বাবার পক্ষপাতিত্ব, সন্তানদের প্রতি অবহেলা ও পারিবারিক সমস্যায় ইসলামী সমাধান।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পারিবারিক সমস্যা: বাবার পক্ষপাতিত্ব ও সন্তানদের করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন সন্তান জানতে চাচ্ছেন—তাঁর বাবা ছেলে-মেয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, কিন্তু নিজের ভাই (চাচা) ও তাদের সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত মায়া ও দায়িত্ব দেখান। সন্তানরা পড়াশোনার জন্য বাইরে থাকেন, বাবা খোঁজও নেন না। অসুস্থ হলেও খোঁজ নেন না। ব্যবসার ক্ষেত্রে নিজের ছেলেকে টাকা দেন না, কিন্তু চাচাদের দিয়ে ব্যবসা করান। বাবা-মায়ের মধ্যে সবসময় ঝগড়া লেগে থাকে। মায়ের সাথে সম্পর্কও ভালো নয়। এসব কারণে সন্তানদের অনেক কষ্ট হয় এবং তারা বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এখন তাদের করণীয় কী?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও সমাধান
১. সন্তানদের প্রতি বাবার দায়িত্ব ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামে সন্তানদের ভরণপোষণ (নাফাকা), শিক্ষা-দীক্ষা, স্নেহ-মমতা ও ন্যায্য আচরণ করা বাবার অবশ্যই পালনীয় দায়িত্ব। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা আত-তাহরীম: ৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল, এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সহীহ বুখারী: ৮৯৩, সহীহ মুসলিম: ১৮২৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"সন্তানের উপর বাবার হক হলো—সে তার নাম সুন্দর রাখবে, তাকে সুন্দরভাবে আদব-শিষ্টাচার শেখাবে এবং তাকে ভালো শিক্ষা দেবে।" (সুনানে বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট আছে যে, বাবার উপর সন্তানের নাফাকা (ভরণপোষণ) ওয়াজিব, যদি সন্তান নাবালেগ হয় বা অসহায় থাকে। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৬১৭, আল-হিদায়া: ২/৩৫০)
সুতরাং বাবার এই অবহেলা ও পক্ষপাতিত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহ ও দায়িত্বে অবহেলা। তবে সন্তানের জন্য বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা খারাপ ব্যবহার করা সমাধান নয়।
২. বাবার পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ সন্তানদের মধ্যে ন্যায্য আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন:
"তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায্য আচরণ করো।" (সহীহ বুখারী: ২৫৮৭, সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
একটি হাদীসে এসেছে, নুমান ইবনে বশীর (রাঃ) বলেন, আমার বাবা আমাকে একটি দাস দান করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি তোমার সব সন্তানকে সমানভাবে দিয়েছ?" তিনি বললেন, "না।" তখন রাসূল ﷺ বললেন:
"তাহলে তুমি এটা ফিরিয়ে নাও, কারণ আমি অন্যায়ের উপর সাক্ষী হতে পারি না।" (সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, সন্তানদের মধ্যে দান-সদকায় সমতা রাখা মুস্তাহাব, আর জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় বিষয়ে সমতা রাখা ওয়াজিব। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/৬৯০, ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩৪২)
তবে মনে রাখতে হবে—বাবার সম্পদ বাবার নিজের। তিনি চাইলে কাউকে বেশি দিতে পারেন, তবে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা ইসলামে নিন্দনীয়।
৩. সন্তানদের করণীয় কী?
(ক) বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না
আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:
"তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদের 'উফ'ও বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (সুনানে তিরমিযী: ১৮৯৯)
সুতরাং বাবা অন্যায় করলেও সন্তানের জন্য বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা, গালি দেওয়া, কটু কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। এতে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতি ছাড়া কিছুই হবে না।
(খ) ধৈর্য ধারণ করা ও আল্লাহর উপর ভরসা করা
"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহঃ) মা'আরিফুল কুরআনে লেখেন—পিতা-মাতার অবহেলা বা অন্যায়ের সময় সন্তানের উচিত ধৈর্য ধারণ করা, তাদের জন্য দুআ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। (মা'আরিফুল কুরআন: ৫/৪৩০)
(গ) বাবার সাথে সদাচরণ ও দুআ করা
বাবা যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন, তবুও সন্তানের কর্তব্য হলো:
- বাবার সাথে নরম ভাষায় কথা বলা — কঠোরতা নয়।
- বাবার জন্য দুআ করা — হেদায়েতের জন্য।
- বাবার খোঁজ নেওয়া — তিনি না নিলেও আপনি নিন, এতে সওয়াব আছে।
- বাবার প্রতি সম্মান বজায় রাখা — যদিও তিনি অন্যায় করেন।
আল্লাহ বলেন:
"আর তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
(ঘ) মায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নত করা
মায়ের সাথে সম্পর্ক ভালো না থাকলেও ইসলামে মায়ের হক সবচেয়ে বেশি। রাসূল ﷺ বলেছেন:
"তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করো, তারপর মায়ের, তারপর মায়ের, তারপর তোমার বাবার।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)
মায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করুন, তাকে সম্মান করুন, তার জন্য দুআ করুন।
(ঙ) পারিবারিক ঝগড়ায় হস্তক্ষেপ করা
বাবা-মায়ের ঝগড়া তাদের মধ্যকার বিষয়। সন্তান হিসেবে আপনি:
- মধ্যস্থতা করতে পারেন — নরমভাবে বুঝিয়ে।
- কোনো পক্ষ নিয়ে কাউকে অপমান করবেন না।
- ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখুন — দুআ ও সদাচরণের মাধ্যমে।
(চ) নিজের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ুন
বাবার অবহেলার কারণে পড়াশোনা বন্ধ করবেন না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে নিজের চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রয়োজন হলে হালাল উপায়ে নিজের উপার্জনের ব্যবস্থা করুন। ইসলামে নিজের ভরণপোষণের জন্য চেষ্টা করা জায়েয।
(ছ) অভিভাবক বা সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে সমাধান
যদি বাবার আচরণ অসহনীয় হয়, তবে পরিবারের সম্মানিত কোনো ব্যক্তি, ইমাম, বা মুফতি সাহেবের মাধ্যমে বাবার সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করুন। সরাসরি ঝগড়া বা অভিযোগ করা নয়।
৪. ব্যবসার ক্ষেত্রে বাবার সিদ্ধান্ত
বাবার সম্পদ বাবার নিজের। তিনি চাইলে নিজের ভাইদের সাথে ব্যবসা করতে পারেন, ছেলেকে না দিতে পারেন। ইসলামে এটা তার অধিকার। তবে সন্তানের প্রতি অবহেলা ও বৈষম্য করা আখিরাতে তার জবাবদিহির বিষয়। আপনি তার জন্য দুআ করুন, যেন আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন।
মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) ফাতাওয়া উসমানীতে লেখেন—পিতা-মাতার সম্পদ তাদের নিজের; সন্তানদের তা দাবি করার অধিকার নেই, তবে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা পিতার জন্য গুনাহ। (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৫)
৫. সংক্ষিপ্ত করণীয় তালিকা
| করণীয় | বর্জনীয় | |--------|---------| | বাবার সাথে নরম ভাষায় কথা বলা | বাবাকে গালি দেওয়া বা কটু কথা বলা | | বাবার জন্য দুআ করা | বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা | | মায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নত করা | মাকে অপমান করা | | নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া | পড়াশোনা বন্ধ করা | | ধৈর্য ধারণ করা | রাগের বশে খারাপ ব্যবহার করা | | সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে সমাধান | সরাসরি ঝগড়া করা | | নিজের হালাল উপার্জনের চেষ্টা | হারাম পথে টাকা আয় |
৬. শেষ কথা
আপনার কষ্ট স্বাভাবিক, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো—অন্যায়ের জবাবে অন্যায় নয়। বাবা যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন, তার জবাবদিহি আল্লাহর কাছে হবে। আপনার কর্তব্য হলো ধৈর্য, দুআ, সদাচরণ ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।" (সূরা আশ-শারহ: ৬)
আল্লাহ আপনার পরিবারে শান্তি ও হেদায়েত দান করুন। আমীন।