দৃষ্টি ঝাপসা (Myopia) থাকলে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানোর হুকুম কী? চশমা ছাড়া দূরের কিছু না দেখলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করলে কি গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানো জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কিন্তু যদি কারো দৃষ্টি ঝাপসা থাকে (হ্রসদৃষ্টি বা দূরদৃষ্টি) এবং চশমা ছাড়া তেমন দুরের কিছু দেখতে পারে না; অথবা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করে ফেলতে পারে(কেউ কেউ চোখ ট্যারা করে এরকম করতে পারে), তাহলে সে কি গায়রে-মাহরামের দিকে সরাসরি তাকাতে পারবে বা রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে(চোখ না নামিয়ে) চলতে পারবে(দৃষ্টি ঝাপসা অবস্থায়)? কোন শর্ত আছে কি(যেমন কতটুকু ঝাপসা হওয়া লাগবে ইত্যাদি)?
Answer
দৃষ্টি ঝাপসা (Myopia) থাকলে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানোর হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—যদি কারো দৃষ্টি ঝাপসা (হ্রসদৃষ্টি/দূরদৃষ্টি) থাকে, চশমা ছাড়া দূরের কিছু দেখতে পান না, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ ট্যারা করে দৃষ্টি ঝাপসা করে ফেলেন—তাহলে কি তিনি গায়রে-মাহরামের দিকে সরাসরি তাকাতে পারবেন বা রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে চলতে পারবেন? এর কোনো শর্ত আছে কি?
মূল নীতি: দৃষ্টি সংযত রাখার বিধান
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
"মুমিনদেরকে বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।" — (সূরা আন-নূর: ৩০)
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ...
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করবে..." — (সূরা আন-নূর: ৩১)
غض البصر (দৃষ্টি সংযত করা) শব্দের অর্থ শুধু চোখ বন্ধ করা নয়; বরং যেকোনো অবস্থায় গায়রে-মাহরামের প্রতি কুদৃষ্টি না করা। ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) বলেন:
"غض البصر سے مراد গায়রে-মাহরামের দিকে শাহওয়াতের দৃষ্টিতে না তাকানো। আর যদি শাহওয়াত ছাড়া তাকায়, তবে তা জায়েয নয়—বরং প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার তাকানো নিষিদ্ধ।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭)
দৃষ্টি ঝাপসা থাকলে তাকানোর হুকুম
১. দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া নিজে থেকে অনুমতি নয়
দৃষ্টি ঝাপসা থাকা বা চশমা ছাড়া দূরের কিছু না দেখা—এটি গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানোর অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ:
- শরীয়তের বিধান দৃষ্টির সংযতকরণ সম্পর্কে, দৃষ্টির স্পষ্টতা বা অস্পষ্টতা সম্পর্কে নয়।
- যদি কেউ দৃষ্টি ঝাপসা থাকার কারণে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকায়, তবে সে দৃষ্টি সংযত করার হুকুম পালন করছে না।
- ইমাম আল-কাসানী (রহ.) বলেন: "দৃষ্টি সংযত করা ফরজ; আর তা দৃষ্টির অবস্থা নির্বিশেষে প্রযোজ্য।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃ. ১২২)
২. ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করা
কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ ট্যারা করে বা অন্য কোনো উপায়ে দৃষ্টি ঝাপসা করে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকায়, তবে এটি আরও গুরুতর। কারণ:
- এটি হীলা (কৌশল) হিসেবে গণ্য হবে—যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
- ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি হীলার মাধ্যমে হারামকে হালাল করতে চায়, সে মূল বিধানের অধীনেই থাকবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭)
৩. রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা
রাস্তায় চলার সময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা সাধারণত জায়েয, তবে শর্ত হলো:
- দৃষ্টি সংযত রাখা—অর্থাৎ গায়রে-মাহরামের প্রতি শাহওয়াতের দৃষ্টিতে না তাকানো।
- যদি সামনে কোনো গায়রে-মাহরাম থাকে এবং তার প্রতি দৃষ্টি পড়ে, তবে দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়া ওয়াজিব।
- ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) বলেন: "দৃষ্টি সংযত করা ফরজ; আর তা সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য।" — (শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩)
শর্তাবলি
শর্ত ১: দৃষ্টি সংযত রাখা
দৃষ্টি ঝাপসা থাকলেও গায়রে-মাহরামের দিকে শাহওয়াতের দৃষ্টিতে তাকানো হারাম। যদি দৃষ্টি ঝাপসা থাকে এবং শাহওয়াতের সম্ভাবনা না থাকে, তবুও দৃষ্টি সংযত রাখাই উত্তম।
শর্ত ২: প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার না তাকানো
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
"হে আলী! প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় দৃষ্টি দিও না। কারণ প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য (ক্ষমাযোগ্য), কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার জন্য নয়।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৯; সুনানে তিরমিজি: ২৭৭৭)
শর্ত ৩: দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া অজুহাত নয়
যদি কেউ দৃষ্টি ঝাপসা থাকার কারণে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকায়, তবে সে দৃষ্টি সংযত করার হুকুম পালন করছে না। ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেন: "দৃষ্টি সংযত করা ফরজ; আর তা দৃষ্টির স্পষ্টতা বা অস্পষ্টতা নির্বিশেষে প্রযোজ্য।" — (ফায়যুল বারী, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৪৫)
শর্ত ৪: ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করা নিষিদ্ধ
কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ ট্যারা করে বা অন্য কোনো উপায়ে দৃষ্টি ঝাপসা করে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকায়, তবে এটি হীলা হিসেবে গণ্য হবে—যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
ফতোয়া
সারসংক্ষেপ:
১. দৃষ্টি ঝাপসা থাকা গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানোর অনুমতি নয়। দৃষ্টি সংযত করা ফরজ—তা দৃষ্টি স্পষ্ট হোক বা ঝাপসা।
২. ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করা এবং তার মাধ্যমে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানো হীলা হিসেবে নিষিদ্ধ।
৩. রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা জায়েয, তবে শর্ত হলো—গায়রে-মাহরামের প্রতি শাহওয়াতের দৃষ্টিতে না তাকানো। যদি দৃষ্টি পড়ে, তবে দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়া ওয়াজিব।
৪. প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার তাকানো নিষিদ্ধ।
৫. দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মাত্রা কোনো শর্ত নয়; বরং দৃষ্টি সংযত রাখাই মূল শর্ত।
উত্তম পন্থা: দৃষ্টি ঝাপসা থাকলেও দৃষ্টি সংযত রাখা, গায়রে-মাহরামের দিকে সরাসরি না তাকানো, এবং রাস্তায় চলার সময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা—তবে গায়রে-মাহরামের প্রতি দৃষ্টি পড়লে সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়া।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. দৃষ্টি সংযত করার ফজিলত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَضَّ بَصَرَهُ عَنْ مَحَاسِنِ امْرَأَةٍ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ النَّارَ
"যে ব্যক্তি কোনো (গায়রে-মাহরাম) নারীর সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি সংযত করবে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২২২০)
২. দৃষ্টি সংযত করার ব্যবহারিক উপায়
- নজর নামিয়ে রাখা—রাস্তায় চলার সময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা, তবে গায়রে-মাহরামের প্রতি দৃষ্টি না পড়া।
- চশমা ব্যবহার করা—যদি দৃষ্টি ঝাপসা থাকে, তবে চশমা ব্যবহার করা উত্তম, যাতে দৃষ্টি সংযত রাখা সহজ হয়।
- দৃষ্টি ঝাপসা করার চেষ্টা না করা—এটি হীলা হিসেবে গণ্য হবে।
- নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা—দৃষ্টি সংযত করা একটি ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়।
৩. দৃষ্টি ঝাপসা থাকলে করণীয়
- চশমা ব্যবহার করা—যদি সম্ভব হয়।
- দৃষ্টি সংযত রাখা—গায়রে-মাহরামের দিকে সরাসরি না তাকানো।
- রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা—তবে গায়রে-মাহরামের প্রতি দৃষ্টি পড়লে সাথে সাথে নামিয়ে নেওয়া।
- ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা না করা—এটি হীলা হিসেবে নিষিদ্ধ।
উপসংহার
দৃষ্টি ঝাপসা থাকা গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানোর অনুমতি নয়। দৃষ্টি সংযত করা ফরজ—তা দৃষ্টি স্পষ্ট হোক বা ঝাপসা। ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি ঝাপসা করা এবং তার মাধ্যমে গায়রে-মাহরামের দিকে তাকানো হীলা হিসেবে নিষিদ্ধ। রাস্তায় সামনের দিকে তাকিয়ে চলা জায়েয, তবে শর্ত হলো—গায়রে-মাহরামের প্রতি শাহওয়াতের দৃষ্টিতে না তাকানো। যদি দৃষ্টি পড়ে, তবে সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়া ওয়াজিব।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে দৃষ্টি সংযত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স
| কিতাব | খণ্ড/পৃষ্ঠা | |---|---| | সূরা আন-নূর | ৩০-৩১ | | সুনানে আবু দাউদ | ২১৪৯ | | সুনানে তিরমিজি | ২৭৭৭ | | মুসনাদে আহমাদ | ২২২০ | | রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন) | ৫/২৩৭ | | বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী) | ৫/১২২ | | শরহু মাআনিল আসার (তাহাবী) | ৩/২৩ | | ফায়যুল বারী (আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি) | ৪/৩৪৫ | | ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) | ৪/৩৮৫ | | ফাতাওয়া উসমানি (তাকী উসমানি) | ২/৩৩৫ |
আল্লাহই ভালো জানেন।