ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে কি সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব হবে?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
নাকি গুনাহ হবেনা কিন্তু সওয়াব ও হবেনা।।
Answer
ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা: সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব হবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বেতনভিত্তিক ও স্বল্প মুনাফায় একটি ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে তা সাদাকায়ে জারিয়ার মতো সওয়াব হবে কি? নাকি গুনাহ হবে না, কিন্তু সওয়াবও হবে না?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন:
ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা—যেখানে কুরআন, হাদীস, ইসলামী আকীদা ও শরীয়তের শিক্ষা দেওয়া হয়—তা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও সওয়াবের কাজ। তবে এখানে দুটি দিক আলাদা করে বুঝতে হবে:
১. সাদাকায়ে জারিয়ার মূল ভিত্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ»
"মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া: (১) সাদাকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকৃত হওয়া যায়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।"
— সহীহ মুসলিম (১৬৩১), তিরমিযী (১৩৭৬), আবু দাউদ (২৮৮০)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:
"সাদাকায়ে জারিয়া হলো এমন সাদাকা যার উপকারিতা স্থায়ীভাবে চলতে থাকে, যেমন ওয়াকফকৃত জমি, মসজিদ নির্মাণ, কূপ খনন, ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।" — মাজমূউল ফাতাওয়া (২৪/৩৬৭)
২. বেতনভিত্তিক ও মুনাফাভিত্তিক স্কুলের বিধান
এখানে বিষয়টি নির্ভর করে উদ্দেশ্য (নিয়ত) ও পদ্ধতির উপর:
(ক) যদি স্কুলটি হয়:
- ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে
- স্বল্প মুনাফা শুধু পরিচালনা ব্যয় ও টিকিয়ে রাখার জন্য
- শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ন্যায্য বেতন নেওয়া হয়
- শিক্ষার মান ও দ্বীনি পরিবেশ বজায় থাকে
- শরিয়াহ এর সমস্ত নীতি আদর্শ মেনে যদি স্কুল পরিচালনা করা হয়, শরিয়াহ এর খেলাফ যদি কোন কাজ সেখানে সংঘটিত না হয়,
তাহলে এটি সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ, কারণ:
- এখানে ইলম শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে → যা হাদীসে "عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ" (উপকারী ইলম)-এর অন্তর্ভুক্ত
- শিক্ষার্থীরা দ্বীন শিখে আমল করলে, তা শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতার জন্যও সওয়াবের কারণ হবে
শাইখ ইবনু উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, মসজিদ নির্মাণ করে, বা কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করে—এগুলো সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যার সওয়াব কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।" — শারহুল মুমতি' (১১/১৩০)
(খ) তবে সতর্কতা:
যদি স্কুলটি ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে হয়, যেখানে:
- ইসলামী শিক্ষা মুখ্য নয়, বরং মুনাফাই মূল লক্ষ্য
- শিক্ষার মান বা দ্বীনি পরিবেশ ক্ষুণ্ণ হয়
- বেতন অতিরিক্ত হয়, যা অভাবী শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়, শরিয়াহ এর খেলাফ যদি কাজ সেখানে সংঘটিত হয়,
তাহলে সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব হবে না, যদিও এটি হারাম হবে না।
৩. মূল নীতি: নিয়ত ও উদ্দেশ্য
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন:
"আমলের মূল্য নির্ভর করে অন্তরের নিয়ত ও উদ্দেশ্যের উপর।" — মাজমূউল ফাতাওয়া (১০/৪৫)
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন:
"নিয়ত হলো আমলের روح। নিয়ত ছাড়া আমল মৃতদেহের মতো।" — আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব (পৃ. ২২)
৪. সিদ্ধান্ত
| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে, স্বল্প মুনাফায়, ন্যায্য বেতনে | শরিয়াহ এর সমস্ত নীতি আদর্শ মেনে যদি স্কুল পরিচালনা করা হয়, শরিয়াহ এর খেলাফ যদি কোন কাজ সেখানে সংঘটিত না হয়,সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব হবে ইনশাআল্লাহ | | শুধু ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে, দ্বীনি শিক্ষা গৌণ | সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব হবে না, তবে গুনাহও হবে না | | ইসলামী শিক্ষার নামে প্রতারণা বা হারাম শিক্ষা | গুনাহ হবে |
৫. পরামর্শ
১. নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, দ্বীন বিস্তারের জন্য। ২. স্বল্প মুনাফা রাখুন—যাতে অভাবী শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা পায়। ৩. বিনামূল্যে বা যাকাত/সাদাকার ফান্ডে কিছু আসন রাখুন। ৪. ওয়াকফের ব্যবস্থা করুন—যদি সম্ভব হয়, স্কুলের জমি বা ভবন ওয়াকফ করে দিন, তাহলে সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব আরও নিশ্চিত হবে। ৫. শিক্ষার মান ও দ্বীনি পরিবেশ বজায় রাখুন।
উপসংহার
হ্যাঁ, ইসলামী স্কুল প্রতিষ্ঠা—যদি তা দ্বীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে হয়, স্বল্প মুনাফায় পরিচালিত হয়, এবং শিক্ষার মান বজায় থাকে,শরিয়াহ এর সমস্ত নীতি আদর্শ মেনে যদি স্কুল পরিচালনা করা হয়, শরিয়াহ এর খেলাফ যদি কোন কাজ সেখানে সংঘটিত না হয়,—তাহলে তা সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। এর সওয়াব কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে, যতদিন শিক্ষার্থীরা ইলম থেকে উপকৃত হবে এবং আমল করবে।
আর যদি শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে হয়, দ্বীনি শিক্ষা গৌণ হয়—তাহলে গুনাহ হবে না, কিন্তু সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াবও পাওয়া যাবে না।
আল্লাহ আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন এবং দ্বীনের খিদমতে কবুল করুন। আমীন।
রেফারেন্স
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৭৬
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৮০
- মাজমূউল ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ (২৪/৩৬৭)
- শারহুল মুমতি' ইবনু উসাইমীন (১১/১৩০)
- আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব, ইবনুল কাইয়্যিম (পৃ. ২২)