ইস্তেহাজা অবস্থায় কুরআন পড়া ও স্পর্শ করা জায়েজ কি না ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
ইস্তেহাজা অবস্থায় কুরআন পড়া/স্পর্শ করার বিধান
প্রশ্ন
ইস্তেহাজা (অর্থাৎ মাসিকের নির্ধারিত দিনের বাইরে রক্ত আসা) অবস্থায় কুরআন পড়া বা কুরআন স্পর্শ করা যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইস্তেহাজার অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা এবং কুরআন স্পর্শ করা জায়েজ। তবে কুরআন স্পর্শ করার সময় হাত-পা ধুয়ে নেওয়া বা অন্তত হাত ধুয়ে নেওয়া উত্তম। এছাড়া কুরআন পড়ার সময় মুখে কাপড়/রুমাল রাখা বা সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো, যাতে রক্তের কোনো চিহ্ন কুরআনে না লাগে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ইস্তেহাজা কী?
হায়েজ (মাসিক) এর সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন ৩ রাত এবং সর্বোচ্চ ১০ দিন ১০ রাত। এর বাইরে যে রক্ত আসে তাকে ইস্তেহাজা বলা হয়। ইস্তেহাজা হায়েজ নয়, বরং এটি একটি রোগ বা অসুস্থতার রক্ত। তাই ইস্তেহাজার অবস্থায় নারী পবিত্র (তাহির) হিসেবে গণ্য হন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফাতিমা বিনতে আবু হুবাইশ রা.-কে বলেছিলেন: "إِنَّمَا ذَلِكِ عِرْقٌ وَلَيْسَتْ بِالْحَيْضَةِ" "এটি তো একটি শিরার রক্ত, এটা হায়েজ নয়।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৩
২. ইস্তেহাজায় কুরআন পড়া ও স্পর্শ করার বিধান
হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় নারীর জন্য কুরআন পড়া ও স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু ইস্তেহাজা হায়েজের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই ইস্তেহাজায়:
- কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ — এমনকি সিজদার আয়াতও পড়া যাবে।
- কুরআন স্পর্শ করা জায়েজ — তবে উত্তম হলো ওযু করা বা হাত ধুয়ে নেওয়া।
- নামাজ পড়া জায়েজ — বরং ইস্তেহাজার রক্ত আসলেও নামাজ ছাড়া যাবে না; প্রত্যেক নামাজের জন্য ওযু করে নামাজ আদায় করতে হবে।
- রোজা রাখা জায়েজ।
- মসজিদে প্রবেশ করা জায়েজ।
- তাওয়াফ করা জায়েজ।
৩. দলিল ও ফতোয়া
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ইস্তেহাজা হায়েজের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়; ইস্তেহাজাওয়ালী নারী পবিত্র ব্যক্তির মতোই ইবাদত করতে পারবেন।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"والمستحاضة كالطاهر في جميع الأحكام إلا في وجوب الوضوء لكل صلاة" "ইস্তেহাজাওয়ালী নারী সব বিধানে পবিত্র ব্যক্তির মতো, শুধু প্রত্যেক নামাজের জন্য ওযু করা ওয়াজিব হওয়া ছাড়া।"
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি) — উভয় কিতাবেই উল্লেখ আছে যে, ইস্তেহাজায় কুরআন তিলাওয়াত ও স্পর্শ করা জায়েজ।
৪. সতর্কতা
যদিও ইস্তেহাজায় কুরআন পড়া জায়েজ, তবে নিম্নলিখিত বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম:
- কুরআন স্পর্শ করার আগে হাত ধুয়ে নেওয়া — যাতে রক্তের চিহ্ন কুরআনে না লাগে।
- মুখে কাপড়/রুমাল রাখা — তিলাওয়াতের সময় রক্তের ছিটা কুরআনে না পড়ার জন্য।
- কুরআনকে উঁচু স্থানে রাখা — যাতে রক্তের সংস্পর্শে না আসে।
- ওযু করে নেওয়া — সম্ভব হলে ওযু করে কুরআন স্পর্শ করা উত্তম।
৫. হায়েজ ও ইস্তেহাজার পার্থক্য
| বিষয় | হায়েজ | ইস্তেহাজা | |------|--------|-----------| | কুরআন তিলাওয়াত | নিষিদ্ধ | জায়েজ | | কুরআন স্পর্শ | নিষিদ্ধ | জায়েজ | | নামাজ | নিষিদ্ধ | ফরজ | | রোজা | নিষিদ্ধ | জায়েজ | | মসজিদে প্রবেশ | নিষিদ্ধ | জায়েজ | | তাওয়াফ | নিষিদ্ধ | জায়েজ | | সহবাস | নিষিদ্ধ | জায়েজ (তবে ওযু করে) |
উপসংহার
ইস্তেহাজা অবস্থায় কুরআন পড়া ও স্পর্শ করা সম্পূর্ণ জায়েজ। ইস্তেহাজা হায়েজ নয়, বরং একটি রোগ। তাই ইস্তেহাজাওয়ালী নারী পবিত্র ব্যক্তির মতোই কুরআন তিলাওয়াত ও স্পর্শ করতে পারবেন। তবে কুরআনের আদব রক্ষার জন্য হাত ধুয়ে নেওয়া, মুখে কাপড় রাখা এবং কুরআনকে রক্ত থেকে বাঁচানো উত্তম।
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৮
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৩
- আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, কিতাবুত তাহারাত
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১
- ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, মুফতি আশরাফ আলী থানভি
- বেহেশতী জেওর, মুফতি আশরাফ আলী থানভি