কানাডা প্রবাসী মুসাফিরের কসর নামাজের বিধান: ১৫ দিনের কম বা বেশি থাকলে শশুরবাড়ি ও বাপের বাড়িতে কসর না পুরো নামাজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এক বোন কানাডায় থাকেন,স্বামী-সন্তান,শাশুড়ি সহ।
দেশে ২,৩ বছর পর আসেন।দেশে তাদের নিজস্ব কোনো ঘর করা হয়নি এখনো,দাদার আমলের ঘর টা আছে যেটাতে তার ভাসুর/দেবর রা থাকেন। আপুরা বাড়ি গেলে এক রুমে ওনাদের থাকতে দেন।
আবার আপুর বাপের বাড়ি থেকে শশুর বাড়ি সফর দূরত্ব না। আপু কিছুদিন বাপের বাড়ি,কিছুদিন শশুরবাড়ি থাকেন।
প্রশ্ন হল-
১. যদি তারা ১৫দিনের কম দেশে থাকে, তাহলে শশুরবাড়ি আর বাপের বাড়িতে ওনার ও ওনার হাসবেন্ডের কি কসর নামাজ আদায় করবেন নাকি পুরো নামাজ? যেহেতু ওনাদের এখনো নিজস্ব বাড়ি করেননি শশুরবাড়িতে এটার মালিকানাও ভাগ হয়নি ওনার ভাসুর-দেবর-জামাইদের মধ্যে।
২.১৫দিনের বেশি থাকলে কি ১৫দিন কসর এরপর পুরো নামাজ কিনা..(হাসবেন্ড ওয়াইফ ২জনের টাই জানতে চাচ্ছি)
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
হামদ ও সালাতের পর:
মূল নীতিমালা (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী মুসাফিরের কসর নামাজের বিধান নিম্নরূপ:
১. সফরের শর্তাবলি:
- কমপক্ষে ৪৮ মাইল (প্রায় ৭৭-৭৮ কিমি) দূরত্বের সফর হতে হবে।
- সফরের উদ্দেশ্যে নিজের এলাকা (যেখানে স্থায়ী বাসস্থান) ত্যাগ করতে হবে।
২. মুসাফির কতদিন কসর পড়বে:
- যদি কোনো মুসাফির কোনো এক স্থানে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার ইচ্ছা করে, তাহলে সে মুকিম হয়ে যাবে এবং পুরো নামাজ পড়বে।
- যদি ১৫ দিনের কম থাকার ইচ্ছা করে, তাহলে সে মুসাফির থাকবে এবং কসর পড়বে।
- যদি ১৫ দিনের কম থাকার ইচ্ছা করে, কিন্তু পরে তা বেড়ে যায় — তবে যতদিন ইচ্ছা নির্দিষ্ট না করে থাকবে, ততদিন কসরই পড়বে (এক্ষেত্রে ১৫ দিন পূর্ণ হলেও কসর চলবে, যতক্ষণ না সে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে)।
দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ "আর যখন তোমরা জমিনে সফর করো, তখন নামাজ কসর করাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।" (সূরা নিসা: ১০১)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى وَضَعَ عَنِ الْمُسَافِرِ الصَّوْمَ وَشَطْرَ الصَّلَاةِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মুসাফির থেকে রোজা ও অর্ধেক নামাজ (কসর) উঠিয়ে দিয়েছেন।" (তিরমিজি: ৫৫৫)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: মুসাফির যদি কোনো স্থানে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে, সে মুকিম হয়ে যায়। (আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত)
আপনার প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: ১৫ দিনের কম দেশে থাকলে শশুরবাড়ি ও বাপের বাড়িতে কসর না পুরো নামাজ?
উত্তর:
এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
(ক) নিজস্ব বাসস্থান (وطن اصلی) কী?
হানাফি ফিকহে "ওয়াতান" তিন প্রকার:
- وطن اصلی (স্থায়ী বাসস্থান): যেখানে ব্যক্তির নিজের ঘর-বাড়ি আছে, স্ত্রী-পরিবার আছে, এবং সেখানে ফিরে আসার ইচ্ছা আছে।
- وطن اقامت (অস্থায়ী বসবাসস্থান): যেখানে ১৫ দিন বা বেশি থাকার নিয়ত করে।
- وطن سكنی (বিশ্রামস্থল): যেখানে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করে।
এই বোনের ক্ষেত্রে:
- কানাডা তার وطن اصلی (স্থায়ী বাসস্থান) — কারণ সেখানে তার স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘর আছে।
- দেশে (বাংলাদেশে) তার নিজস্ব কোনো ঘর নেই — শশুরবাড়িতে মালিকানাও নেই, বাপের বাড়ি তো বাবার।
- সুতরাং দেশে তার وطن اصلی নেই।
(খ) শশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির হুকুম:
যদি দেশে আপনার বোনের শশুরবাড়িতে তার স্বামীর মালিকানা বাড়ী থাকে যদি তারা আপাতত তাতে বসবাস করছে না, তাহলে আপনার বোন তার শশুর বাড়ীতে মুকিম হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি তাদের নিজস্ব কোনো ঘর না থাকে, তাহলে আপনার বোন তার শশুর বাড়ীতে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে।
- বাপের বাড়ি: বাবার বাড়ি মেয়ের জন্য وطن اصلی হয় না (বিয়ের পর)। এটা তার জন্য وطن سكنی বা وطن اقامت হতে পারে যদি ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে।
- শশুরবাড়ি: শশুরবাড়ি স্বামীর বাবার বাড়ি। স্বামীর জন্যও এটা وطن اصلی তবে যদি স্বামীর নিজের মালিকানায় কোনো ঘর না থাকে. তাহলে এটাও وطن سكنی হিসেবে গণ্য হবে।
প্রশ্ন ২: ১৫ দিনের বেশি থাকলে কি ১৫ দিন কসর এরপর পুরো নামাজ?
উত্তর:
এখানে দুটি পরিস্থিতি:
পরিস্থিতি ক: যদি শুরুতেই ১৫ দিন বা বেশি থাকার নিয়ত করে দেশে আসে → প্রথম দিন থেকেই পুরো নামাজ পড়বে (উভয়েই)।
পরিস্থিতি খ: যদি ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করে আসে, কিন্তু পরে থাকা বেড়ে যায়:
- ইমাম আবু হানিফার মত: ১৫ দিন পূর্ণ হলেও কসরই চলবে (যতক্ষণ না নতুন নিয়ত করে)।
- সাহেবাইনের মত: ১৫ দিন পূর্ণ হলে মুকিম হয়ে যাবে, পুরো নামাজ পড়বে।
ব্যবহারিক ফতোয়া (আহতিয়াত): যেহেতু বিষয়টি ইজতেহাদি এবং উভয় মতই শক্তিশালী, তাই সতর্কতামূলক আমল হলো:
- যদি ১৫ দিন পূর্ণ হয়ে যায় এবং আরও থাকার সম্ভাবনা থাকে → পুরো নামাজ পড়া (সাহেবাইনের মত)।
- যদি ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পরও কসর পড়ে → ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী জায়েজ, তবে সতর্কতামূলক পথ পরিহার করা উত্তম।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"যদি মুসাফির ১৫ দিনের কম নিয়তে সফর করে, কিন্তু পরে ১৫ দিন পূর্ণ হয়ে যায়, তবে ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী কসর চলবে। তবে সাহেবাইনের মত অনুযায়ী পুরো নামাজ পড়া উত্তম।" (ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুস সালাত)
পরামর্শ: যেহেতু বিষয়টি জটিল এবং উভয় মতই বিদ্যমান, তাই নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি মাসআলা জিজ্ঞেস করে আমল করা উত্তম। বিশেষ করে সতর্কতামূলক পথ হলো — ১৫ দিন পূর্ণ হলে পুরো নামাজ পড়া।
والله أعلم بالصواب