অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
মুসলিম দেশে জন্মে যদি দেখা যায় সেই দেশে বাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে বিভিন্ন কারণে, যেমন জান ও মালের নিরাপত্তা, ইত্যাদি, সেই ক্ষেত্রে কি অমুসলিম দেশে স্থায়ী ভাবে বাস করার জন্য সেইসব দেশে যাওয়া হালাল হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে উল্লিখিত অবস্থা—অর্থাৎ মুসলিম দেশে জান-মালের নিরাপত্তা না থাকা, দ্বীন পালনে চরম বাধা, জীবন-জীবিকার সংকট ইত্যাদি কারণে—প্রয়োজন ও শর্তসাপেক্ষে অমুসলিম দেশে হিজরত করা বা স্থায়ীভাবে বসবাস করা জায়েজ হতে পারে। তবে এটি সাধারণ অনুমতি নয়; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা, দ্বীন-পরিবেশ ও সন্তান-পরিবারের দ্বীনি ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি অমুসলিম দেশে গিয়ে দ্বীন পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে, বা সন্তানদের ঈমান-আমল নষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেখানে স্থায়ী বসবাস করা জায়েজ হবে না।
বিস্তারিত:
১) মূলনীতি:
ইসলামে মুসলিমের জন্য এমন স্থানে বসবাস করা উত্তম যেখানে সে দ্বীন পালন করতে পারে, ইবাদত-বন্দেগি, হালাল-হারামের পার্থক্য রক্ষা করতে পারে এবং পরিবার-সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দিতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُونِ
“হে আমার ঈমানদার বান্দারা! তোমরা আমার তাকওয়া অবলম্বন করো।” (সূরা যুমার: ১০)
আর হিজরতের ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে:
وَمَن يُهَاجِرْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَجِدْ فِي الْأَرْضِ مُرَاغَمًا كَثِيرًا وَسَعَةً
“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থল ও প্রশস্ততা পাবে।” (সূরা নিসা: ১০০)
২) হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের বর্ণিত মূলনীতি হলো—মুসলিমের জন্য কুফরি পরিবেশে বসবাস করা তখনই জায়েজ, যখন সে নিজের ঈমান-আমল রক্ষা করতে সক্ষম হবে এবং দ্বীন পালনে বাধাগ্রস্ত হবে না।
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
“মুসলিমের জন্য দারুল কুফরে বসবাস করা জায়েজ নয়, যদি না সে দ্বীন পালনে সক্ষম হয় এবং নিজের ঈমান রক্ষা করতে পারে।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৩০—হিজরত অধ্যায়)
আর ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) «আসার»-এ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আমি মুসলিমদের কুফরি দেশে বসবাস করতে নিষেধ করেছি।”
(মুসনাদে আবি হানিফা, পৃ. ৯০; শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড ২, পৃ. ১৪৫)
তবে যদি মুসলিম দেশে জান-মালের নিরাপত্তা না থাকে, দ্বীন পালনে বাধা থাকে, অথবা অমুসলিম দেশে দ্বীন পালনের সুযোগ বেশি থাকে, তাহলে হিজরত করা জায়েজ; বরং কখনো কখনো ওয়াজিবও হতে পারে।
আল্লামা কাসানি (রহ.) «বাদাইউস সানাই»-এ বলেন:
“যদি মুসলিম নিজের দ্বীন ও জান-মালের নিরাপত্তার জন্য অন্যত্র হিজরত করে, তবে তা জায়েজ।”
(বাদাইউস সানাই, খণ্ড ৭, পৃ. ১৩০)
৩) শর্তসমূহ:
অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি তখনই হবে যখন:
- সেখানে গিয়ে নিজের ঈমান-আমল রক্ষা করা সম্ভব হবে;
- হালাল রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা থাকবে;
- পরিবার-সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা ও تربিয়তের ব্যবস্থা থাকবে;
- কুফরি পরিবেশে নিজের বা সন্তানদের দ্বীন নষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা না থাকবে;
- মুসলিম দেশে ফিরে আসার বা দ্বীন পালনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকবে।
যদি অমুসলিম দেশে গিয়ে দ্বীন পালন করা কঠিন হয়, বা সন্তানদের ঈমান-আমল নষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা জায়েজ হবে না।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
“যদি কুফরি দেশে বসবাসের কারণে দ্বীন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা হারাম।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৩১)
৪) মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া:
«ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ আছে:
“মুসলিম দেশে যদি জান-মালের নিরাপত্তা না থাকে, দ্বীন পালনে বাধা থাকে, এবং অমুসলিম দেশে দ্বীন পালনের সুযোগ থাকে, তবে সেখানে হিজরত করা জায়েজ। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে দ্বীন ও সন্তান-সন্ততির ঈমান রক্ষা পায়।”
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৫০)
৫) মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর «মাআরিফুল কুরআন»-এ:
সূরা নিসার ৯৭-১০০ আয়াতের তাফসিরে তিনি বলেন:
“যে ব্যক্তি দ্বীন পালনে অক্ষম, তার জন্য হিজরত করা জরুরি। আর যে ব্যক্তি দ্বীন পালনে সক্ষম, তার জন্য হিজরত করা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়।”
(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ২, পৃ. ৪০০)
উপসংহার:
- যদি মুসলিম দেশে জান-মালের নিরাপত্তা না থাকে, দ্বীন পালনে বাধা থাকে, এবং অমুসলিম দেশে দ্বীন পালনের সুযোগ থাকে, তবে সেখানে হিজরত করা বা স্থায়ীভাবে বসবাস করা জায়েজ।
- তবে শর্ত হলো—সেখানে গিয়ে ঈমান-আমল রক্ষা করা, হালাল রুজি-রোজগার করা, সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হতে হবে।
- যদি অমুসলিম দেশে দ্বীন পালন কঠিন হয় বা সন্তানদের ঈমান নষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা জায়েজ নয়।
والله أعلم بالصواب