স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ থেকে চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন দ্বীনদার লোক নামাজ পড়ে দাড়ি আছে। তিনি পাইলসের ঔষধ দেন। একটা ছোট গাছের ঢাল কোমরে সুতা দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। তিনি দাবি করেন ঔষধটা তিনি স্বপ্নে পেয়েছেন এবং অনেএএক রোগী ভালো হয়েছেন, অনেক ডাক্তারও রোগীকে উনার কাছে রেফার করেন। তিনি কবিরাজ না সম্ভবত।
▪️এক্ষেত্রে উনার নিকট থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে? বা কি করণীয় বিস্তারিত জানাবেন অনুগ্রহ করে।
MBBS ডাক্তার দেখাতে গেলে ডাক্তারকে লজ্জাস্থান দেখাতে হবে এইজন্য আমি যথাসম্ভব ইনার নিকট থেকে চিকিৎসা নিতে চাচ্ছিলাম ।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির নিকট থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করা শর্তসাপেক্ষে জায়েয। তবে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে:
১. তিনি যদি কবিরাজ বা ঝাড়-ফুঁক/তাবিজ-কবজ/জিন-শয়তানের সাহায্য ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট না হন, বরং শুধু একটি ভেষজ/গাছের ঢাল ব্যবহার করেন, তাহলে তার নিকট থেকে চিকিৎসা নেওয়া যাবে।
২. স্বপ্নে ঔষধ পাওয়ার দাবি নিজে নিজে শরীয়তসম্মত চিকিৎসার দলিল নয়। স্বপ্ন শরীয়তের দলিল নয়। তবে যদি অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পরীক্ষায় তা উপকারী প্রমাণিত হয় এবং তাতে হারাম বা শিরকি কিছু না থাকে, তাহলে তা ব্যবহার করা যাবে।
৩. কোমরে সুতা দিয়ে গাছের ঢাল বেঁধে রাখা — যদি তা শুধু ঔষধ সংরক্ষণ বা ব্যবহারের একটি পদ্ধতি হয়, তাহলে জায়েয। কিন্তু যদি বিশ্বাস করা হয় যে সুতা বা ঢাল নিজেই রোগ সারায়, অথবা তাবিজ-কবজ বা জিনের সাহায্য নেওয়া হয়, তাহলে তা শিরক/হারাম এবং তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
৪. লজ্জাস্থান দেখানোর বিষয়: চিকিৎসার প্রয়োজনে সম্মানিত ডাক্তারের কাছে লজ্জাস্থান দেখানো প্রয়োজনের পরিমাণে জায়েয। তবে ডাক্তার সম্মানিত (মুসলিম, আমানতদার) হওয়া শর্ত। শুধু লজ্জার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করা ঠিক নয়, কারণ এতে বড় ক্ষতি হতে পারে।
বিস্তারিত:
১. চিকিৎসা গ্রহণের মূল নীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً» "তোমরা চিকিৎসা করাও; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো রোগ এমনভাবে সৃষ্টি করেননি যার ঔষধও সৃষ্টি করেননি।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০৩৮)
তবে চিকিৎসার উপায় অবশ্যই শরীয়তসম্মত হতে হবে। হারাম, শিরকি বা জিন-শয়তানের সাহায্যভিত্তিক চিকিৎসা নিষিদ্ধ।
২. স্বপ্নে ঔষধ পাওয়ার দাবি
স্বপ্ন শরীয়তের দলিল নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো হুকুম প্রমাণিত হয় না। তবে যদি কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি স্বপ্নে কোনো উপকারী ভেষজের কথা জানতে পারেন এবং বাস্তবে তা পরীক্ষিত হয়, তাহলে তা ব্যবহারে দোষ নেই — শর্ত হলো তাতে শিরকি বিশ্বাস বা হারাম পদ্ধতি না থাকা।
৩. সুতা/তাবিজ/কবজের বিধান
- যদি সুতা বা গাছের ঢাল শুধু ঔষধ রাখার মাধ্যম হয় → জায়েয।
- যদি বিশ্বাস করা হয় যে সুতা/ঢাল নিজেই রোগ সারায় → শিরক।
- যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত বা দুআ থাকে → কিছু আলেম জায়েয বলেছেন, তবে সাধারণভাবে তাবিজ-কবজের প্রতি ঝুঁকে পড়া উচিত নয়।
- যদি তাবিজে জিন-শয়তানের নাম, অশ্লীল বাক্য বা বোধগম্য নয় এমন কিছু থাকে → হারাম ও শিরক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ» "নিশ্চয়ই ঝাড়-ফুঁক (শিরকি), তাবিজ ও ভালোবাসা সৃষ্টির (শিরকি) উপায় — এগুলো শিরক।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৮৩; মুসনাদে আহমাদ)
৪. লজ্জাস্থান দেখানোর বিধান
চিকিৎসার প্রয়োজনে ডাক্তারকে লজ্জাস্থান দেখানো প্রয়োজনের পরিমাণে জায়েয। ফিকহের কায়েদা:
«الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ» "প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।"
তবে শর্ত:
- ডাক্তার আমানতদার ও যোগ্য হতে হবে।
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু না দেখা।
- সম্ভব হলে সম্মানিত (মুসলিম) ডাক্তার নির্বাচন করা।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, চিকিৎসার প্রয়োজনে পরনারীর সতর দেখা জায়েয, তবে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে।
৫. করণীয়
১. প্রথমে যাচাই করুন — তিনি কবিরাজ কিনা, তাবিজ-কবজ বা জিনের সাহায্য নেন কিনা। ২. যদি শুধু ভেষজ/গাছের ঢাল হয় এবং তাতে শিরকি কিছু না থাকে → চিকিৎসা নিতে পারেন। ৩. যদি তাবিজ-কবজ, জিন-শয়তানের সাহায্য বা শিরকি বিশ্বাস থাকে → সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। ৪. পাশাপাশি একজন যোগ্য MBBS ডাক্তারকেও দেখান; প্রয়োজনে লজ্জাস্থান দেখাতে দ্বিধা করবেন না — এতে শরীয়তের অনুমতি আছে। ৫. সুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে; ঔষধ শুধু মাধ্যম। তাই দুআ ও তাওয়াক্কুলের সাথে চিকিৎসা চালিয়ে যান।
والله أعلم بالصواب والسلام علیکم ورحمة الله وبركاته