স্বপ্নে মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে কী হয়?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ, ওয়া কিনা আযাবান-নার।
রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ, ওয়াজ‘আলনা লিল-মুত্তাকীনা ইমামা।
এর তাবির কি জবতে পারে।
যে ব্যাক্তি দেখেছে সে অবিবাহিত
Answer
স্বপ্নের তাবির: মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করা
প্রশ্ন: কেউ স্বপ্নে দেখল যে, সে একটি গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছে এবং তার মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছে—"রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার" এবং "রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিও ওয়াজ'আলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা"। এর তাবির কী হতে পারে? যে ব্যক্তি দেখেছে সে অবিবাহিত।
উত্তর
প্রথম কথা: স্বপ্নের তাবির একটি অনুমানভিত্তিক বিষয়
জ্ঞাত থাকা আবশ্যক যে, স্বপ্নের তাবির (ব্যাখ্যা) কোনো অকাট্য (কতয়ি) বিষয় নয়; বরং এটি একটি অনুমান (যন্ন)। ইসলামী শরীয়তে স্বপ্নের তাবির করা নিষিদ্ধ নয়, তবে কেউ যদি নিজের স্বপ্নকে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ধরে নিয়ে তার উপর আমল করা বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে, তাহলে তা ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ، وَالرُّؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ
"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (অশুভ) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩
আরও ইরশাদ হয়েছে:
لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إِلَّا الْمُبَشِّرَاتُ
"নবুওয়াতের মধ্যে কেবল সুসংবাদদাতা (সৎ স্বপ্ন) ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০
দ্বিতীয় কথা: স্বপ্নে কুরআনের আয়াত পড়া বা দোয়া করার অর্থ
স্বপ্নে কুরআনের আয়াত পাঠ করা বা দোয়া করা—এটি সাধারণত কল্যাণকর ও শুভ স্বপ্নের অন্তর্ভুক্ত। কারণ কুরআন ও দোয়া আল্লাহর যিকির; আর যিকির সর্বদা বরকত ও হিদায়াতের প্রতীক। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব তাফসীরুল আহলাম-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নে কুরআন পাঠ করা বা কুরআনের আয়াত শোনা—এটি দ্বীনের ব্যাপারে মজবুত হওয়া, হিদায়াত লাভ এবং কল্যাণের দিকে ইঙ্গিত করে।
তৃতীয় কথা: স্বপ্নের প্রতীকসমূহের বিশ্লেষণ
আপনার স্বপ্নে কয়েকটি প্রতীক রয়েছে:
১. গোরস্থান (কবরস্থান): স্বপ্নে কবরস্থান দেখা সাধারণত আখিরাতের স্মারক (মৃত্যু, পরকাল, হিসাব-নিকাশ) এবং দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির দিকে ইঙ্গিত করে। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, কবরস্থান দেখা—নিজের আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার তাগাদা এবং দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে সরে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ইশারা।
২. মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়ানো: মৃত আত্মীয়কে স্বপ্নে দেখা—সাধারণত তার জন্য দোয়া করা, সদকা করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা—সে যদি সুখী অবস্থায় দেখা যায়, তবে তা কল্যাণের ইশারা; আর যদি দুঃখী দেখা যায়, তবে তার জন্য দোয়া ও সদকা করার নির্দেশ।
৩. দোয়া করা: স্বপ্নে দোয়া করা—আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হওয়া, বান্দার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা সৃষ্টি হওয়া এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ার ইশারা।
৪. "রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও..." আয়াত: এটি সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত। এই আয়াতে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ কামনা করা হয়েছে। স্বপ্নে এই আয়াত পড়া—দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভের দোয়া কবুল হওয়ার ইশারা।
৫. "রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা..." আয়াত: এটি সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াত। এই আয়াতে উত্তম স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি কামনা করা হয়েছে। স্বপ্নে এই আয়াত পড়া—বিশেষত অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য—শীঘ্রই উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের সুসংবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, স্বপ্নে বিবাহের দোয়া করা বা স্ত্রী-সন্তানের কথা বলা—বিবাহের সুসংবাদ।
চতুর্থ কথা: অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য বিশেষ ইশারা
যেহেতু স্বপ্নদ্রষ্টা অবিবাহিত, এবং তিনি সূরা ফুরকানের সেই আয়াতটি পড়ছেন যেখানে উত্তম স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির জন্য দোয়া করা হয়েছে—এটি একটি অত্যন্ত শুভ ইঙ্গিত। সম্ভবত:
- শীঘ্রই তাঁর বিবাহের ব্যবস্থা হবে।
- আল্লাহ তাঁকে দ্বীনদার ও উত্তম জীবনসঙ্গী দান করবেন।
- তাঁর অন্তরে বিবাহের প্রতি আগ্রহ ও আখিরাতের প্রস্তুতির চেতনা জাগ্রত হবে।
- তিনি সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে কুরআনের খিদমত করার তাওফিক পাবেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি কেবল একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা; আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
পঞ্চম কথা: করণীয়
স্বপ্নদ্রষ্টার জন্য করণীয় হলো:
- আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা—স্বপ্নটি কল্যাণকর, তাই আল্লাহর হামদ আদায় করুন।
- দাদার জন্য দোয়া ও সদকা করা—স্বপ্নে মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়ানো তার জন্য দোয়া ও সদকা করার তাগিদ।
- বিবাহের জন্য দোয়া করা—সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াত নিয়মিত পড়া এবং আল্লাহর কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করা।
- স্বপ্নকে নিয়ে অতি উৎসাহী না হওয়া—এটি কেবল একটি সম্ভাব্য ইশারা; এর উপর ভিত্তি করে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
- কারও কাছে স্বপ্নের তাবির চাওয়া—শরীয়তসম্মতভাবে স্বপ্নের তাবির জানতে চাওয়া দোষণীয় নয়, তবে তাবিরকারীর উপর অন্ধ বিশ্বাস করা উচিত নয়।
ফিকহী দৃষ্টিকোণ (হানাফী মাযহাব)
হানাফী ফিকহের বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
وَالرُّؤْيَا لَا يُبْنَى عَلَيْهَا حُكْمٌ شَرْعِيٌّ
"স্বপ্নের উপর কোনো শরীয়তের হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয় না।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৭০ (মাকরূহাত অধ্যায়)
অর্থাৎ, স্বপ্ন কোনো হালাল-হারাম বা ফরজ-ওয়াজিবের প্রমাণ নয়। এটি কেবল একটি ইশারা বা সুসংবাদ।
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.)-তে উল্লেখ আছে:
"স্বপ্নের তাবির করা জায়েয, তবে তা কুরআন-হাদীসের আলোকে হতে হবে এবং কোনো ব্যক্তির উপর স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না।" — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৪৫৬
ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকীমুল উম্মত থানভী রহ.)-তে উল্লেখ আছে:
"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ; তাই স্বপ্নদ্রষ্টার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং স্বপ্নকে গোপন রাখা।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮৯
সারসংক্ষেপ
আপনার স্বপ্নটি কল্যাণকর ও শুভ। এটি ইঙ্গিত করে:
- আপনি দ্বীনের ব্যাপারে সচেতন হবেন এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেবেন।
- আপনার মৃত দাদার জন্য দোয়া ও সদকা করার তাগিদ।
- অবিবাহিত হওয়ার কারণে শীঘ্রই উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের সম্ভাবনা।
- দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ লাভের দোয়া কবুল হওয়ার ইশারা।
আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন এবং আপনার দাদার কবরকে نورে ভরিয়ে দিন। আমীন।
والله أعلم بالصواب