আত্মীয়দের জুলুম নির্যাতনের দরুণ তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখলে কি কোনো সমস্যা হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 610
Questioner: Nodi
Question Asked: 23 May 2026, 02:50 PM
Reviewed & Published: 23 May 2026, 03:03 PM
Views: 104
Tokens: 3,121
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
আমি মানুষটা যত যায় হোক আত্মীয়তার সম্পর্কটা বজায় রাখার চেষ্টা করি কারন হাদিসে তাই করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আত্মীয়দের রিসেন্ট কিছু ব্যবহার আর সম্পর্ক বজায় রাখার অনীহা দেখে মাঝে মাঝে নিজের মনে প্রশ্ন জাগে যে আসলে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টা চাপিয়ে দিয়ে আমার আর আমার মায়ের উপর জুলুম করছি না তো? তারা বলতে গেলে আমাদের কদরই করে না। আমার আব্বুরা ৩ ভাই,সবাই প্রবাসী। আব্বু সবার বড়। আর্থিক অবস্থা মুটামুটি ভালো আলহামদুলিল্লাহ। প্রয়োজন এর জিনিস কিনার পর শখের জিনিস কিনার টাকা থাকে না বা টাকা গুনতে হয় এমন অবস্থা আরকি। কিন্তু আমার মেজো চাচাদের আমাদের থেকে অবস্থা আরো ভালো। তাদের নিজস্ব বাড়ি আছে আমাদের দাদাবাড়ীতে। আগে একসাথে সবার একটা বাড়ি ছিল। এখন সেটা বিক্রি করে যে যার ভাগের টাকা নিয়েছে। আর আমার মেজ চাচা আমাদের কেউকে না জানিয়ে একটা বাড়ি করে ফেলেছে( সবার একসাথে নতুন একটা বাড়ি করার কথা ছিল)। তাই নিজেদের ভিটে আর বাড়ি না থাকায় আমাদের বিভিন্ন ছুটিতে তাদের বাসায় উঠতে হয়। এটা তাদের পছন্দ না। পুরোপুরি প্রকাশ না করলেও বুঝা যায়। যাই হোক মূল কথায় আসি।।আমার মাকে নানা ভাবে ইঙ্গিত করে অপমান করে আমার ফুফু। মেজ আর ছোট চাচি সরাসরি আপমান না করলেও যখন ফুফুর সাথে একত্রে হয় তখন আমাদের নিয়ে নানা কথা বলে আমাদের অনুপস্থিতিতে। তাদের বাচ্চাদের বানিয়েছে এমনভাবে যেন নরম তুলতুলে মনের পরিবর্তে এদের মনে আর ব্যবহারে যে কেউকে নিয়ে কলুষতা দেখা যায়। এমন একটা নেগেটিভ পরিবেশে যেখানে আমাদের কেউই ওয়েলকাম ফিল করি না, আমাদের কি যাওয়া উচিত? আমার মা যেতে চান না কিন্তু আমিই এতদিন জোর করে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিয়ে যেতাম। কিন্তু তাদের ব্যবহারগুলো খুবই কষ্ট দিচ্ছে আমাদের। তাই আমি আপনার থেকে সমাধান চাচ্ছি যে আমাদের কি করা উচিত?আমার কি করা উচিত?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। তবে ইসলাম কখনোই নিজের বা পরিবারের ওপর জুলুম করতে বলেনি। কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, কিন্তু যদি সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে নিজের বা পরিবারের ক্ষতি হয়, তাহলে তা জোরপূর্বক না করে দূর থেকে সম্পর্ক বজায় রাখার উপায় বের করতে হবে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ:

আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তুমি আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর অপব্যয় করো না।" (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৬)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সে ব্যক্তি সম্পর্ক বজায় রাখে না যে প্রতিদান দেয়, বরং সম্পর্ক বজায় রাখে সে ব্যক্তি যে, যখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, তখন সে তা যুক্ত রাখে।" (বুখারি, ৫৯৯১)

তবে ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কারো সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে, আপনি নিজের বা পরিবারের ওপর জুলুম করবেন। যদি আত্মীয়রা প্রকাশ্যে অপমান করে, কষ্ট দেয়, এবং আপনার মা মানসিকভাবে কষ্ট পান, তাহলে তাদের সাথে প্রতিশোধ নেওয়া বা সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা জায়েজ নয়। বরং আপনি দূর থেকে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, যেমন: ফোনে খোঁজ নেওয়া, সালাম জানানো, প্রয়োজনে উপহার পাঠানো ইত্যাদি।

হানাফী ফিকহের রেফারেন্স:

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ এ লিখেছেন:
“যদি আত্মীয়দের সাথে মেলামেশা করলে দ্বীনের ক্ষতি হয় বা মালের ক্ষতি হয়, অথবা তারা অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, তাহলে তাদের থেকে দূরে থাকা জায়েজ। তবে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা জায়েজ নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৯)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘বেহেশতী জেওর’ এ লিখেছেন:
“আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং মুস্তাহাব। যদি সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে দ্বীনের কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে তা ছেড়ে দেওয়া জায়েজ।” (বেহেশতী জেওর, ৮/২৫)

আপনার জন্য পরামর্শ:

১. আপনার মায়ের অনুভূতিকে প্রাধান্য দিন: যেহেতু আপনার মা যেতে চান না, তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। ইসলাম মা-বাবার প্রতি সদয় হতে বলেছে। আপনার মায়ের মানসিক শান্তি ও স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ।
২. নিজে একা বা কম গিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখুন: আপনি নিজে যেতে পারেন, তবে যদি সেখানেও কষ্ট পান, তাহলে ফোনে যোগাযোগ রাখা যথেষ্ট।
৩. উপহার বা সালামের মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখুন: হাদিসে এসেছে, উপহার দেওয়া ভালোবাসা বাড়ায় এবং সম্পর্ক সুদৃঢ় করে। (তিরমিজি)
৪. দোয়া করুন: তাদের জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ যেন তাদের হেদায়েত দেন এবং সম্পর্ক উন্নত করেন।
৫. ক্ষমা করুন এবং ধৈর্য ধরুন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।” (মুসলিম)

সারসংক্ষেপ:
আপনি যদি দেখেন যে, তাদের সাথে মেলামেশা আপনার এবং আপনার মায়ের জন্য মানসিক কষ্টের কারণ, তাহলে আপনি তাদের সাথে দূর থেকে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন। জোর করে কোনো জায়গায় না যাওয়াই উত্তম। তবে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও সৎ উদ্দেশ্যের বিনিময় দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.