সুস্থতার নিয়তে তাবিজ ব্যবহার করা কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
সুস্থতার নিয়তে তাবিজ ব্যবহার করা কি জায়েজ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: সুস্থতার নিয়তে তাবিজ ব্যবহার করা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, দোয়া-দরুদ বা শরীয়তসম্মত কোনো জিকির লেখা থাকে এবং তা হারাম বা শিরকি কিছু থেকে পবিত্র হয়, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ। আর যদি তাবিজে কুরআন-হাদিসের বাইরে অজ্ঞেয়/অস্পষ্ট শব্দ, শিরকি কালাম, জিন-শয়তানের নাম, বা এমন কিছু থাকে যা বোঝা যায় না — তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়, বরং হারাম।
১. কুরআন-হাদিসের দলিল
কুরআন মাজিদ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ "আমি কুরআনে এমন বিষয় নাজিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা (রোগমুক্তি) ও রহমত।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৮২)
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَّقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ — (সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৪৪)
হাদিস শরিফ:
হযরত আউফ ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ "তোমাদের ঝাড়-ফুঁক আমার কাছে পেশ করো। ঝাড়-ফুঁকে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।" — (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَعُوِّذُ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ... রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-কে এই দোয়া পড়ে ঝাড়-ফুঁক করতেন... — (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩৭১)
২. হানাফি ফিকহের বিধান
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَيَجُوزُ التَّعْوِيذُ بِالْقُرْآنِ وَأَسْمَاءِ اللَّهِ تَعَالَى... وَأَمَّا مَا لَا يُفْهَمُ فَلَا يَجُوزُ "কুরআন ও আল্লাহর নাম দ্বারা তাবিজ-তাওয়ীজ করা জায়েজ। আর যা বোঝা যায় না, তা জায়েজ নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৩)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
التَّعْوِيذُ بِالْقُرْآنِ وَالذِّكْرِ الْمَعْلُومِ جَائِزٌ، وَبِمَا لَا يُفْهَمُ حَرَامٌ — (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫৪)
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.):
"কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, দোয়া-দরুদ দ্বারা তাবিজ তৈরি করা এবং তা ব্যবহার করা জায়েজ। তবে শর্ত হলো—তাতে শিরকি কালাম, অজ্ঞেয় শব্দ বা জিন-শয়তানের নাম না থাকা।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৫৪৭)
ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকিমুল উম্মত থানভি রহ.):
"তাবিজ ব্যবহার করা জায়েজ, যদি তা কুরআন-সুন্নাহসম্মত হয়। তবে তাবিজের উপর ভরসা করা যাবে না; আসল ভরসা আল্লাহর উপর।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩০২)
৩. জায়েজ হওয়ার শর্তসমূহ
| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | ১ | তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, দোয়া-দরুদ থাকতে হবে | | ২ | অর্থ স্পষ্ট ও বোধগম্য হতে হবে | | ৩ | শিরকি কালাম, জিন-শয়তানের নাম, অজ্ঞেয় শব্দ থাকা যাবে না | | ৪ | তাবিজকে স্বয়ংক্রিয় শিফার উৎস মনে করা যাবে না; শিফা আল্লাহর হাতে | | ৫ | হারাম পদ্ধতিতে (যেমন: নাপাক জিনিসে লেখা, পায়ে-ময়লায় রাখা) তৈরি করা যাবে না | | ৬ | তাবিজের উপর ভরসা করে চিকিৎসা বন্ধ করা যাবে না |
৪. নিষিদ্ধ তাবিজের উদাহরণ
- যে তাবিজে অর্থহীন শব্দ, সংখ্যা, বা রহস্যময় চিহ্ন থাকে
- জিন-শয়তানের নাম বা শিরকি কালাম থাকে
- কুরআনের আয়াতকে অপমান করা হয় (যেমন: নাপাক জায়গায় রাখা)
- তাবিজকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা তাবিজই শিফা দেয়—এমন বিশ্বাস করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ "নিশ্চয়ই ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ ও প্রেম-মোহর শিরক।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৮৩)
ব্যাখ্যা: এখানে নিষিদ্ধ তাবিজ বলতে শিরকি তাবিজকে বোঝানো হয়েছে, যেমনটি ইমাম তহাবি (রহ.) ও ইবনে আবিদিন (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন।
৫. উপসংহার
- জায়েজ: কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, দোয়া-দরুদ দ্বারা তৈরি তাবিজ, যদি অর্থ স্পষ্ট হয় এবং শিরকমুক্ত হয়।
- নাজায়েজ/হারাম: অজ্ঞেয় শব্দ, শিরকি কালাম, জিন-শয়তানের নামযুক্ত তাবিজ।
- মনে রাখবেন: তাবিজ শুধু একটি মাধ্যম; প্রকৃত শিফা আল্লাহর হাতে। চিকিৎসা ও দোয়ার সাথে তাবিজ ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু তাবিজের উপর ভরসা করা যাবে না।