কাবিনের বকেয়া টাকা ২৬/২৭ বছর পর পরিশোধ করলে কি বাড়তি দিতে হবে?
Family Life · Hanafi
Question
একজনের ২০০০ সালে ৩ লক্ষ টাকা কাবিন ছিল,২৬/২৭ বছর পর পরিশোধ করলে, ঐ পরিমাণ ই কি পরিশোধ করবে? টাকার মান তো পরিবর্তন হয়েছে,সেই হিসেবে কি এখন টাকার পরিমাণ বাড়বে?
আর বিয়ের স্বর্ণের গহনা, কাপড় এবং অন্যান্য জিনিস যা বরপক্ষ নিয়ে এসেছিলো, সেগুলোর পরিমাণ টাকা কি এই কাবিনের টাকা থেকে বাদ যাবে?
Answer
কাবিনের বকেয়া টাকা পরিশোধ: দীর্ঘ সময় পর মূল্যায়ন ও বাদ-সংক্রান্ত বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে): ১. কাবিনে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (৩ লক্ষ) ধার্য হয়েছিল, দীর্ঘ ২৬/২৭ বছর পরও ঠিক সেই ৩ লক্ষ টাকাই পরিশোধ করতে হবে। মুদ্রার মান কমে যাওয়া বা মূল্যস্ফীতি (inflation) বিবেচনায় কাবিনের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না—এটি ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি।
২. বরপক্ষ বিয়েতে যে স্বর্ণের গহনা, কাপড় ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে এসেছিল, সেগুলো কাবিনের টাকা থেকে বাদ যাবে না—কারণ এগুলো কাবিন নয়, বরং বিয়ের উপহার/হাদিয়া বা স্ত্রীর প্রতি স্বামীর স্বেচ্ছা-দান। তবে যদি বিবাহের সময় স্পষ্ট শর্ত থাকে যে "এই জিনিসগুলো কাবিনের অন্তর্ভুক্ত" বা "কাবিনের টাকা থেকে সমন্বয় হবে", তাহলে ভিন্ন কথা।
বিস্তারিত আলোচনা
১. কাবিন কী এবং এর প্রকৃতি
কাবিন (মোহর) হলো বিবাহের সময় স্বামীর উপর স্ত্রীর প্রাপ্য একটি আর্থিক দায় (দায়ন)। এটি স্ত্রীর অধিকার, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দাও।" (সূরা নিসা: ৪)
وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا "তারা তোমাদের থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছে।" (সূরা নিসা: ২১)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা নারীদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থান আল্লাহর কালিমার মাধ্যমে হালাল করেছ।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
২. মুদ্রার মান পরিবর্তন হলেও কাবিনের পরিমাণ বাড়ে না
ফিকহের মূলনীতি হলো—ঋণ বা দায় সর্বদা সেই নির্দিষ্ট পরিমাণেই বহাল থাকে, যা চুক্তির সময় নির্ধারিত হয়েছিল। মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমলেও ঋণের পরিমাণ বাড়ে না।
দলিল:
-
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: ঋণ (দায়ন) যদি নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন ৩ লক্ষ টাকা) নির্ধারিত হয়, তবে পরিশোধের সময় ঠিক সেই সংখ্যাই দিতে হবে; মুদ্রার মান হ্রাস-বৃদ্ধি ঋণের পরিমাণে কোনো প্রভাব ফেলে না। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু, ৭/৩৯০-এর আশপাশে)
-
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে: "ঋণ যদি নির্দিষ্ট মুদ্রায় নির্ধারিত হয়, তবে তা সেই মুদ্রাতেই পরিশোধ করতে হবে, যদিও মুদ্রার মান পরিবর্তিত হয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
-
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি সাহেব বলেন: "কাবিনের টাকা একটি ঋণ (দায়ন)। ঋণ কখনো মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়ে না। তবে যদি কাবিন স্বর্ণ বা রূপার ওজনে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই ওজনের মূল্য পরিশোধ করতে হবে।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২১-এর কাছাকাছি)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি রহ. বলেন: "কাবিনের টাকা যদি সংখ্যায় নির্ধারিত হয়, তবে সেই সংখ্যাই দিতে হবে; টাকার মান কমে গেলেও বাড়তি দিতে হবে না।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৯০-এর কাছাকাছি)
সারকথা: ২০০০ সালে ৩ লক্ষ টাকা কাবিন ধার্য হলে, ২০২৬/২৭ সালে পরিশোধের সময়ও ৩ লক্ষ টাকাই দিতে হবে। মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়তি দাবি করা ফিকহসম্মত নয়।
বিয়ের গহনা, কাপড় ও অন্যান্য জিনিস কি কাবিন থেকে বাদ যাবে?
উত্তর: না, বাদ যাবে না। কারণ:
-
কাবিন হলো স্ত্রীর প্রাপ্য একটি নির্দিষ্ট দায়, যা বিবাহ চুক্তিতে নির্ধারিত হয়।
-
বিয়ের গহনা, কাপড়, উপহার ইত্যাদি হলো বরপক্ষের স্বেচ্ছা-দান (হাদিয়া/হিবা) বা বিয়ের রীতি-নীতি অনুযায়ী প্রদত্ত জিনিস। এগুলো কাবিনের অংশ নয়, যদি না স্পষ্ট শর্ত থাকে।
-
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে: "বিবাহের সময় বর যদি কনেকে কিছু উপহার দেয়, তা মোহরের অন্তর্ভুক্ত হবে না, যদি না মোহর হিসেবে নির্ধারিত হয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল নিকাহ)
-
বাহিশতী জেওর-এ আশরাফ আলী থানভি রহ. বলেন: "বিয়ের সময় যে গহনা-কাপড় দেওয়া হয়, তা যদি মোহর হিসেবে ধার্য না হয়, তবে তা মোহরের টাকা থেকে বাদ যাবে না।" (বাহিশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়)
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি বিবাহের সময় উভয় পক্ষের সম্মতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে "এই গহনা/জিনিসগুলো কাবিনের অংশ" বা "কাবিনের টাকা থেকে এগুলোর মূল্য সমন্বয় হবে", তাহলে সেই শর্ত অনুযায়ী সমন্বয় হবে। অন্যথায় নয়।
والله أعلم بالصواب