কসমের কাফফারার রোজা রাখতে কষ্ট হলে কি করব?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
কসমের কাফফারার রোজা ভাঙা প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী কসমের কাফফারা হিসেবে রোজা রাখার নিয়ত করেছেন এবং রোজা অবস্থায় আছেন। এখন কষ্ট হচ্ছে—এই রোজা ভাঙা যাবে কি? ভেঙে পরে অন্য দিন রাখলে হবে কি?
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, কসমের কাফফারার রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা যাবে না। তবে যদি এমন কষ্ট হয় যা সহ্য করা কঠিন বা অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ভাঙার অনুমতি আছে—কিন্তু সেক্ষেত্রে পরে একদিন কাযা করতে হবে, এবং কাফফারার ধারাবাহিকতা (তাতাব্বু') ভেঙে যাবে, অর্থাৎ শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে আবার ৩ টি রাখতে হবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. কসমের কাফফারার রোজার বিধান
কসমের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আল্লাহ তোমাদেরকে অসার শপথের জন্য পাকড়াও করেন না, কিন্তু সেই শপথের জন্য পাকড়াও করেন যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করো। তার কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা তাদের বস্ত্রদান, অথবা একটি দাস মুক্ত করা। যে সামর্থ্য না রাখে, সে তিন দিন রোজা রাখবে। এটাই তোমাদের শপথের কাফফারা..." (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
২. কাফফারার রোজা কি নফল রোজার মতো?
না। কাফফারার রোজা ওয়াজিব। এটি নফল রোজা নয় যে, ইচ্ছা হলে ভেঙে ফেলবে। ওয়াজিব রোজা শুরু করার পর তা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা জায়েয নয়।
আল-হিদায়া-তে এসেছে:
"وإذا شرع في صوم الكفارة لا يجوز له أن يفطر إلا من عذر"
অর্থাৎ, কাফফারার রোজা শুরু করার পর বিনা ওজরে তা ভাঙা জায়েয নয়।
৩. কষ্ট হলে করণীয়
যদি কষ্ট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে:
- অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে, অথবা
- সহ্য করা সাধারণভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়,
তাহলে শরীয়তের অনুমতি আছে রোজা ভাঙার। কারণ আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
"নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
"তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ বা সফরে থাকে, সে অন্য দিনগুলোতে গণনা পূর্ণ করবে।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
৪. ভাঙলে কী করণীয়?
কাফফারার রোজা ভাঙলে দু'টি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে:
(ক) কাযা: যে দিন ভেঙেছেন, সেই দিনের বদলে পরে একদিন রোজা রাখতে হবে।
(খ) ধারাবাহিকতা (তাতাব্বু'): কাফফারার তিনটি রোজা ধারাবাহিকভাবে রাখা ওয়াজিব। মাঝখানে ভেঙে গেলে আবার শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা রাখতে হবে।
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"ولو أفطر في أثناء صوم الكفارة بلا عذر لزمه الاستئناف، لأن التتابع واجب"
অর্থাৎ, বিনা ওজরে কাফফারার রোজার মাঝখানে ভাঙলে পুনরায় শুরু থেকে রাখতে হবে, কারণ ধারাবাহিকতা ওয়াজিব।
তবে ওজর থাকলে (যেমন: অসুস্থতা, অতিরিক্ত কষ্ট) ভাঙলে কি তাতাব্বু' ভেঙে যাবে? এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের দু'টি মত আছে:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: ওজরে ভাঙলে তাতাব্বু' ভেঙে যায় না, শুধু কাযা করতে হবে।
- সাহিবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর মত: ওজরে ভাঙলেও তাতাব্বু' ভেঙে যায়।
ফতোয়ার ভিত্তি: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী ওজরে ভাঙলে তাতাব্বু' ভেঙে যায় না—এবং এটিই সহজ ও প্রযোজ্য মত। তবে احتياط (সতর্কতা) হলো পুনরায় শুরু থেকে রাখা।
৫. আপনার করণীয়
১. যদি কষ্ট সামান্য হয় (যেমন: ক্ষুধা-তৃষ্ণা স্বাভাবিক মাত্রায়), তাহলে রোজা ভাঙবেন না—পূর্ণ করুন।
২. যদি কষ্ট অসহনীয় হয় বা অসুস্থতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ভাঙতে পারেন। তবে:
- সেই দিনের কাযা করতে হবে।
- সতর্কতামূলকভাবে পুনরায় শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা রাখা উত্তম।
৩. ভাঙার পর অন্যদিন রাখলে হবে কি? — হ্যাঁ, কাযা হিসেবে রাখলে হবে। তবে শুধু একটি দিন রাখলেই কাফফারা আদায় হবে না যদি আপনি শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা না রাখেন। অর্থাৎ, তিনটি রোজা ধারাবাহিকভাবে পূর্ণ করা আবশ্যক।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | কাফফারার রোজা | ওয়াজিব, নফল নয় | | ইচ্ছাকৃত ভাঙা | জায়েয নয় | | অসহনীয় কষ্ট/অসুস্থতার আশঙ্কা | ভাঙার অনুমতি আছে | | ভাঙলে করণীয় | কাযা + পুনরায় ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা (احتياط) | | শুধু একটি দিন কাযা | যথেষ্ট নয়, তিনটি ধারাবাহিকভাবে পূর্ণ করতে হবে |
আরবি দলিল
وَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ... فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ (সূরা আন-নিসা: ২৯)
আল-হিদায়া: "وإذا شرع في صوم الكفارة لا يجوز له أن يفطر إلا من عذر"
রাদ্দুল মুহতার: "ولو أفطر في أثناء صوم الكفارة بلا عذر لزمه الاستئناف"
ফাতাওয়া উসমানি: কাফফারার রোজায় ওজরে ভাঙলে ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী তাতাব্বু' ভেঙে যায় না, শুধু কাযা ওয়াজিব।
উপদেশ
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমাদের রোজা রাখাই উত্তম, যদি তোমরা জানতে।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
তাই সামান্য কষ্টে রোজা ভাঙবেন না। তবে সত্যিই যদি অসহনীয় হয়, তাহলে শরীয়তের অনুমতি আছে—কিন্তু পরে অবশ্যই কাযা ও পুনরায় ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা পূর্ণ করবেন।