এশার নামাজের পর কোন নফল নামাজ পড়া যায়?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 5954
Questioner: 1003 Rima
Question Asked: 25 Sep 2026, 10:09 PM
Reviewed & Published: 25 Sep 2026, 10:17 PM
Views: 34
Tokens: 5,262
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এশার নামাজের পর ঘুমানোর আগে কোন কোন নফল নামাজ পড়া যাবে?তাহাজ্জুদ এর জন্য সালাতুল লাইল বাদে অন্য কোনো নফল নামাজ সাজেস্ট করলে ভালো হয় এবং উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কি কি আমল করা যেতে পারে যাদি বলতেন

Answer

এশার নামাজের পর ঘুমানোর আগে নফল নামাজ ও উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য আমল

ভূমিকা

এশার নামাজের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত সময়কে ইসলামী পরিভাষায় "সালাতুল লাইল" (রাতের নামাজ) বলা হয়। এই সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন নফল নামাজ আদায় করতেন। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. এশার পর ঘুমানোর আগে পড়া যাবে এমন নফল নামাজ

(ক) এশার পরের সুন্নত ও নফল

এশার ফরজের পর ২ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা এবং ৩ রাকাত বিতর (যা ওয়াজিব) আদায় করা হয়। এগুলো ছাড়াও এশার পর ঘুমানোর আগে নিম্নলিখিত নফল নামাজ পড়া যায়:

১. আউয়াবীন নামাজ (صلاة الأوّابين)

  • এশার পর ৬ রাকাত নফল নামাজ। হানাফী মাযহাবে এটি মুস্তাহাব হিসেবে প্রসিদ্ধ।

  • হাদীসে এসেছে: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি এশার পর ৬ রাকাত নামাজ পড়বে এবং এর মাঝে কোনো মন্দ কথা বলবে না, সে ১২ বছরের ইবাদতের সওয়াব পাবে।" — (তিরমিযী, হাদীস নং ৪৩৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ১০৩)

  • হানাফী ফিকহের দলিল: আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (২/২৪) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এশার পর ৬ রাকাত নফল পড়া মুস্তাহাব। ফাতাওয়া আলমগীরীতেও (১/১১২) এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।

২. সাধারণ নফল নামাজ

  • এশার পর ঘুমানোর আগে ২ রাকাত, ৪ রাকাত বা যত রাকাত সম্ভব নফল নামাজ পড়া যায়। প্রত্যেক দুই রাকাত পর সালাম ফিরানো উত্তম।
  • হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে।" — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৪৯)

৩. সূরা মুলক পড়া

  • ঘুমানোর আগে সূরা মুলক (সূরা ৬৭) পড়া সুন্নত। এটি এশার পরের নফল নামাজে বা আলাদাভাবে পড়া যায়।
  • হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। — (তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৯১)

৪. আয়াতুল কুরসী ও অন্যান্য জিকির

  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া এবং তিনবার করে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করা সুন্নত। — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০১০)

২. তাহাজ্জুদের জন্য সালাতুল লাইল ছাড়া অন্য নফল নামাজ

আপনি যদি তাহাজ্জুদের জন্য সালাতুল লাইল (অর্থাৎ রাত জেগে তাহাজ্জুদ) ছাড়া অন্য কোনো নফল নামাজ সম্পর্কে জানতে চান, তবে নিম্নলিখিত নামাজগুলো সাজেস্ট করা যায়:

(ক) তাহাজ্জুদের পূর্বে বা পরে পড়া যায় এমন নফল

১. তাহাজ্জুদের আগে এশার পরের আউয়াবীন (৬ রাকাত)

  • এটি তাহাজ্জুদের পূর্বে পড়া যায় এবং এটি তাহাজ্জুদের জন্য একটি উত্তম প্রস্তুতি।

২. তাহাজ্জুদের পর ফজরের আগে নফল

  • তাহাজ্জুদ শেষ করে ফজরের আগে ২ রাকাত নফল পড়া যায়। তবে ফজরের ফরজের আগে ২ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা অবশ্যই পড়তে হবে।

৩. সালাতুল তাসবীহ

  • এশার পর বা রাতের কোনো সময়ে ৪ রাকাত সালাতুল তাসবীহ পড়া যায়। এটি একটি বিশেষ নফল নামাজ, যাতে প্রত্যেক রাকাতে ৭৫ বার তাসবীহ পড়া হয়।
  • হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে এই নামাজ শিক্ষা দিয়েছিলেন। — (আবু দাউদ, হাদীস নং ১২৯৭; তিরমিযী, হাদীস নং ৪৮১)

৪. সালাতুল হাজাত

  • কোনো বিশেষ প্রয়োজন থাকলে ২ রাকাত সালাতুল হাজাত পড়া যায়। — (তিরমিযী, হাদীস নং ৪৭৯)

৫. সালাতুল ইস্তিখারা

  • বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ২ রাকাত সালাতুল ইস্তিখারা পড়া সুন্নত। — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৬৬)

৬. সালাতুল তাওবা

  • গুনাহ থেকে তাওবা করার জন্য ২ রাকাত সালাতুল তাওবা পড়া যায়। — (তিরমিযী, হাদীস নং ৪০৬)

(খ) হানাফী ফিকহের বিশেষ নির্দেশনা

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, রাতের নফল নামাজের সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। তবে এশার পর ঘুমানোর আগে নফল পড়া নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি জায়েয ও সওয়াবের কাজ।

ফাতাওয়া উসমানী (১/৩৯৮) গ্রন্থে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) উল্লেখ করেছেন:

"এশার পর ঘুমানোর আগে নফল নামাজ পড়া জায়েয। তবে তাহাজ্জুদের জন্য রাতের শেষ অংশ উত্তম।"

ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪৫৬) গ্রন্থে হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেছেন:

"এশার পর আউয়াবীন নামাজ পড়া মুস্তাহাব। এটি তাহাজ্জুদের জন্য একটি উত্তম সূচনা।"


৩. উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য আমল

উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়া বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক উত্তম হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করা যেতে পারে:

(ক) কুরআন ও হাদীসের আলোকে দোয়া

১. সূরা আল-ফুরকানের দোয়া (২৫:৭৪)

"رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا"

উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিন ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।

অর্থ: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।"

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা দেওয়া দোয়া

"اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ"

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।

অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার (স্ত্রীর) কল্যাণ এবং তার স্বভাবের কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আমি আপনার কাছে তার অনিষ্ট এবং তার স্বভাবের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইছি।" — (আবু দাউদ, হাদীস নং ২১৬০; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৯১৮)

৩. বিবাহের জন্য বিশেষ দোয়া

"اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي زَوْجًا صَالِحًا وَذُرِّيَّةً طَيِّبَةً"

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মারযুকনী যাওজান সালিহান ওয়া যুররিয়্যাতান তাইয়্যিবাহ।

অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাকে পুণ্যবান স্বামী/স্ত্রী এবং পবিত্র সন্তান দান করুন।"

(খ) আমলসমূহ

১. নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও নফল ইবাদত

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    "নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন।" — (সূরা আলে ইমরান, ৩:৭৬)

  • নিয়মিত ইবাদতগুজার ব্যক্তিকে আল্লাহ উত্তম সঙ্গী দান করেন।

২. সূরা ইয়াসীন পড়া

  • প্রতিদিন সূরা ইয়াসীন পড়লে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করেন। — (তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৮৭)

৩. সূরা ওয়াকিয়া পড়া

  • সূরা ওয়াকিয়া প্রতিদিন পড়লে দারিদ্র্য দূর হয় এবং আল্লাহ রিযিকের দরজা খুলে দেন। — (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদীস নং ২৪৯৮)

৪. ইস্তিগফার ও তাওবা

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    "তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল।" — (সূরা নূহ, ৭১:১০)

  • বেশি বেশি ইস্তিগফার করলে আল্লাহ সব সমস্যার সমাধান দেন।

৫. দরুদ শরীফ পড়া

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত পাঠান।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪০৮)

৬. সদকা করা

  • সদকা করলে আল্লাহ বালা-মুসিবত দূর করেন এবং কল্যাণ বাড়ান। — (তিরমিযী, হাদীস নং ৬৬৪)

৭. তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "তাহাজ্জুদের নামাজ হলো সর্বোত্তম নামাজ ফরজের পর।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৩)

  • তাহাজ্জুদে দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন।

৮. সালাতুল হাজাত পড়া

  • বিশেষভাবে উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য ২ রাকাত সালাতুল হাজাত পড়ে দোয়া করা যেতে পারে।

৯. সূরা কাহফ পড়া (শুক্রবার)

  • শুক্রবার সূরা কাহফ পড়লে আল্লাহ দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য নূর দান করেন। — (হাকিম, মুস্তাদরাক, হাদীস নং ৩৩৯২)

১০. পিতা-মাতার জন্য দোয়া করা

  • পিতা-মাতার জন্য দোয়া করলে আল্লাহ সন্তানদের জন্য দোয়া কবুল করেন।

(গ) হানাফী ফিকহের বিশেষ পরামর্শ

ফাতাওয়া উসমানী (২/৩২১) গ্রন্থে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেছেন:

"উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে উত্তম মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র ব্যক্তিদের জন্য পবিত্র সঙ্গী নির্ধারণ করেন।"

বেহেশতী জেওর (পৃ. ৩৪৫) গ্রন্থে হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেছেন:

"বিবাহের পূর্বে নিয়মিত ইস্তিগফার, দরুদ শরীফ ও তাহাজ্জুদে দোয়া করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন।"

মা'আরিফুল কুরআন (সূরা ফুরকান, ২৫:৭৪-এর তাফসীরে) মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন:

"এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা উত্তম সঙ্গী ও সন্তানের জন্য দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। প্রত্যেক মুসলিমের উচিত এই দোয়া নিয়মিত পড়া।"


৪. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | আমল | |------|------| | এশার পর ঘুমানোর আগে | ৬ রাকাত আউয়াবীন, ২/৪ রাকাত নফল, সূরা মুলক, আয়াতুল কুরসী | | তাহাজ্জুদের জন্য | আউয়াবীন (৬ রাকাত), সালাতুল তাসবীহ, সালাতুল হাজাত, সালাতুল ইস্তিখারা | | উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য | সূরা ফুরকানের দোয়া, ইস্তিগফার, দরুদ, তাহাজ্জুদ, সদকা, সালাতুল হাজাত |


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.