নবুওয়াত কী? ইসলামে নবুওয়াতের সংজ্ঞা কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
নবুওয়াত কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
নবুওয়াত (النبوة) হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মনোনীত ব্যক্তির প্রতি ওহি প্রেরণের মাধ্যমে তাকে নবী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা। নবী হলেন সেই ব্যক্তি, যাঁর কাছে আল্লাহ তাআলা ওহি পাঠান এবং যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে দ্বীন পৌঁছানোর দায়িত্ব পান।
বিস্তারিত আলোচনা
১. নবুওয়াতের সংজ্ঞা
নবুওয়াত আরবি শব্দ "نبوة" থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো সংবাদ দেওয়া বা উচ্চ মর্যাদা। পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক কোনো মনোনীত বান্দার প্রতি ওহি নাজিল করা এবং তাকে মানুষের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছানোর জন্য নির্বাচিত করা—এটাই নবুওয়াত।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ "আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি, তা এজন্য যে আল্লাহর অনুমতিক্রমে তার আনুগত্য করা হবে।" (সূরা আন-নিসা: ৬৪)
২. নবী ও রাসূলের পার্থক্য
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
- নবী (نبي): যাঁর কাছে আল্লাহ তাআলা ওহি পাঠান, তবে তিনি নতুন শরিয়ত নিয়ে আসেন না; বরং পূর্ববর্তী নবীর শরিয়তের অনুসরণ করেন।
- রাসূল (رسول): যিনি নতুন শরিয়ত ও কিতাব নিয়ে আসেন এবং কিতাবধারী নবী হন।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"প্রত্যেক রাসূল নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন।"
৩. নবুওয়াতের প্রকারভেদ
হানাফি উলামায়ে কেরামের মতে, নবুওয়াত দুই প্রকার:
- নবুওয়াতে তাশরী' (تشريعية): নতুন শরিয়ত নিয়ে আসা—যেমন হযরত মুসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.), হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
- নবুওয়াতে ইরশাদ (إرشادية): পূর্ববর্তী শরিয়তের অনুসরণ ও সংস্কার করা—যেমন বনী ইসরাইলের অনেক নবী।
৪. নবুওয়াতের শর্তাবলি
শরহে আকাইদে তহাবিয়া ও ফাতাওয়া উসমানি-তে বর্ণিত হয়েছে, নবুওয়াতের জন্য নিম্নলিখিত গুণাবলি অপরিহার্য:
- পুরুষ হওয়া (নারী নবী হতে পারেন না—এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত মত)
- স্বাধীন হওয়া
- মানবজাতির মধ্য থেকে হওয়া
- নিষ্পাপ (মাসুম) হওয়া
- আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত হওয়া
৫. নবুওয়াতের সিলসিলা সমাপ্ত
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ "মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী।" (সূরা আল-আহযাব: ৪০)
মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লেখেন: "খাতামুন নাবিয়্যীন" অর্থ নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর সমাপ্ত। তাঁর পরে কোনো নবী আসবেন না—এটি কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে।
৬. নবুওয়াত সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের আকিদা
ফাতাওয়া উসমানি (১/১৩৫) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বর্ণিত:
- নবুওয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দান, কোনো অর্জনযোগ্য পদ নয়।
- হযরত মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী—তাঁর পরে কোনো নবী নেই।
- যারা নতুন নবুওয়াতের দাবি করে, তারা কাফির ও মুরতাদ।
- নবীদের সংখ্যা: প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবী, তন্মধ্যে ৩১৩ জন রাসূল।
৭. নবুওয়াতের প্রয়োজনীয়তা
বাহিশতী জেওর-এ হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লেখেন:
মানুষের হেদায়াতের জন্য নবুওয়াত অপরিহার্য। কারণ:
- মানুষ একা নিজের বিবেক দিয়ে সঠিক পথ পায় না।
- আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি জানার জন্য নবীর শিক্ষা প্রয়োজন।
- আখিরাতের সফলতার জন্য নবীর নির্দেশনা অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপ
নবুওয়াত হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ বান্দাদের প্রতি ওহি প্রেরণের মাধ্যমে তাদের নবী হিসেবে মনোনীত করা। নবীগণ নিষ্পাপ, আল্লাহর মনোনীত এবং মানবজাতির হেদায়াতের জন্য প্রেরিত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী; তাঁর পরে কোনো নবী নেই। এই আকিদা পোষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানের অংশ।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআনুল কারীম
- আল-হিদায়া (ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী)
- রাদ্দুল মুহতার (ইমাম ইবনে আবিদিন শামী)
- ফাতাওয়া আলমগিরি
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (হযরত আশরাফ আলী থানভী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- বাহিশতী জেওর (হযরত আশরাফ আলী থানভী)
- শরহে আকাইদে তহাবিয়া (ইমাম তহাবী)