ঈমান ও বিবাহ নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন
Faith and Belief · Hanafi
Question
ক- কেউ বললো আমি তো খারাপ মরলে আমার আরো সমস্যা হবে তারপর একথা শুনে সবাই হেসে ফেললো । এখানে মৃত্যুকে বিদ্রুপ করা হয়নি ।এতে কি ঈমান চলে যাবে ?
খ- কোন পর্দানশীল নারীকে কেও মজা করে - দরবেশ ,ভূত ,হুজুর এরকম ডাকলো এতে পর্দাকে বিদ্রুপের নিয়ত ছিল না ।এতে ঈমান চলে যাবে?
গ - কেউ বললো একজনে অনেক বড় ভূল করে ফেলেছে আসলে সে বিয়ে করে ফেলেছে।বিবাহকে বিদ্রুপ করার নিয়ত ছিলনা । কিন্তু বিবাহ নিয়ে এরকম মজা করে কথা বললে কি ঈমান চলে যাবে?
মুলত কথা হলো কেউ যদি ঠাট্টা বিদ্রুপ করার নিয়ত ব্যাতীত ইসলামের কোন বিষয় নিয়ে মজা করে কিছু বলে এবং বুঝতে না পারে এমনকি এ ব্যাপারে চিন্তাও না করে যে কথাটা কুফরি হলো কিনা তাহলে কি তার ঈমান চলে যাবে?
২- অনেক সময় ঈমান নিয়ে সন্দেহ লাগলে কালিমা পড়ি । এরজন্য বিবাহও কি নবায়ন করতে হবে?
৩- কেউ অজ্ঞতাবসত কোন কুফরী বিশ্বাস লালন করলো বা কুফরী বাক্য বললো বা কুফরী কাজ করলো । অজ্ঞাতার কারণে সে কাফির হবেনা বলে জানি ।তো তাকে বোঝানোর পর সে তাওবা করে ঈমান নবায়ন করলো এখন কি তার বিবাহ নবায়ন করতে হবে?
৪- বিবাহের সময় সাক্ষীরা যদি পাত্র পাত্রী এবং তাদের বাবাকে ব্যাক্তিগতভাবে একদম না চেনে এবং বিয়ের মজলিসে পাত্র বা পাত্রী না থাকে এবং তাদের বাবাও না থাকে তাদের প্রতিনিধি থাকে এক্ষেত্রে কি বিবাহ শুদ্ধ হবে ?
৫- বিবাহের সময় যদি পাত্রীর পরিবারের কেউ সেচ্ছায় তার প্রতিনিধি হয় এবং পাত্রী এতে মনে মনে সম্মত থাকে তাহলে কী বিবাহ শুদ্ধ হবে?
Answer
ঈমান ও বিবাহ সংক্রান্ত ফতোয়া
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: দ্বীন বা শরীআতের বিষয় নিয়ে বিদ্রুপের নিয়ত ছাড়া মজা করে কিছু বলার হুকুম
-
শরয়ী মূলনীতি:
ইসলামের কোনো অকাট্য বিধান, প্রথা বা দ্বীনী প্রতীক (শে'আয়ের) নিয়ে ইচ্ছেকৃতভাবে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা তুচ্ছজ্ঞান করা অকাট্য কুফরী। তবে যদি কারো অন্তরে বা বাক্যে ইসলামের কোনো বিধানকে তুচ্ছ করা, অবমাননা করা বা বিদ্রূপ করার বিন্দুমাত্র নিয়ত না থাকে, বরং নিছক কথার কথা, সামাজিক রসিকতা বা দৈনন্দিন কৌতুক হিসেবে এমন কথা বলে ফেলে যার দ্বারা শরীআতের বিধানকে অপমান করা উদ্দেশ্য ছিল না, তবে তার দ্বারা মানুষ কাফের হয় না এবং ঈমান চলে যায় না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১২২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৩০; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৮, ৯১]। -
ক) "মরলে আমার আরো সমস্যা হবে" শুনে হাসা:
এতে মৃত্যুকে বা আখেরাতকে বিদ্রূপ করার কোনো নিয়ত ছিল না, বরং সাধারণ একটি কথা শুনে মানুষ হেসে ফেলেছে। তাই এর দ্বারা ঈমান নষ্ট হবে না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০]। -
খ) পর্দানশীন নারীকে "ভূত/দরবেশ/হুজুর" ডাকা:
পর্দার বিধানকে বিদ্রূপ করার নিয়ত ছাড়া যদি কেবল ব্যক্তির পোশাক বা চালচলন নিয়ে রসিকতা করে ডাকা হয়ে থাকে, তবে তাতে শরীআতের পর্দাকে অপমান করা বোঝায় না। ফলে এর দ্বারা ঈমান চলে যাবে না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১২২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৮]। তবে কাউকে কষ্টদায়ক বা অসম্মানজনক উপনামে ডাকা গুনাহের কাজ। -
গ) "বিয়ে করে বড় ভুল করে ফেলেছি" বলা:
বিবাহের শরয়ী বিধানকে বিদ্রূপ করার নিয়ত ছাড়া, বৈবাহিক জীবনের নানা ঝুটঝামেলা বা সংসারের দায়িত্বের কষ্ট বোঝাতে সাধারণ কৌতুক করে বললে তাতে বিবাহকে বিদ্রূপ করা হয় না এবং ঈমান নষ্ট হয় না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩০]।
২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: ঈমানে সন্দেহ হলে কালিমা পড়ার পর বিবাহ নবায়নের প্রয়োজন আছে কি না
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
অহেতুক মনস্তাত্ত্বিক সংশয়, শয়তানী ওয়াসওয়াসা বা নিছক সন্দেহের কারণে যদি কেউ নিজের আত্মতুষ্টি বা সতর্কতার জন্য কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে বা তওবা-ইস্তিগফার করে, তবে তার জন্য বিবাহ নবায়ন (তাজদীদে নিকাহ) করা একেবারেই প্রয়োজন নেই [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৮]। কারণ অহেতুক সন্দেহের দ্বারা কখনোই বিবাহ ভঙ্গ হয় না।
৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: অজ্ঞতাবশত কুফরী করে তওবা ও ঈমান নবায়নের পর বিবাহ নবায়নের হুকুম
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
যদি কোনো ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত বা ভুল ধারণার কারণে স্পষ্ট কোনো কুফরী শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে বা কুফরী আকীদা লালন করে, যার দ্বারা শরীআতের বিচারে সে কাফের হয়ে যায়, তবে পরবর্তীতে বিষয়টি অনুধাবন করে তওবা ও পুনরায় ঈমান আনার পর সতর্কতামূলকভাবে (احتياطاً) দু'জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুনভাবে মোহর ধার্য করে বিবাহ নবায়ন (তাজদীদে নিকাহ) করে নেওয়া আবশ্যক [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩০; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২১২]। - তবে উক্ত বিষয়টি যদি স্পষ্ট ও অকাট্য কুফরী না হয়ে অস্পষ্ট বা অনভিপ্রেত ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে, তবে কেবল তওবা ও ইস্তিগফারই যথেষ্ট; আলাদাভাবে বিবাহ দোহরানো বাধ্যতামূলক নয় [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০]।
৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: সাক্ষীরা পাত্র-পাত্রী বা তাদের পিতাকে না চিনলে এবং উকিল দ্বারা বিবাহ পড়ালে বিবাহ শুদ্ধ হবে কি না
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
বিবাহের মজলিসে উপস্থিত দু'জন বালেগ মুসলিম সাক্ষীর সামনে যদি পাত্র ও পাত্রীর পক্ষ থেকে নিযোজিত প্রতিনিধি (উকিল) ইজাব ও কবুল সম্পাদন করে, এবং ইজাব-কবুলের সময় অনুপস্থিত পাত্র ও পাত্রীর নাম, তাদের পিতার নাম ও সুনির্দিষ্ট পরিচয় এমনভাবে উচ্চারণ করে যার দ্বারা পাত্র-পাত্রীকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় (تعيين অর্জিত হয়), তবে সাক্ষীগণ পাত্র-পাত্রী বা তাদের পিতাকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বিবাহ সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ ও সহীহ হয়ে যাবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৯, ৩০; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৭, ১২০, ১২৪; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ৯৩]। - কারণ সাক্ষীদের জন্য মূল শর্ত হলো—বিবাহের প্রস্তাব ও কবুল শোনা এবং যে পাত্র-পাত্রীর আকদ হচ্ছে তাদের স্পষ্ট পরিচয় ও নাম শুনতে পাওয়া [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৪]।
৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: পাত্রীর পরিবারের কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উকিল হলে এবং পাত্রী মনে মনে সম্মত থাকলে বিবাহ শুদ্ধ হবে কি না
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
প্রাপ্তবয়স্কা ও বুদ্ধিমতী নারীর পূর্বানুমতি ছাড়া পরিবারের কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রতিনিধি/উকিল হয়ে বিবাহ পড়ালে উক্ত বিবাহ প্রথমে 'মাওয়াক্কুফ' (অনুমোদনের ওপর স্থগিত) থাকে। পরবর্তীতে পাত্রী যদি মৌখিকভাবে বা আচরণে (যেমন: কুমারী মেয়ে সংবাদ শুনে নীরব থাকলে বা বিবাহে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলে) সম্মতি প্রদান করে, তবে উক্ত বিবাহ শরীআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ও নাফেয হয়ে যাবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৫, ৫১; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৭২, ৭৩; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৪]। - আর যদি প্রস্তাবের কথা শুনে বা বিবাহের পূর্বেই মেয়ে মনে মনে সম্মত থাকার পাশাপাশি কোনো বাচনিক বা আচরণগত ইতিবাচক বার্তা দিয়ে থাকে, তবে তো শুরু থেকেই বিবাহ সহীহ হিসেবে গণ্য হবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫১]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১১শ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ২৯, ৩০, ২৫, ৫১, ১৭০ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — উকিলের পরিচয়, সাক্ষীর শর্তাবলী, বিবাহ নবায়ন ও ফাসিদ বিবাহের বিধান) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৫, ২৯, ৩০, ৫১, ১৭০]।
- ২০শ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ১২০, ১২২ (অধ্যায়: আকাইদ — অনিচ্ছাকৃত কৌতুক ও অহেতুক বাক্যে কুফরী না হওয়ার বিবরণ) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১২২]।
- ২১শ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৩০ (অধ্যায়: আলফাজুল কুফর — বিদ্রুপের নিয়তহীন কথা ও তওবার পর তাজদীদে নিকাহের হুকুম) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৩০]।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:
- ২য় খণ্ড: পৃষ্ঠা: ২৩, ৭২, ৭৩, ৯৩ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — সাক্ষীদের যোগ্যতা, অনুপস্থিত পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও ওকলাতের মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খন্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ৭২, ৭৩, ৯৩]।
- ৪র্থ খণ্ড: পৃষ্ঠা: ৮৮, ৯১, ২১২ (অধ্যায়: কিতাবু আহকামিল মুরতাদ্দীন — কুফরী কালাম ও তওবার পর বিবাহের বিধান) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খন্ড), পৃষ্ঠা: ৮৮, ৯১, ২১২]।
৩. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৭, ১২০, ১২৪, ১৩৪: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — বিবাহের সাক্ষ্যের মূলনীতি, ওয়াকিল নিয়োগ ও অনুমতি অর্জনের শরয়ী নিয়ম) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৭, ১২০, ১২৪, ১৩৪]।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।