কসমের কাফফারার রোজা অবস্থায় কষ্ট, বমি আসা বা মাথা ঝিম ধরা হলে রোজা ভাঙা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
কসমের কাফফারা রোজা অবস্থায় অসুস্থতা বা কষ্ট হলে করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী কসমের কাফফারা হিসেবে রোজা রাখছেন। ঘুম কম হওয়া, কলেজে যাতায়াতে কষ্ট, বাসে বমি আসা এবং প্রচণ্ড মাথা ঝিম ধরা—এসব অবস্থায় তিনি রোজা ভাঙতে পারবেন কি না এবং এতে গুনাহ হবে কি না জানতে চেয়েছেন।
বিস্তারিত উত্তর
১. কসমের কাফফারার রোজার বিধান
কসম ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
"অতএব তার কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা তাদের বস্ত্র দান, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। কিন্তু যে সামর্থ্য না রাখে, তার জন্য তিন দিন রোজা রাখা।" — সূরা আল-মায়িদা: ৮৯
কসমের কাফফারার রোজা তিন দিন। এটি একটি নির্দিষ্ট ইবাদত, যা শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া ভঙ্গ করা জায়েজ নয়।
২. রোজা ভঙ্গের শরীয়তসম্মত কারণ
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গ করার অনুমতি শুধুমাত্র তখনই আছে যখন:
- মৃত্যুর আশঙ্কা হয়, অথবা
- অসুস্থতা এতটা বেড়ে যায় যে রোজা রাখলে জান-মালের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, অথবা
- এমন অসুস্থতা হয় যা সাধারণত রোজার কারণেই হয় না, বরং অসহনীয় হয়ে পড়ে।
রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"যদি রোজাদারের এমন অসুস্থতা হয় যে, রোজা রাখলে তার জানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ।" — রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪২১
৩. আপনার বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- ঘুম কম হয়েছে
- বাসে বমি আসছে
- মাথা ঝিম ধরেছে
- কলেজে যাতায়াতে কষ্ট হচ্ছে
এগুলো সাধারণ কষ্ট ও অস্বস্তি। এগুলো এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে জানের ক্ষতির আশঙ্কা হয়। বমি আসা মানেই বমি হয়নি—যদি বমি না হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। আর মাথা ঝিম ধরা, ঘুম কম হওয়া—এগুলো রোজার স্বাভাবিক কষ্টের অন্তর্ভুক্ত।
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:
"রোজার স্বাভাবিক কষ্ট, দুর্বলতা বা অস্বস্তির কারণে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। তবে যদি এমন অসুস্থতা হয় যা সহ্য করা কঠিন এবং জানের ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে ভঙ্গ করা যাবে।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৫
৪. আপনার করণীয়
- রোজা ভাঙবেন না — বর্তমান অবস্থায় এটি ভঙ্গ করা জায়েজ নয়।
- বাসে বমি আসলে মুখ বন্ধ রাখুন, বমি হওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। যদি বমি না হয়, রোজা ঠিক থাকবে।
- বিশ্রাম নিন — সম্ভব হলে কলেজে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন।
- সাহরি ও ইফতারে পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- যদি অবস্থা গুরুতর হয় — যেমন বমি হয়ে যায়, অথবা এমন দুর্বলতা হয় যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না, তখন রোজা ভঙ্গ করা যাবে এবং পরে কাজা আদায় করবেন।
৫. বমি সম্পর্কে বিশেষ বিধান
হাদিসে এসেছে:
مَنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ فَلَا قَضَاءَ عَلَيْهِ، وَمَنْ اسْتَقَاءَ فَلْيَقْضِ
"যার বমি এসে গেল (অনিচ্ছায়), তার উপর কাজা নেই। আর যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করল, সে কাজা করবে।" — সুনানে তিরমিজি: ৭২০
অর্থাৎ, বমি আসা মানেই রোজা ভাঙে না; বমি হওয়া মানে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। যদি বমি হয়ে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে।
৬. গুনাহের বিষয়
যদি আপনি শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া রোজা ভাঙেন, তাহলে গুনাহ হবে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে। তবে যদি সত্যিই এমন অসুস্থতা হয় যে জানের ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে ভঙ্গ করা জায়েজ এবং গুনাহ হবে না—তবে পরে কাফফারার ৩ টি রোযা ধারাবাহিক ভাবে পুনরায় আদায় করতে হবে।
পরামর্শ: আপনি এখন রোজা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। যদি অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বা জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়, তাহলে রোজা ভেঙে দিয়ে তবে পরে কাফফারার ৩ টি রোযা ধারাবাহিক ভাবে পুনরায় আদায় করতে হবে।তবে শুধু কষ্ট বা অস্বস্তির কারণে ভাঙবেন না।