হতাশা
Halal and Haram · Hanafi
Question
কি করবো আমি এখন,,আর ব্যাংকের চাকরি ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক ঠিক আছে
Answer
হিংসা (হাসাদ) ও সরকারি ব্যাংকের চাকরি: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
ভূমিকা
প্রশ্নে দুটি বিষয় রয়েছে: (১) বন্ধুর সাফল্যে হিংসা হওয়া এবং পড়াশোনায় অনীহা — এর শরীয়তসম্মত সমাধান কী? (২) সরকারি ব্যাংকের চাকরি ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক জায়েয কি না?
প্রথম বিষয়: হিংসা (হাসাদ) — একটি মারাত্মক রোগ
হাসাদের সংজ্ঞা ও ভয়াবহতা
হাসাদ হলো — অন্য কারো নিয়ামত দেখে এটা কামনা করা যে, তার থেকে তা চলে যাক। এটি কেবল একটি মানসিক ব্যাধি নয়; বরং এটি এমন এক আত্মিক রোগ, যা নেক আমলগুলোকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: «لَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَنَاجَشُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا»
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬৪
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ»
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯০৩
অর্থাৎ, হাসাদ থেকে বেঁচে থাকো; কারণ হাসাদ নেক আমলগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।
হাসাদের শরীয়তসম্মত সমাধান
১. হাসাদের বিপরীতে দুআ করা: বন্ধুর জন্য বরকতের দুআ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — যখন কেউ তার ভাইয়ের জন্য গোপনে দুআ করে, ফেরেশতা বলেন: "তোমার জন্যও অনুরূপ।" (সহিহ মুসলিম)
২. তাওহিদ ও তাকদিরে বিশ্বাস দৃঢ় করা: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا﴾
— সূরা আয-যুখরুফ: ৩২
অর্থাৎ, আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করেছি। সুতরাং বন্ধু যা পেয়েছে, তা আল্লাহরই দেওয়া; তাতে হিংসার কিছু নেই।
৩. নিজের অবস্থান বুঝুন: আপনি পড়াশোনায় অনীহা অনুভব করছেন — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শয়তান চায় আপনি হতাশায় ডুবে যান। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا﴾
— সূরা ফাতির: ৬
৪. হতাশা নয়, চেষ্টা করুন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ... احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ»
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৬৪
অর্থাৎ, শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তুমি যা উপকারী তা অর্জনে আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অলসতা করো না।
৫. হাসাদের চিকিৎসা: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন — হাসাদের চিকিৎসা হলো: (ক) হাসাদকারী ব্যক্তির জন্য দুআ করা, (খ) তার প্রশংসা করা, (গ) তার সাথে সদাচরণ করা। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৩০-এর কাছাকাছি)
দ্বিতীয় বিষয়: সরকারি ব্যাংকের চাকরি — ইসলামি বিধান
মূলনীতি
ইসলামি শরীয়তে ব্যাংকের চাকরির বিধান নির্ভর করে ব্যাংকের কার্যক্রমের উপর:
১. সম্পূর্ণ সুদভিত্তিক প্রচলিত ব্যাংক: যদি ব্যাংকটি সম্পূর্ণ সুদভিত্তিক হয় এবং চাকরির দায়িত্বে সরাসরি সুদি লেনদেন, সুদি হিসাব রক্ষণ, সুদি ঋণ প্রদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে — তবে এমন চাকরি নাজায়েয। কারণ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾
— সূরা আল-বাকারা: ২৭৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের লেখক ও সাক্ষী — সকলের উপর লানত করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৩৩)
২. ইসলামি ব্যাংক বা শরীয়াহ-সম্মত ব্যাংক: যদি ব্যাংকটি ইসলামি শরীয়াহ মেনে পরিচালিত হয় (যেমন: ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক ইত্যাদি) — তবে সেখানে চাকরি করা জায়েয।
৩. সরকারি ব্যাংক: বাংলাদেশের সরকারি ব্যাংকগুলো (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ইত্যাদি) প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংক। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
- যদি চাকরির দায়িত্ব সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত হয় (যেমন: সুদি হিসাব রক্ষণ, সুদি ঋণ অনুমোদন, সুদি লেনদেন সম্পাদন) — তবে নাজায়েয।
- যদি চাকরির দায়িত্ব সুদি লেনদেনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হয় (যেমন: সাধারণ প্রশাসনিক কাজ, আইটি, হিসাবরক্ষণ যেখানে সুদি লেনদেন নেই, গ্রাহক সেবা যেখানে সুদি লেনদেন নেই) — তবে জায়েযের সুযোগ রয়েছে; তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া
মুফতি তাকি উসমানি সাহেব ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন:
"প্রচলিত ব্যাংকে চাকরি করা — যদি চাকরির দায়িত্ব সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত না হয়, তবে জায়েয; আর যদি সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তবে নাজায়েয।"
— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪০০-এর কাছাকাছি
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর ফতোয়া
মুফতি মুহাম্মদ শফি সাহেব ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন:
"যে চাকরিতে সুদি লেনদেন সরাসরি করতে হয়, তা নাজায়েয। আর যে চাকরিতে সুদি লেনদেনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তা জায়েয।"
— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৩০০-এর কাছাকাছি
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর বক্তব্য
রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"সুদি লেনদেনে সহায়তা করা — তা লেখা হোক, সাক্ষী হওয়া হোক বা হিসাব রক্ষণ হোক — সবই গুনাহ।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯০-এর কাছাকাছি
আপনার করণীয়
১. হাসাদ থেকে তাওবা করুন: বন্ধুর জন্য দুআ করুন, তার সাফল্যে খুশি হোন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ»
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩
২. পড়াশোনায় মনোযোগ দিন: হতাশা নয়; বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾
— সূরা আত-তালাক: ৩
৩. নিজের রিজিক নিয়ে চিন্তা করুন: আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের জন্য রিজিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। আপনার রিজিক আপনার কাছে পৌঁছবেই; কারো পাওয়া আপনার রিজিক কেড়ে নেয় না।
৪. ব্যাংকের চাকরির বিষয়ে: আপনার বন্ধু যদি সরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন এবং তার দায়িত্ব সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তবে তিনি যেন সম্ভব হলে এমন বিভাগে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন যেখানে সুদি লেনদেন নেই; অথবা ইসলামি ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন। আর যদি তার দায়িত্ব সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত না হয়, তবে চাকরি করা জায়েয।
৫. আল্লাহর কাছে দুআ করুন: "হে আল্লাহ! আমাকে হাসাদ থেকে রক্ষা করুন, আমাকে দ্বীনের ও দুনিয়ার সাফল্য দান করুন, এবং আমাকে হালাল রিজিক দান করুন।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | হাসাদ করা | হারাম, কবিরা গুনাহ | | বন্ধুর সাফল্যে খুশি হওয়া | মুমিনের বৈশিষ্ট্য | | পড়াশোনায় অনীহা | শয়তানের ওয়াসওয়াসা, দূর করা কর্তব্য | | সম্পূর্ণ সুদভিত্তিক ব্যাংকে সরাসরি সুদি লেনদেনের চাকরি | নাজায়েয | | সুদি লেনদেনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন চাকরি | জায়েয (সতর্কতাসহ) | | ইসলামি ব্যাংকের চাকরি | জায়েয |
দুআ
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ، وَارْزُقْنِي رِزْقًا حَلَالًا طَيِّبًا، وَطَهِّرْ قَلْبِي مِنَ الْحَسَدِ وَالْحِقْدِ
"হে আল্লাহ! আপনার যিকির, শোকর ও সুন্দর ইবাদতে আমাকে সাহায্য করুন; আমাকে হালাল ও পবিত্র রিজিক দান করুন; এবং আমার قلبকে হাসাদ ও হিংসা থেকে পবিত্র করুন।"
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।