বান্ধবীকে উপহার দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, পরে তাকে না দিয়ে অন্য কোথায় দান করলে সওয়াব কে পাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: বান্ধবীকে উপহার দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, পরে তাকে না দিয়ে তার কথা ভেবে অন্য কোথাও দান করলে সওয়াব কে পাবে?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد:
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনি যে টাকা বান্ধবীকে উপহার দেওয়ার নিয়ত করেছিলেন, তা তাকে না দিয়ে অন্য কোথাও দান করলে সওয়াব শুধু আপনি পাবেন, আপনার বান্ধবী পাবেন না। কারণ দান-সদকার সওয়াব ঐ ব্যক্তির জন্য, যে নিজে দান করে। আর আপনার বান্ধবী যেহেতু কোনো কিছু দেয়নি, শুধু আপনার মনে তার কথা এসেছে—এতে তার জন্য কোনো সওয়াব লেখা হবে না।
তবে হ্যাঁ, আপনি যদি দান করার সময় নিয়ত করেন যে "এই সওয়াব আমি আমার বান্ধবীকে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি" বা তার নামে ঈসালে সওয়াব করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ সে সওয়াব পাবে—এবং আপনার সওয়াবও কমবে না।
বিস্তারিত আলোচনা
১. দান-সদকার সওয়াব কে পায়?
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
"যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়; প্রতিটি শীষে একশত দানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রসারিত, সর্বজ্ঞ।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৬১)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, যে ব্যক্তি ব্যয় করে সে-ই সওয়াব পায়। আপনার বান্ধবী যেহেতু ব্যয় করেনি, সে সওয়াব পাবে না।
২. নিয়ত পরিবর্তনের বিধান
আপনি প্রথমে তাকে উপহার দেওয়ার নিয়ত করেছিলেন—এটি ছিল একটি ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি। ইসলামে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কর্তব্য। আল্লাহ বলেন:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
"আর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩৪)
তবে আপনি যদি তাকে স্পষ্টভাবে কিছু না বলে থাকেন, শুধু মনে মনে ইচ্ছা করে থাকেন, তাহলে সেটি ওয়াদা হিসেবে গণ্য হবে না—শুধু একটি ইচ্ছা। সেক্ষেত্রে আপনি স্বাধীন যে সেই টাকা কোথায় দান করবেন।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন:
"দান-সদকার সওয়াব দাতার জন্য, আর যদি সে মৃত ব্যক্তির নামে ঈসালে সওয়াব করে, তবে তা মৃতের কাছে পৌঁছায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হিবা)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ থেকে দান করে, সে-ই সওয়াবের হকদার। অন্য কারো নামে দান করলে সে সওয়াব পায় না, তবে ঈসালে সওয়াব করলে পৌঁছায়।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:
"কোনো জীবিত ব্যক্তির নামে দান করে তার কাছে সওয়াব পৌঁছানোর জন্য দুআ করা জায়েজ, তবে সাধারণভাবে দানের সওয়াব দাতার নিজের।"
৪. আপনার বান্ধবী কি সওয়াব পাবে?
না, সাধারণভাবে সে সওয়াব পাবে না, কারণ:
- সে নিজে কোনো দান করেনি।
- সে কোনো নেক আমল করেনি।
- শুধু আপনার মনে তার কথা এসেছে—এটি তার আমল নয়।
তবে যদি আপনি তার নামে ঈসালে সওয়াব করেন (যেমন: "হে আল্লাহ, এই দানের সওয়াব আমার বান্ধবীকে পৌঁছে দিন"), তাহলে ইনশাআল্লাহ সে সওয়াব পাবে। এটি হানাফি মাযহাবে জায়েজ।
৫. আপনি কি সওয়াব পাবেন?
হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই সওয়াব পাবেন, কারণ:
- আপনি নিজের সম্পদ থেকে দান করেছেন।
- দান-সদকা একটি নেক আমল।
- আল্লাহর পথে ব্যয় করলে বহুগুণ সওয়াব পাওয়া যায়।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. বান্ধবীকে দেওয়ার ওয়াদা থাকলে: যদি আপনি তাকে স্পষ্টভাবে উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উত্তম। অন্যথায় ক্ষমা চেয়ে নিন বা তাকে জানিয়ে দিন।
২. ঈসালে সওয়াব করলে: আপনি চাইলে দান করার সময় নিয়ত করতে পারেন যে এই সওয়াব আপনার বান্ধবীকে পৌঁছে যাবে। এতে সে সওয়াব পাবে, আর আপনার সওয়াবও কমবে না।
৩. নিয়ত পরিষ্কার রাখুন: দান শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন, লোক দেখানো বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।
৪. বান্ধবী সম্পর্কে সতর্কতা: ইসলামে পরপুরুষ-নারী সম্পর্ক নিয়ে কঠোর বিধান রয়েছে। বান্ধবীকে উপহার দেওয়ার চেয়ে আত্মীয়-স্বজন ও অভাবীদের দান করা উত্তম।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | বান্ধবী সওয়াব পাবে? | না, যদি তার নামে ঈসালে সওয়াব না করা হয় | | আমি সওয়াব পাব? | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ | | উভয়ে সওয়াব পাওয়ার উপায়? | দানের সময় তার নামে ঈসালে সওয়াবের নিয়ত করা |
উপসংহার: আপনি যে টাকা বান্ধবীকে না দিয়ে অন্য কোথাও দান করেছেন, তাতে সওয়াব শুধু আপনি পাবেন। আপনার বান্ধবী সওয়াব পাবে না, যদি না আপনি তার নামে ঈসালে সওয়াব করেন। তবে উত্তম হলো—প্রতিশ্রুতি থাকলে তা রক্ষা করা, আর দান-সদকা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।
والله أعلم بالصواب