান যায় না | | "আয়ু ৮০ বছর হওয়া উচিত" বলা—ইমান যায়? | না, যদি আল্লাহর হুকুমের অবমাননার নিয়ত না থাকে | | ইমান হারা হব? | না, ইনশাআল্লাহ | | বিয়ে নবায়ন করতে হবে? | না, কারণ ইমান ভঙ্গ হয়নি |
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে ইমানের উপর অটল রাখুন এবং অজ্ঞতাবশত ভুল থেকে হেফাজত করুন। আমিন।