চিকিৎসার প্রয়োজনে টেস্ট করাতে গিয়ে মহিলাকে পুরুষ দেখে ফেললে তার গুনাহ হবে কি না
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কোনো মহিলা যদি অসুস্থতার জন্য ডাক্তার এর কাছে যায়, আর ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট করাতে গিয়ে মহিলাকে কোনো পুরুষ যদি বেপর্দা দেখে ফেলে, তাহলে কী মহিলার গুনাহ হবে?
মহিলা ইচ্ছাকৃত ভাবে বেপর্দা চলাফেরা করেন না।টেস্ট করাতে গিয়ে অপারগ হয়ে অন্য পুরুষ দেখে ফেলেছে।
কক্ষের মহিলা সহযোগীকে পর্দার বিষয়ে অবগত করেননি বেপর্দা মহিলাটি।
এক্ষেত্রে তার কী গুনাহ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় মহিলার উপর গুনাহ নেই — শর্ত হলো সে ইচ্ছাকৃতভাবে বেপর্দা না করে, শরীয়তসম্মত ওযর (অসুস্থতা/চিকিৎসা) থাকা, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী পর্দার চেষ্টা করা। তবে ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
বিস্তারিত উত্তর
১. মূলনীতি: পর্দা ফরজ, কিন্তু ওযরে গুনাহ হয় না
মহিলার জন্য পর্দা করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا (সূরা আন-নূর: ৩১)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নারী স্বভাবতই পর্দার বস্তু।" (সুনানে তিরমিযী: ১১৭৩)
কিন্তু শরীয়তের একটি সর্বজনীন মূলনীতি হলো:
"الضرورات تبيح المحظورات" — প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, মাদ্দা ২১)
তবে এখানে লক্ষণীয়: পর্দা ভঙ্গ করা এখানে "প্রয়োজন" নয়, বরং "অপারগতা" (عدم القدرة)। আর শরীয়তের নিয়ম:
"لا تكليف إلا بمقدور" — সামর্থ্যের বাইরে কোনো তাকলিফ নেই। (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬; সূরা আত-তালাক: ৭)
২. মহিলার গুনাহ হবে কি না — ফকীহদের বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
"যদি কোনো নারী অসুস্থতার কারণে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যায় এবং সেখানে পর্দার বিধান রক্ষা করা অসম্ভব হয়, তবে সে গুনাহগার হবে না — কারণ সে মাজবুর (বাধ্য)।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল-ইবাহা)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
"الضرورة تُسقط الحرمة" — প্রয়োজনীয়তা হারামকে রহিত করে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"চিকিৎসার প্রয়োজনে মহিলার জন্য পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া জায়েয, যদি মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায় এবং পর্দার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩০-৩৩২)
৩. প্রশ্নের নির্দিষ্ট অবস্থার বিশ্লেষণ
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | ইচ্ছাকৃত বেপর্দা নয় | গুনাহ নেই | | অসুস্থতা/চিকিৎসার ওযর আছে | গুনাহ নেই | | টেস্ট করাতে গিয়ে অপারগ হয়ে পুরুষ দেখে ফেলেছে | গুনাহ নেই | | কক্ষের মহিলা সহযোগীকে পর্দার বিষয়ে অবগত না করা | এতে মহিলার গুনাহ নেই, বরং সহযোগীর দায়িত্ব ছিল |
কারণ:
- মহিলা ইচ্ছাকৃতভাবে সতর খোলেনি বা বেপর্দা হয়নি; বরং চিকিৎসার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে গিয়েছে।
- শরীয়তের নিয়ম: "الإثم على من تعمّد" — গুনাহ তার উপর, যে ইচ্ছাকৃত করে। (সূরা আল-আহযাব: ৫)
- কক্ষের মহিলা সহযোগী পর্দার ব্যবস্থা না করলে তার দায়িত্ব, রোগীর নয়।
৪. তবে যা করণীয় ছিল / ভবিষ্যতে করণীয়
১. আগে থেকে জানানো: টেস্ট/পরীক্ষার আগে কক্ষের মহিলা সহযোগীকে বলে রাখা যে পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে। ২. মহিলা ডাক্তার/টেকনিশিয়ান: সম্ভব হলে মহিলা ডাক্তার বা মহিলা টেকনিশিয়ানের ব্যবস্থা করা। ৩. মাহরাম সঙ্গে রাখা: সম্ভব হলে মাহরাম (স্বামী/ভাই/পিতা) সঙ্গে রাখা। ৪. প্রয়োজন পরিমাণই: শুধু যতটুকু পরীক্ষার জন্য দরকার, ততটুকুই খোলা — এর বেশি নয়। ৫. ইস্তিগফার: যদিও গুনাহ নেই, তবু সতর্কতামূলক ইস্তিগফার করা ভালো।
৫. সতর্কতা
যদি মহিলা ইচ্ছাকৃতভাবে বেপর্দা হয়, বা প্রয়োজন ছাড়াই সতর খোলে, বা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পর্দার চেষ্টা না করে — তাহলে গুনাহ হবে। কারণ তখন আর ওযর থাকে না।
সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় মহিলার কোনো গুনাহ হবে না, কারণ:
- সে ইচ্ছাকৃত বেপর্দা করেনি
- চিকিৎসার শরীয়তসম্মত ওযর ছিল
- অপারগতার কারণে পুরুষ দেখে ফেলেছে
- কক্ষের সহযোগীর অবহেলা তার দায়িত্ব নয়
তবে ভবিষ্যতে আগে থেকে পর্দার ব্যবস্থা করে নেওয়া এবং সম্ভব হলে মহিলা ডাক্তার/টেকনিশিয়ানের ব্যবস্থা করা কর্তব্য।
والله أعلم بالصواب وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين