স্বপ্নে মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ পড়া দেখলে কী হয়?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ, ওয়া কিনা আযাবান-নার।
রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ, ওয়াজ‘আলনা লিল-মুত্তাকীনা ইমামা।
এর তাবির কি জবতে পারে।
Answer
স্বপ্নের তাবির: মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ পড়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী স্বপ্নে দেখেছেন যে, তিনি একটি গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ করছেন। তিনি নিম্নলিখিত দুটি কুরআনিক দুআ পড়ছেন:
১. رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
(হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।) — সূরা আল-বাকারা: ২০১
২. رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
(হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।) — সূরা আল-ফুরকান: ৭৪
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
স্বপ্নের তাবির বা ব্যাখ্যা কোনো কাটাছেঁড়া ইলম (قطعی علم) নয়; বরং এটি একটি অনুমানভিত্তিক বিষয়। হাদিসে স্বপ্নকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللهِ، وَالرُّؤْيَا مِنْ تَحْزِينِ الشَّيْطَانِ، وَالرُّؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ» — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬৩
অর্থাৎ স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) সুসংবাদসূচক সৎ স্বপ্ন, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃখ দেওয়ার স্বপ্ন, (৩) নিজের মনের কল্পনা। অতএব স্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত হওয়া বা অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।
স্বপ্নের উপাদান বিশ্লেষণ
১. গোরস্থান দেখা
গোরস্থান স্বপ্নে দেখা সাধারণত আখিরাতের স্মরণ এবং মৃত্যুর প্রতি মনোযোগ-এর দিকে ইঙ্গিত করে। ফকিহগণ বলেন, গোরস্থান দেখা দ্বীনের প্রতি অনুরাগ, তাওবা ও আখিরাতের প্রস্তুতির আলামত হতে পারে। এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়; বরং অনেক সময় এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা যে, দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখিরাতের চিন্তা বাড়ানো উচিত।
২. মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়ানো
মৃত আত্মীয়কে স্বপ্নে দেখা এবং তার পাশে দাঁড়ানো সাধারণত পারিবারিক সম্পর্ক, বংশের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মৃতের জন্য দুআ-ইস্তিগফার করার প্রয়োজনীয়তা-র দিকে ইঙ্গিত করে। ইবনে সিরিন (রহ.)-এর স্বপ্ন-তাবিরের মূলনীতি অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা কখনো কখনো তার জন্য দুআ করার তাগিদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. দুআ পড়া — বিশেষত এই দুটি দুআ
এই দুটি দুআ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
-
প্রথম দুআ (رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً...) — এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির দুআ। এটি স্বপ্নে পড়া ইঙ্গিত করে যে, স্বপ্নদ্রষ্টার দ্বীন ও দুনিয়ার ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন এবং আখিরাতের মুক্তির চিন্তা তার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে।
-
দ্বিতীয় দুআ (رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا...) — এটি পরিবার, স্ত্রী-সন্তান ও সন্তান-সন্ততির কল্যাণ এবং মুত্তাকীদের নেতা হওয়ার দুআ। এটি ইঙ্গিত করে যে, স্বপ্নদ্রষ্টার পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তান-সন্ততির দ্বীনি শিক্ষা এবং নেক সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
সম্ভাব্য তাবির (ব্যাখ্যা)
উপরোক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, এই স্বপ্নের সম্ভাব্য তাবির নিম্নরূপ হতে পারে:
১. আখিরাতের স্মরণ ও দ্বীনি জাগরণ: স্বপ্নদ্রষ্টার অন্তরে আখিরাতের চিন্তা ও দ্বীনের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছে বা হবে। আল্লাহ তাকে দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়ার তাওফিক দান করবেন।
২. মৃত দাদার জন্য দুআ করার তাগিদ: মৃত দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুআ করা ইঙ্গিত করে যে, স্বপ্নদ্রষ্টার উচিত তাঁর মৃত দাদা ও অন্যান্য মৃত আত্মীয়দের জন্য বেশি বেশি দুআ, ইস্তিগফার ও ঈসালে সওয়াব করা। এটি একটি নেক আমলের দাওয়াত।
৩. পারিবারিক কল্যাণ ও সন্তান-সন্ততির বিষয়ে মনোযোগ: দ্বিতীয় দুআ পড়া ইঙ্গিত করে যে, স্বপ্নদ্রষ্টার পরিবার, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির কল্যাণ এবং তাদের দ্বীনি تربیتের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ তাকে নেক সন্তান দান করতে পারেন।
৪. দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য: প্রথম দুআ পড়া ইঙ্গিত করে যে, স্বপ্নদ্রষ্টার উচিত দুনিয়ার কাজকর্মের পাশাপাশি আখিরাতের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়া এবং জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করা।
৫. নেক সন্তান ও পরিবারের কল্যাণ: যদি স্বপ্নদ্রষ্টা বিবাহিত হন, তবে এই স্বপ্ন সুসংবাদ হতে পারে যে, আল্লাহ তাকে নেক সন্তান ও পরিবারের শান্তি দান করবেন। আর যদি অবিবাহিত হন, তবে এটি নেক জীবনসঙ্গী লাভের ইঙ্গিত হতে পারে।
করণীয়
১. আতঙ্কিত না হওয়া: স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া বা দুশ্চিন্তায় পড়া উচিত নয়। এটি সাধারণত কোনো অশুভ লক্ষণ নয়।
২. মৃতের জন্য দুআ করা: মৃত দাদা ও অন্যান্য মৃত আত্মীয়দের জন্য বেশি বেশি দুআ, ইস্তিগফার ও সদকা করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: «إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ» — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১
৩. নেক সন্তানের জন্য দুআ: যদি বিবাহিত হন, তবে সূরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দুআ নিয়মিত পড়া।
৪. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দুআ: সূরা আল-বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতের দুআ নিয়মিত পড়া।
৫. কবর জিয়ারত: সম্ভব হলে মৃত দাদার কবর জিয়ারত করা এবং সেখানে দাঁড়িয়ে দুআ করা — এটি সুন্নতসম্মত আমল।
৬. স্বপ্নের তাবিরের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ: স্বপ্নের প্রকৃত তাবির একমাত্র আল্লাহরই জানা। তাই আল্লাহর কাছে কল্যাণের দুআ করা এবং অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাওয়া।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে স্বপ্নের বিধান
হানাফি ফিকহে স্বপ্নের তাবির একটি ফরয বা ওয়াজিব বিষয় নয়; বরং এটি মুস্তাহাব পর্যায়ের একটি বিষয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা একটি শাস্ত্রীয় বিষয়, তবে তা কাটাছেঁড়া ইলম নয়। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন, স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া বা তার ভিত্তিতে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়; বরং স্বপ্নকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা বা সুসংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
উপসংহার
এই স্বপ্নটি সাধারণত আখিরাতের স্মরণ, মৃতের জন্য দুআর তাগিদ, পারিবারিক কল্যাণ ও নেক সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা-র দিকে ইঙ্গিত করে। এটি কোনো অশুভ বা ভয়ংকর স্বপ্ন নয়; বরং এটি একটি সতর্কবার্তা ও সুসংবাদের মিশ্রণ। স্বপ্নদ্রষ্টার উচিত মৃত দাদার জন্য দুআ করা, নিজের দ্বীনি জীবনকে মজবুত করা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা এবং আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দুআ করা।
وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ