ত্বক ফর্সা করে এমন ক্রিমের ব্যাবহার প্রসংগে
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
ত্বক ফর্সা করার ক্রিম ব্যবহারের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি হলো—ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করা, যা ত্বকের দাগ-ছোপ দূর করে ত্বককে উজ্জ্বল করে; নিজ মাহরামের জন্য পরিপাটি থাকার শর্তে তা করা যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মূলত জায়েয, তবে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে। যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূর্ণ হয়, তাহলে মাহরামের জন্য সাজ-সজ্জা ও পরিপাটি থাকার উদ্দেশ্যে ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করা জায়েয হবে:
- ক্রিমটি হারাম বা নাজিস (অপবিত্র) উপাদান দ্বারা তৈরি না হওয়া।
- তাতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক না থাকা, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
- নিজের স্বামী বা মাহরামদের সামনে সাজানোর নিয়ত থাকা; গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য না হওয়া।
- প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস না করা বা অসম্ভব প্রতিশ্রুতিতে ধোঁকা না খাওয়া।
- নিজের সৌন্দর্যে অহংকার (কিবর) বা অন্য নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্বের ভাব না আসা।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. মূলনীতি: সৌন্দর্য গ্রহণ করা ইসলামে স্বীকৃত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ "বলুন, আল্লাহর সৌন্দর্য যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রিযিককে কে হারাম করেছে?" (সূরা আল-আরাফ: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ৯১)
২. স্বামী ও মাহরামের জন্য সাজ-সজ্জার অনুমতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ تَطَيَّبَتْ ثُمَّ خَرَجَتْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَهِيَ زَانِيَةٌ "যে নারী সুগন্ধি লাগিয়ে মসজিদে বের হয়, সে ব্যভিচারিণী।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪১৭৩)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়—সাজ-সজ্জা নিষিদ্ধ নয়, বরং গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শন নিষিদ্ধ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"নারীদের জন্য স্বামীর সামনে সাজ-সজ্জা করা মুস্তাহাব, কারণ তা স্বামীর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৭)
৩. ত্বকের রঙ পরিবর্তনের বিধান
ইসলামে স্থায়ীভাবে ত্বকের রঙ পরিবর্তন করা (যেমন ট্যাটু, স্থায়ী ডাই) নিষিদ্ধ। কিন্তু অস্থায়ী সৌন্দর্যবর্ধক ক্রিম, যা ধীরে ধীরে দাগ দূর করে—তা ভিন্ন। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো বস্তু ত্বকের উপর স্থায়ীভাবে রঙ পরিবর্তন করে এবং তা ওযু-গোসলের পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ। আর যদি তা পানি পৌঁছাতে বাধা না দেয়, তাহলে তা জায়েয।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/২২৭)
৪. ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ার বক্তব্য
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"সৌন্দর্যবর্ধক ক্রিম ব্যবহার করা জায়েয, যদি তা নাজিস উপাদান দ্বারা তৈরি না হয় এবং গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য না হয়।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ৩/৪৫৬)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"নারীদের জন্য স্বামীর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাজ-সজ্জা করা সওয়াবের কাজ, তবে তা যেন গায়রে মাহরামের সামনে না হয়।" (ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/২৫৬)
৫. সতর্কতা: ক্ষতিকর ও নাজিস উপাদান
যদি ক্রিমে অ্যালকোহল, শূকরের চর্বি, বা হারাম প্রাণীর উপাদান থাকে, তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েয নয়। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
শর্তাবলির সারসংক্ষেপ
| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | ১ | ক্রিমে হারাম/নাজিস উপাদান না থাকা | | ২ | স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হওয়া | | ৩ | শুধু স্বামী/মাহরামের সামনে সাজানোর নিয়ত | | ৪ | গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য না থাকা | | ৫ | অহংকার বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস না করা | | ৬ | ওযু-গোসলের পানি ত্বকে পৌঁছাতে বাধা না দেওয়া |
উপসংহার
প্রশ্নে উল্লিখিত শর্ত (নিজ মাহরামের জন্য পরিপাটি থাকা) অনুযায়ী—ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করা জায়েয, যদি তা হারাম উপাদানমুক্ত, ক্ষতিকর নয়, এবং শুধু স্বামী/মাহরামের সামনে সাজানোর উদ্দেশ্যে হয়। তবে গায়রে মাহরামের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।