ল্যাব কমিশন বা রেফারেল ফি নেওয়া কি জায়েয?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5872
Questioner: Masuma 2231
Question Asked: 23 Sep 2026, 08:22 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 09:04 PM
Views: 24
Tokens: 3,388
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Ami niomito chamber practice kori....lab a j investigation rogira kore amar reference a tader investigation er takar ekta percentage lab doctor k dey....ei taka jodi ami na nei ora ei taka niye ney...amar prosno hocche ei taka niye ami gorib rogi jara treatment korate himshim khacche tader dite parbo kina?

Answer

ফতোয়া: ল্যাব কমিশন/রেফারেল ফি-এর টাকা গরিব রোগীদের দেওয়ার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: আপনি নিয়মিত চেম্বার প্র্যাকটিস করেন। ল্যাবে রোগী পাঠালে ল্যাব ডাক্তার আপনাকে ইনভেস্টিগেশনের টাকার একটি শতাংশ (কমিশন/রেফারেল ফি) দেয়। আপনি না নিলে তারা সেই টাকা রেখে দেয়। প্রশ্ন হলো—এই টাকা নিয়ে আপনি কি গরিব রোগীদের (যারা চিকিৎসা করাতে হিমশিম খাচ্ছে) দিতে পারবেন?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, এই টাকা নেওয়া এবং তা গরিব রোগীদের দান করা জায়েয নয়। কারণ এই টাকা মূলত ঘুষ (রিশওয়াত)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা হারাম। হারাম মাল দান-সদকা করলেও তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না, বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা মালিককে ফেরত দেওয়া wajib।

তবে একটি সমাধান আছে: রোগীর কাছ থেকে সরাসরি কমিশন না নিয়ে, ল্যাবের বিল থেকে সেই পরিমাণ ছাড় (discount) করিয়ে দেওয়া — এভাবে রোগী উপকৃত হবে এবং আপনি হারাম থেকে বেঁচে থাকবেন।


বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. এই কমিশন কী এবং কেন হারাম?

চিকিৎসক যখন রোগীকে কোনো ল্যাবে বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান, তখন ল্যাব কর্তৃপক্ষ তাকে রোগীর বিলের একটি অংশ দেয়। এটিকে বলা হয় "কমিশন", "রেফারেল ফি" বা "কাট"। ফিকহের পরিভাষায় এটি রিশওয়াত (ঘুষ) বা হুলওয়ান-এর অন্তর্ভুক্ত, কারণ:

  • ডাক্তারের মূল দায়িত্ব রোগীর স্বার্থ রক্ষা করা ও সঠিক চিকিৎসা দেওয়া।
  • কমিশনের লোভে ডাক্তার হয়তো প্রয়োজন নেই এমন টেস্ট করাতে পারেন, বা কম মানসম্পন্ন ল্যাবে রোগীকে পাঠাতে পারেন — এতে রোগীর হক নষ্ট হয়।
  • এটি এক ধরনের গোপন লেনদেন, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য রোগীর টাকা থেকে লাভ করা।

২. কুরআন ও হাদিসের দলিল

কুরআন:

"আর তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না, এবং জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার জন্য বিচারকদের কাছে পেশ করো না।" — সূরা আল-বাকারা: ১৮৮

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে ব্যবসার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে (ভক্ষণ করা বৈধ)।" — সূরা আন-নিসা: ২৯

হাদিস:

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর লা'নত করেছেন। — সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০; সুনানে তিরমিজি: ১৩৩৭

"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার দান আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।" — সহিহ মুসলিম-এর বর্ণনা অনুসারে (মিশকাত: ২৭৬১)

৩. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি রহ.):

"ঘুষ হারাম, তা যে নামেই হোক — হাদিয়া, কমিশন বা উপহার। আর হারাম মালের সদকা করা জায়েয নয়; বরং তা মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া wajib, যদি মালিককে চেনা যায়।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ, খণ্ড ৪

ফতোয়ায়ে আলমগিরি:

"ঘুষ গ্রহণ করা হারাম এবং তা ভক্ষণ করা জায়েয নয়।" — ফতোয়ায়ে আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়াত, খণ্ড ৫

ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.):

"ডাক্তারি রেফারেল কমিশন ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। এটি নেওয়া জায়েয নয়। তবে যদি ল্যাব কর্তৃপক্ষ রোগীর বিল থেকে সরাসরি ছাড় দেয়, তাহলে তা রোগীর জন্য উপকার এবং ডাক্তারের জন্য জায়েয।" — ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১-৪২৩

ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি রহ.):

"হারাম মাল সদকা করলে সদকা কবুল হয় না; বরং আসল মালিককে ফেরত দেওয়া আবশ্যক।" — ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৩

৪. "গরিব রোগীদের দিয়ে দিলে তো উপকার হবে" — এই যুক্তির জবাব

অনেকে ভাবেন, "টাকা তো হারাম, কিন্তু গরিবকে দিলে তো ভালো কাজ হবে।" ফিকহের মূলনীতি হলো:

"হারাম মাল দিয়ে সদকা করলে সদকা কবুল হয় না, বরং তা ফেরত দেওয়া wajib।"রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ৫

কারণ:

  1. হারাম মালের উপর আপনার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না, তাই আপনি তা দান করার অধিকারী নন।
  2. দান করলে আপনি নিজেকে ঘুষ থেকে মুক্ত ভাবলেও আসলে ঘুষ গ্রহণের গুনাহ থেকে মুক্ত হন না।
  3. প্রকৃত মালিক (রোগী বা ল্যাব) যদি না জানে, তবে তা তার কাছে পৌঁছানো বা তার সম্মতি নেওয়া জরুরি।

৫. সঠিক ও জায়েয পদ্ধতি

আপনি নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে চলতে পারেন:

পদ্ধতি ১: ল্যাবকে বলুন রোগীর বিল থেকে ছাড় দিতে

"আপনি আমাকে কমিশন দেবেন না; বরং আমার রেফার করা রোগীর বিল থেকে এই পরিমাণ ছাড় করে দিন।" এতে রোগী কম টাকা দেবে — এটি রোগীর প্রতি ইহসান এবং আপনার জন্য জায়েয।

পদ্ধতি ২: কমিশন নিয়ে রোগীকে ফেরত দিয়ে দিন

যদি ল্যাব আপনাকে জোর করে টাকা দেয়, তবে সেই টাকা সরাসরি সেই রোগীকে ফেরত দিন (তার বিল থেকে বাদ দিয়ে)। এতে মালিকের কাছে মাল ফেরত হবে।

পদ্ধতি ৩: কমিশন নেওয়া সম্পূর্ণ বর্জন করুন

ল্যাবকে স্পষ্ট বলে দিন, "আমি কমিশন নিই না।" এটি তাকওয়ার সর্বোত্তম পথ।

৬. যদি টাকা ইতিমধ্যে জমা হয়ে যায়?

  • মালিক চেনা থাকলে: তাকে ফেরত দিন।
  • মালিক অজানা থাকলে: সেই পরিমাণ টাকা সদকা করুন (নফল), তবে তা "হালাল" ভেবে নয়, বরং "দায়মুক্তির" নিয়তে। তবে উত্তম হলো ল্যাব বা রোগীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা।
  • ভবিষ্যতে: আর না নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করুন।

উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | ল্যাব কমিশন নেওয়া | হারাম (ঘুষ) | | সেই টাকা গরিবকে দান করা | জায়েয নয় (হারাম মালের সদকা কবুল হয় না) | | ল্যাবকে বলে রোগীর বিলে ছাড় করানো | জায়েয ও উত্তম | | কমিশন নিয়ে রোগীকে ফেরত দেওয়া | জায়েয (মালিককে ফেরত) | | কমিশন সম্পূর্ণ বর্জন | সর্বোত্তম (তাকওয়া) |

পরামর্শ: আপনি ল্যাব কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এমন ব্যবস্থা করুন যাতে কমিশন আপনার হাতে না এসে সরাসরি রোগীর বিল থেকে ছাড় হয়ে যায়। এতে আপনি হারাম থেকে বাঁচবেন, রোগী উপকৃত হবে, এবং আপনার চিকিৎসা পেশা পবিত্র থাকবে।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.