পারফিউম দিলে গুনাহ হবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আপনার প্রশ্নের সারসংক্ষেপ এই যে, আপনি আপনার চাচাতো বোনকে একটি পারফিউম দিয়েছিলেন, যা আগে অন্য এক আত্মীয় আপনাকে উপহার দিয়েছিল। আপনি নিজে পারফিউম ব্যবহার না করার কারণে সেটি রেখে দিয়েছিলেন। চাচাতো বোন বলার পর আপনি তাকে সেটি দিয়ে দেন। এখন আপনার মনে হচ্ছে—সে যদি প্রতিদিন পারফিউম ব্যবহার করে, তবে তার গুনাহের ভাগ আপনি পাবেন কি? অথবা সমস্ত গুনাহ আপনার উপর আসবে কি? কারণ আপনি তাকে দেওয়ার সময় এমন নিয়ত করেননি যে সে গুনাহ করবে; বরং আপনি ভেবেছিলেন আপনি ব্যবহার করেন না, তাই তাকে দিয়ে দিলেন। এখন তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নেওয়াও লজ্জাজনক মনে হচ্ছে।
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: পারফিউম ব্যবহার করা নিজে থেকে হারাম নয়। বরং পুরুষদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত ও প্রশংসনীয়। নারীদের ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরে বা মাহরাম পুরুষদের সামনে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ; তবে বেগানা পুরুষের সামনে বা বাইরে গিয়ে এমনভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করা, যাতে পরপুরুষের দৃষ্টি ও কামনা আকর্ষিত হয়, তা নিষিদ্ধ। সুতরাং আপনার চাচাতো বোন যদি শরীয়তসম্মতভাবে পারফিউম ব্যবহার করে, তাহলে এতে কোনো গুনাহই নেই; বরং তা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আর যদি সে শরীয়তবিরোধীভাবে ব্যবহার করে, তাহলে সেই গুনাহ তার নিজেরই হবে।
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর: আপনি তাকে পারফিউমটি হাদিয়া বা উপহার হিসেবে দিয়েছেন। হাদিয়া দেওয়ার পর তা তার মালিকানায় চলে যায়। এখন সে নিজের মালিকানাধীন জিনিস যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারে। আপনি তাকে গুনাহের নিয়তে দেননি; বরং আপনি ভেবেছিলেন আপনি ব্যবহার করেন না, তাই তাকে দিয়ে দিলেন। ইসলামী শরীয়তে কেউ যদি কোনো জিনিস হালাল নিয়তে বা নিষ্কলুষ নিয়তে কাউকে দান করে, আর গ্রহীতা তা দিয়ে গুনাহ করে, তাহলে দাতা তার গুনাহের ভাগী হবে না। কারণ গুনাহের মূল দায়িত্ব সেই ব্যক্তির উপরই বর্তায়, যে নিজে তা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা আনআম: ১৬৪; সূরা বনী ইসরাইল: ১৫)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ “সে যা ভালো কাজ করে, তা তারই জন্য; আর যা মন্দ কাজ করে, তাও তারই উপর বর্তাবে।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ “যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিশা দেয়, সে সেই কাজ সম্পাদনকারীর সমান প্রতিদান পাবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৯৩)
আর মন্দ কাজের ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো, যে নিজে মন্দ কাজ করে, তার গুনাহ তার নিজেরই। কেউ কাউকে মন্দ কাজের আদেশ বা উৎসাহ না দিলে, শুধু কোনো বস্তু দান করার কারণে দাতা গুনাহের ভাগী হয় না।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, হাদিয়া বা দান সম্পূর্ণ হওয়ার পর তা গ্রহীতার মালিকানায় চলে যায়; দাতার আর তাতে কোনো অধিকার থাকে না। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৬৮৮-৬৯০) সুতরাং আপনি তাকে পারফিউমটি দেওয়ার মাধ্যমে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সেটি ফিরিয়ে চাওয়া বা নিয়ে আসা শরীয়তসম্মতভাবে আপনার জন্য জরুরি নয়; বরং তা লজ্জাজনক ও সম্পর্ক নষ্টকারী হতে পারে।
আপনার করণীয়:
১. আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন—আপনার কোনো গুনাহ হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাকে গুনাহের কাজে সাহায্য বা উৎসাহ দেন।
২. আপনি তাকে পারফিউমটি হাদিয়া হিসেবে দিয়েছেন; এখন তা তার সম্পত্তি। আপনি তা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
৩. যদি আপনার চাচাতো বোন শরীয়তবিরোধীভাবে (যেমন বেগানা পুরুষের সামনে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে) পারফিউম ব্যবহার করে, তাহলে সেই গুনাহ তার নিজের। আপনি তাকে উপদেশ দিতে পারেন, তবে জোর করা আপনার দায়িত্ব নয়।
৪. ভবিষ্যতে এমন কিছু কাউকে দান করার আগে নিয়ত পরিষ্কার রাখবেন এবং যদি জানেন যে সে হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে তাকে তা দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
৫. আপনার মনে যে সন্দেহ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং নিজের নিয়তকে পরিষ্কার রাখুন।
সংক্ষেপে: আপনার কোনো গুনাহ হবে না। আপনার চাচাতো বোনের গুনাহের ভাগও আপনি পাবেন না, কারণ আপনি তাকে গুনাহের নিয়তে দেননি; বরং হালাল নিয়তে হাদিয়া দিয়েছেন। এখন পারফিউমটি তার মালিকানাধীন; আপনি তা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।