স্বপ্নে প্রস্রাব করতে দেখা

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6065
Questioner: Suraia Islam
Question Asked: 28 Sep 2026, 11:30 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 11:33 AM
Views: 15
Tokens: 5,080
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি অবিবাহিত নারী। স্বপ্নে প্রায়ই নিজেকে প্রস্রাব করতে দেখি । কিন্তু সেটা অন্য কারো সামনে । অর্থাৎ আড়ালে নয়, কারো উপস্থিতিতে। এমন স্বপ্ন দেখার কারণ কি?

Answer

স্বপ্নে প্রস্রাব করতে দেখা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও করণীয়

ভূমিকা

প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ব্যক্তিগত। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—স্বপ্নের ব্যাখ্যা বা তার কারণ নির্ণয় করা কোনো নিশ্চিত ইলম (জ্ঞান) নয়। স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারে, শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে, অথবা নিছক মনের কল্পনা ও দৈহিক অবস্থার প্রতিফলন হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখার "কারণ" কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না; বরং আমরা হাদীসের আলোকে সাধারণ দিকনির্দেশনা দিতে পারি।

হাদীসের আলোকে স্বপ্নের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

স্বপ্ন তিন প্রকার: ১. আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, ২. শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, ৩. মানুষের নিজের মনের কল্পনা (حديث النفس)।

— (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩; সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৯০)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

"তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তবে সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে; তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।"

— (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২)

এই স্বপ্নের সম্ভাব্য কারণসমূহ

১. শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ভয় দেখানো

শয়তান মানুষের মনে অশ্লীলতা, লজ্জা ও অপমানজনক দৃশ্য ঢুকিয়ে দিতে ভালোবাসে। বিশেষত অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে লজ্জা ও পবিত্রতার বিষয়টি শয়তানের বিশেষ লক্ষ্য। এ ধরনের স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে।

২. দৈহিক কারণ (Physiological)

  • মূত্রথলি পূর্ণ থাকা: ঘুমের মধ্যে মূত্রথলি ভরে গেলে মস্তিষ্ক প্রস্রাবের অনুভূতি তৈরি করে, যা স্বপ্নে প্রস্রাব করার দৃশ্য হিসেবে প্রকাশ পায়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ও স্বাভাবিক কারণ।
  • ঘুমের গভীরতা ও মূত্রাশয়ের সংকোচন: গভীর ঘুমে মূত্রাশয় সংকুচিত হলে এ ধরনের স্বপ্ন আসতে পারে।
  • অতিরিক্ত পানি পান, দেরিতে পানি পান, বা মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI): এগুলোও কারণ হতে পারে।

৩. মনের কল্পনা ও দুশ্চিন্তা

অবিবাহিত থাকার কারণে লজ্জা, সামাজিক ভয়, বা নিজের পবিত্রতা নিয়ে দুশ্চিন্তা মনের গভীরে থাকলে তা স্বপ্নে প্রতিফলিত হতে পারে। এটি "حديث النفس" বা মনের কল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

৪. "অন্য কারো সামনে" দেখার বিষয়টি

স্বপ্নে লজ্জাজনক দৃশ্য অন্য কারো সামনে দেখা সাধারণত শয়তানের কুমন্ত্রণার অংশ, যাতে মানুষ লজ্জিত ও বিব্রত হয়। এটি বাস্তব কোনো ঘটনার ইঙ্গিত নয়, বরং শয়তানের ভয় দেখানোর কৌশল।

করণীয় ও করণীয় নয়

করণীয়:

  1. স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া বা দুশ্চিন্তা করা যাবে না—এটি ইমানের দুর্বলতার লক্ষণ।
  2. বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (হালকা, শুকনো) এবং আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়া।
  3. শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং অপছন্দনীয় স্বপ্ন কারো কাছে বর্ণনা না করা।
  4. ডান কাত হয়ে শোয়া (সুন্নত) এবং ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া।
  5. ঘুমের আগে অতিরিক্ত পানি পান না করা এবং প্রস্রাব করে ঘুমানো।
  6. নামাজ-ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা—এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করে।
  7. মেডিকেল কারণ সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া (যেমন UTI বা মূত্রথলির সমস্যা)।

করণীয় নয়:

  • স্বপ্নের ভিত্তিতে নিজেকে অপবিত্র বা গুনাহগার মনে করা।
  • স্বপ্নটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা বা বারবার কারো কাছে বলা।
  • স্বপ্নকে ভবিষ্যতের কোনো অশুভ ইঙ্গিত মনে করা।

ফিকহি দিকনির্দেশনা

স্বপ্নে প্রস্রাব করলে কি গোসল ফরজ হয়?

না। স্বপ্নে প্রস্রাব করা বা বাস্তবিক প্রস্রাবের অনুভূতি গোসল ফরজ করে না। গোসল ফরজ হয় কেবল স্বপ্নদোষ (মযি/মনি বের হওয়া) বা জাগ্রত অবস্থায় সহবাস দ্বারা।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "গোসল ফরজ হয় ইহতিলাম (স্বপ্নদোষ) বা জাগ্রত অবস্থায় ইনযাল (বীর্য নির্গমন) দ্বারা।"

— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৯)

স্বপ্নে প্রস্রাব করলে কি নামাজ কাজা হবে?

না। স্বপ্নে প্রস্রাব করা বাস্তব অপবিত্রতা নয়; এটি নিছক স্বপ্ন। তবে জাগ্রত হয়ে যদি বাস্তবে অপবিত্রতা থাকে, তাহলে পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ পড়তে হবে।

স্বপ্নে প্রস্রাব করলে কি কাফফারা বা গুনাহ আছে?

না। স্বপ্নে কোনো কাজ করা গুনাহ নয়, কারণ স্বপ্নে মানুষের ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ও স্বপ্নের কল্পনা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা কাজ করে।"

— (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২৭)

বিশেষ পরামর্শ (অবিবাহিত নারীর জন্য)

  1. লজ্জা ও পবিত্রতা রক্ষা করুন—নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির বাড়ান।
  2. ঘুমের আগে সূরা নাস, ফালাক, ইখলাস ও আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
  3. ঘুমের আগে প্রস্রাব করে নিন এবং শোয়ার আগে ১-২ ঘণ্টা পানি পান কমান।
  4. ডান কাত হয়ে শোয়া সুন্নত।
  5. স্বপ্নটি কারো কাছে বর্ণনা করবেন না—এটি শয়তানকে খুশি করে।
  6. নিয়মিত ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন।
  7. শারীরিক সমস্যা সন্দেহ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সারসংক্ষেপ

  • স্বপ্নে প্রস্রাব করা সাধারণত শয়তানের কুমন্ত্রণা, দৈহিক কারণ (মূত্রথলি পূর্ণ), বা মনের কল্পনা।
  • এটি গুনাহ নয়, গোসল ফরজ করে না, নামাজ কাজা করে না।
  • ভয় পাওয়া, লজ্জিত হওয়া বা দুশ্চিন্তা করা শয়তানের কৌশল।
  • আউযুবিল্লাহ পড়া, বাম দিকে থুথু ফেলা, স্বপ্ন কারো কাছে না বলা—এগুলো সুন্নতী আমল।
  • নামাজ-ইবাদত বাড়ানো এবং শারীরিক কারণ থাকলে চিকিৎসা—এটাই সমাধান।

মূল কথা: এই স্বপ্নকে ভয়ের কারণ মনে করবেন না। এটি সাধারণত শয়তানের কুমন্ত্রণা বা দৈহিক কারণ। সুন্নতী আমল করুন, ইবাদত বাড়ান, এবং শারীরিক সমস্যা সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.