বন্ধকের বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমরা একটা সি এন জি ৪ মাস মেয়াদে ৫০০০০ টাকা চুক্তিতে বন্ধক নিতে চাচ্ছি।সি এন জিটি আমাদের গ্যারেজেই রাখবে ৪ মাস।সি এন জি ওয়ালা দৈনিক ১৫০ টাকা গ্যারেজের ভাড়া দিবে। ৪ মাসের মধ্যে ৫০০০০ টাকা সিএন জি ওয়ালা দিতে না পারলে চুক্তি মোতাবেক সিএন জি আমরা তার কাছ কিনে নিব।
উল্লেখ্য সিএন জি আমরা বন্ধক রাখলে ১৫০ টাকা দৈনিক আসবে এটা আমাদের উপকার।
এখন প্রশ্ন হলো এইভাবে বন্ধক চুক্তি করা কি জায়েয হবে।।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একটি সিএনজি ৪ মাসের মেয়াদে ৫০,০০০ টাকার বিনিময়ে বন্ধক (রাহন) রাখা, যেখানে সিএনজি বন্ধকদাতার গ্যারেজে থাকবে এবং বন্ধকগ্রহীতা দৈনিক ১৫০ টাকা ভাড়া হিসেবে পাবে। ৪ মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না হলে চুক্তি অনুযায়ী সিএনজি কিনে নেবে। এই ধরনের চুক্তি শরীয়তসম্মত কিনা?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে বন্ধক চুক্তি করা জায়েয নয়। কারণ এতে একই চুক্তিতে বন্ধক (রাহন) এবং ভাড়া (ইজারা) — এই দুই ধরনের চুক্তি একত্রিত করা হয়েছে, যা ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ। এছাড়া বন্ধকি সম্পদ থেকে ভাড়া বা মুনাফা গ্রহণ করা সুদ (রিবা) হিসেবে পরিগণিত হয়। তবে বিকল্প বৈধ পদ্ধতি রয়েছে, যা নিচে উল্লেখ করা হলো।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. বন্ধক (রাহন) কী?
বন্ধক বা রাহন হলো ঋণের বিনিময়ে কোনো সম্পদ জামানত হিসেবে রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা। বন্ধকি সম্পদ আমানত (ওয়াদিয়া) হিসেবে থাকে; বন্ধকগ্রহীতার জন্য তা ব্যবহার করা বা তা থেকে লাভবান হওয়া জায়েয নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن كُنتُمْ عَلَىٰ سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ ۖ فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ “আর যদি তোমরা সফরে থাকো এবং লেখক না পাও, তবে বন্ধকি সম্পদ হস্তগত থাকবে। অতঃপর যদি একে অন্যের প্রতি আস্থা থাকে, তবে যাকে আমানত দেওয়া হয়েছে সে যেন আমানত আদায় করে এবং তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)
২. বন্ধকি সম্পদ থেকে ভাড়া বা মুনাফা নেওয়া সুদ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا “প্রত্যেক এমন ঋণ, যা লাভ টেনে আনে, তা সুদ।” (শরহু মাআনিল আছার, ইমাম তাহাবী, হাদিস নং ৫৯৫৯; আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ূ, অধ্যায়: রিবা)
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো—বন্ধকি সম্পদ থেকে বন্ধকগ্রহীতার কোনো প্রকার উপকার নেওয়া জায়েয নয়। যদি নেয়, তবে তা সুদ হবে।
৩. এক চুক্তিতে দুই চুক্তি (বন্ধক + ভাড়া):
ফকীহগণ বলেন:
لَا يَجُوزُ الْجَمْعُ بَيْنَ عَقْدَيْنِ فِي عَقْدٍ وَاحِدٍ “এক চুক্তিতে দুই চুক্তি একত্রিত করা জায়েয নয়।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৭০; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৫)
প্রশ্নে বর্ণিত চুক্তিতে বন্ধক (রাহন) এবং ভাড়া (ইজারা) — এই দুইটি পৃথক চুক্তি একসাথে করা হয়েছে। এটি শরীয়তসম্মত নয়।
৪. ৪ মাস পর না দিলে কিনে নেওয়ার শর্ত:
চুক্তিতে বলা হয়েছে—৪ মাসের মধ্যে টাকা না দিলে সিএনজি কিনে নেবে। এটি মূলত একটি শর্তযুক্ত বিক্রয় (বাই‘ মুআজ্জাল) বা বন্ধকি সম্পদ বিক্রয়ের শর্ত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বন্ধকি সম্পদ বন্ধকগ্রহীতার কাছে বিক্রয় করা তখনই বৈধ হবে যখন বন্ধকদাতা স্বাধীনভাবে বিক্রয় করবে, কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া। পূর্বশর্তযুক্ত বিক্রয় ফাসিদ (বাতিল)।
(আল-হিদায়া, কিতাবুর রাহন; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৭২)
৫. ভাড়া থেকে প্রাপ্ত ১৫০ টাকা দৈনিক:
বন্ধকি সম্পদ বন্ধকগ্রহীতার কাছে আমানত হিসেবে থাকে। সে যদি তা ব্যবহার করে বা ভাড়া দিয়ে আয় করে, তবে তা সুদ হবে। হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: الرَّهْنُ مَرْكُوبٌ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا، وَلَبَنُ الدَّرِّ يُشْرَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا “বন্ধকি পশুর পিঠে আরোহণ করা যাবে তার খরচের বিনিময়ে, এবং বন্ধকি দুধপান করা যাবে তার খরচের বিনিময়ে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৫১১)
এই হাদিসে বন্ধকগ্রহীতাকে শুধু পশুর খরচের সমপরিমাণ সুবিধা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভাড়া বা মুনাফা নেওয়ার অনুমতি নেই। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এই হাদিসটি মানসুখ (রহিত) বা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বন্ধকি সম্পদ থেকে আয় করা সুদ।
বিকল্প বৈধ পদ্ধতি:
১. শুধু বন্ধক চুক্তি করুন:
সিএনজি বন্ধক রাখুন, কিন্তু কোনো ভাড়া বা মুনাফা নেবেন না। সিএনজি বন্ধকদাতার গ্যারেজে থাকবে, তার দেখাশোনায় থাকবে। আপনি শুধু ঋণ হিসেবে ৫০,০০০ টাকা দেবেন এবং ৪ মাস পর তা ফেরত নেবেন। যদি সে না দেয়, তবে শরীয়তসম্মতভাবে আদালতের মাধ্যমে বা পারস্পরিক সম্মতিতে বন্ধকি সম্পদ বিক্রয় করে ঋণ আদায় করবেন।
২. ইজারা চুক্তি আলাদা করুন:
যদি আপনি সিএনজি ভাড়া নিতে চান, তবে বন্ধক চুক্তির সাথে মিশিয়ে নয়, বরং একটি পৃথক ইজারা চুক্তি করুন। যেমন: আপনি সিএনজি মালিককে ৫০,০০০ টাকা ঋণ দিলেন (বন্ধক ছাড়া), এবং আলাদাভাবে তার কাছ থেকে সিএনজি ভাড়া নিলেন দৈনিক ১৫০ টাকায়। তবে খেয়াল রাখবেন, ঋণ ও ভাড়া যেন শর্তযুক্তভাবে একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত না হয়।
৩. মুরাবাহা বা বাই‘ মুআজ্জাল:
যদি আপনি সিএনজি কিনতে চান, তবে সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করুন। যেমন: আপনি সিএনজি ৫০,০০০ টাকায় কিনে নিলেন, এবং মূল্য পরিশোধের জন্য ৪ মাসের মেয়াদ দিলেন। এটি বাই‘ মুআজ্জাল হিসেবে বৈধ, যদি মূল্য নির্ধারিত হয় এবং উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
সতর্কতা:
বর্তমানে অনেক মানুষ বন্ধকের নামে সুদি লেনদেন করে থাকে। এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
সুতরাং, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে বন্ধক চুক্তি করা জায়েয নয়। বৈধ বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করুন।
والله أعلم بالصواب